কক্সবাজারের বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র
জ্বালানি সংকটে আশার হাওয়া
- এই কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত হয়েছে ২৩ কোটি ৮৫ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ
- ২০২৩ সালের ১২ অক্টোবর জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয় প্রকল্পটি
- এটি দিনে-রাতে যেকোনো সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে
- প্রকল্পটি বদলে দিচ্ছে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ভবিষ্যৎ

ছবি: আগামীর সময়
জ্বালানি সংকটে টালমাটাল সময় পার করছে বাংলাদেশ। একদিকে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির অস্থিরতায় হ্রাস পেয়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন। অন্যদিকে বৈশাখের তাপপ্রবাহে ক্রমেই বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা। সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অনিশ্চয়তা। এমন বাস্তবতায় কক্সবাজারের উপকূলে নীরবে ঘুরছে বিশাল আকৃতির কিছু বায়ু টারবাইন। আর সেই ঘূর্ণন থেকেই জন্ম নিচ্ছে এক নতুন সম্ভাবনা। যার নাম বায়ুবিদ্যুৎ।
কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল, পিএমখালী, চৌফলদণ্ডী ও পোকখালী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ উপকূল জুড়ে গড়ে উঠেছে ৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র, যা এখন দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির অন্যতম প্রতীক।
২০২৩ সালের ২৫ মে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু করে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। একই বছরের ১২ অক্টোবর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয় প্রকল্পটি। এর পর থেকে বাতাসের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রতিনিয়ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করে যাচ্ছে এই কেন্দ্র।
বাতাস থেকে আলো জ্বালার গল্প
প্রকল্প এলাকায় গেলে দূর থেকেই চোখে পড়ে আকাশছোঁয়া টারবাইনগুলো। প্রতিটির উচ্চতা প্রায় ৯০ মিটার। আর ব্লেডসহ মোট উচ্চতা আরও বেশি। বঙ্গোপসাগর থেকে বয়ে আসা বাতাসে যখন এই বিশাল ব্লেডগুলো ঘুরতে শুরু করে, তখন তা শুধু বিদ্যুৎই উৎপাদন করে না, জানিয়ে দেয়, বদলে যাচ্ছে জ্বালানির ভবিষ্যৎ।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, পুরো প্রকল্পে রয়েছে ২২টি টারবাইন। এর মধ্যে খুরুশকুলে সাতটি, পিএমখালীতে তিনটি, চৌফলদণ্ডীতে ১০টি এবং পোকখালীতে রয়েছে দুটি। প্রতিটি টারবাইন তিন মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম। খুরুশকুল সাব-স্টেশন থেকে ঝিলংজা জাতীয় গ্রিড পর্যন্ত ৪০টি ট্রান্সমিশন টাওয়ারের মাধ্যমে এই বিদ্যুৎ পৌঁছে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
চালু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত এই কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত হয়েছে প্রায় ২৩ কোটি ৮৫ লাখ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ। এই বিদ্যুৎ সরাসরি কিনে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।
‘বন্ধ’ নয়, বাতাসের সঙ্গে ওঠানামা করে উৎপাদন
স্থানীয়ভাবে প্রায়ই শোনা যায়, বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকে। কিন্তু প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ধারণা সঠিক নয়।
বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের সাইট ম্যানেজার এনামুল হক বললেন, ‘বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন পুরোপুরি নির্ভর করে বাতাসের গতির ওপর। বাতাস থাকলে উৎপাদন চলবে, না থাকলে কমবে। কিন্তু কেন্দ্র কখনো পুরোপুরি বন্ধ থাকে না।’
তিনি জানান, প্রতি সেকেন্ডে মাত্র তিন মিটার বাতাসের গতিবেগ পেলেই টারবাইন ঘুরতে শুরু করে। আর ৯ মিটার গতিতে পৌঁছালে একটি টারবাইন উৎপাদন করতে পারে পূর্ণ সক্ষমতার বিদ্যুৎ।
প্রকল্পের শিফট ইনচার্জ ইঞ্জিনিয়ার মানিক আহমেদ জানান, শীত মৌসুমে বাতাস কমে যাওয়ায় উৎপাদন ১০ মেগাওয়াট থেকে কখনো কখনো নেমে আসে ৫ মেগাওয়াটে। তবে কখনো বন্ধ হয় না সরবরাহ। বরং মে থেকে আগস্ট— এই চার মাস বাতাসের গতি বেশি থাকায় উৎপাদনও সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে।
উৎপাদন, বিনিয়োগ ও বাস্তবতা
বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-এর মার্চ থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই কেন্দ্র থেকে প্রায় ১৮৪ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়েছে। এতে গড়ে ঘণ্টায় ১০ মেগাওয়াট উৎপাদন হয়েছে, যা স্থাপিত ক্ষমতার প্রায় ১৭ শতাংশ।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে এই হারকে ইতিবাচক বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইউএস-ডিকে গ্রিন এনার্জি বিডি লিমিটেড, যার অর্থায়নে অংশ নিয়েছে চীনের এসপিআইসি ওয়েইলিং পাওয়ার করপোরেশন। প্রায় ১২ কোটি ডলার বিনিয়োগে নির্মিত এই প্রকল্প থেকে উৎপাদিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ প্রায় ১২ সেন্ট দরে কিনছে সরকার। এর মধ্যে কেনা হয়েছে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ ডলারের বিদ্যুৎ।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পেতে সময় লাগলেও দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক ও টেকসই সমাধান হতে পারে এটি। কারণ টারবাইনগুলোর আয়ুষ্কাল প্রায় ২০ বছর এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় তুলনামূলক কম।
সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতার সমান্তরাল বাস্তবতা
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, বায়ুবিদ্যুতের একটি বড় সুবিধা হলো, যদি বাতাস থাকে এটি দিনে-রাতে যেকোনো সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। বিশেষ করে সন্ধ্যা ও রাতে যখন বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে, তখনো উৎপাদনের সুযোগ থাকে, যা সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। এ ছাড়া এই প্রকল্পে জমির ব্যবহারও তুলনামূলক কম। একটি তিন মেগাওয়াট বায়ু টারবাইনের জন্য সীমিত জায়গা লাগে। কিন্তু একই ক্ষমতার সৌরবিদ্যুতের জন্য প্রয়োজন হয় কয়েকগুণ বেশি জমি।
তবে বায়ুবিদ্যুতের ক্ষেত্রে প্রকৃতি নির্ভরতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাতাসের গতি কমে গেলে উৎপাদনও কমে যায়। এ ছাড়া বজ্রপাতের ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা রাখতে হয়।
বিস্ময়, প্রত্যাশা আর প্রশ্নে স্থানীয় বাস্তবতা
খুরুশকুল ও চৌফলদণ্ডী এলাকায় এই প্রকল্প এখন এক নতুন ল্যান্ডমার্ক। দূরদূরান্ত থেকে টারবাইন দেখতে আসেন লোকজন। তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এই উন্নয়নের সুফল যেন তাদের জীবনে আরও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
চৌফলদণ্ডীর বাসিন্দা আমির হোসেন বলেছেন, ‘প্রকল্পটি এখন দর্শনীয় স্থান হয়ে গেছে দেখে ভালো লাগে। কিন্তু আমাদের এলাকায় লোডশেডিং এখনো পুরোপুরি কমেনি। এটা আমাদের কষ্ট দেয়।’
ভবিষ্যতের পথচলা
২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। সেই লক্ষ্য অর্জনে বায়ুবিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) তথ্য অনুযায়ী, দেশের উপকূলীয় প্রায় ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, যা থেকে তাত্ত্বিকভাবে প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কক্সবাজারের এই প্রকল্পটি শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়। এটি একটি পরীক্ষাগার। যেখানে যাচাই হচ্ছে বাংলাদেশের বায়ুশক্তির বাস্তব সম্ভাবনা।
সামাজিক সংগঠন কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা আশা প্রকাশ করেন, জ্বালানি সংকটের এই সময় কক্সবাজারের খুরুশকুল বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র যেন এক নীরব বিপ্লবের নাম।
তিনি বললেন, ‘এখানে বাতাসই জ্বালানি, বাতাসই শক্তি। আর সেই শক্তিই ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ভবিষ্যৎ।’



