আগামীর সময়

টেংরা ও ছকিনার ১৩ বছরে বাঁচেনি একটি ছানাও

টেংরা ও ছকিনার ১৩ বছরে বাঁচেনি একটি ছানাও

ছবি: প্রতিনিধি

প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর থেকেই একসঙ্গে থাকছে ‘টেংরা’ ও ‘ছকিনা’। ১৩ বছরের এই ‘দাম্পত্যে’ ছকিনা ফুটিয়েছে কয়েকশ সন্তান। তবে কোনোটিই বাঁচেনি। 

এই কুমিরযুগলের বসবাস বরগুনার তালতলী উপজেলার ট্যাংরাগিরি ইকোপার্কে। সেখানে বন বিভাগের কুমির প্রজনন কেন্দ্রে প্রতিবছর প্রায় ৮ থেকে ১০টি করে ডিম দিয়েছে ছকিনা। সে হিসাবে গত ১৩ বছরে দিয়েছে প্রায় ১২০ থেকে ১৩০টি ডিম। সবগুলো থেকেই বাচ্চা ফুটেছিল। তবে কোনো ছানাই শেষ পর্যন্ত বাঁচেনি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কারণেই ছানাগুলো বাঁচেনি। আর বন বিভাগ বলছে, দক্ষ জনবলের অভাবে কুমিরের ছানাগুলোর সঠিক পরিচর্যা করা যাচ্ছে না।

প্রজনন কেন্দ্রের তথ্য বলছে, ২০১১-১২ অর্থবছরে এই ইকোপার্কে বন বিভাগের উদ্যোগে মিঠাপানির কুমিরের একটি প্রজনন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ কুমির ‘টেংরা’ ও স্ত্রী কুমির ‘ছকিনাকে’ নিয়ে কার্যক্রম শুরু হয় কেন্দ্রটির। এরপর থেকে প্রতিবছর ডিম দিয়েছে ছকিনা।

প্রজনন কেন্দ্রের নিয়ম অনুযায়ী, ডিম থেকে বাচ্চা ফুটে বের হওয়ার পর তাদের বড় কুমিরের কাছ থেকে আলাদা করে রাখতে হয় এবং নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে বড় করতে হয়। নির্দিষ্ট আকারে বড় হওয়ার পরই আবার তাদের বড় কুমিরের সঙ্গে রাখা যায়। অন্যথায় বড় কুমির ছোট ছানাগুলোকে খেয়ে ফেলে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব নিয়ম মেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি বন বিভাগ।

যথাযথ তদারকি ও দায়িত্বশীলতা থাকলে প্রজনন কেন্দ্রটি সফল হতে পারত বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় কে এম রাজু বলেন, প্রতিবছর এই কুমির ডিম পাড়ে এবং সেই ডিম থেকে বাচ্চা ফুটে বের হয়। তবে সেই বাচ্চাগুলোকে বাঁচাতে পারছে না বন বিভাগের লোকজন। তাই যে দুটি কুমির নিয়ে এই প্রজনন কেন্দ্রটি যাত্রা শুরু করেছিল, সেই দুটি কুমিরই এখানে আছে, আর বাড়েনি। তার দাবি, বন বিভাগ আন্তরিক হলে কুমিরের বাচ্চাগুলোকে বাঁচানো যাবে।

‘দেশের বিভিন্ন জায়গায় ব্যক্তি উদ্যোগ এবং সরকারি উদ্যোগে কুমির প্রজনন কেন্দ্র রয়েছে। সেসব জায়গায় কুমিরের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও টেংরাগিরি কুমির প্রজনন কেন্দ্রে এক যুগের বেশি সময় পার হলেও কুমিরের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে না। এখানে অবশ্যই এই কুমির প্রজনন কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের গাফিলতি রয়েছে।’ অভিযোগের সুরে জানালেন স্থানীয় মোস্তাফিজুর রহমান।

কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করলেন বরগুনা টুরিস্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আরিফ রহমান।

‘বরগুনা জেলার পর্যটন স্পটগুলোর জন্য কুমির প্রজনন কেন্দ্রটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এখানে পর্যাপ্ত লোকবল নেই এই প্রজনন কেন্দ্রটি দেখভাল করার জন্য। এখানে প্রতি বছর বাচ্চা জন্মায়, কিন্তু এই বাচ্চাগুলোকে পরিচর্যা করে বড় করার লোকজন নেই। তাই কুমিরের বাচ্চাগুলো মারা যাচ্ছে। এক কথায়, কুমিরের বাচ্চাগুলো মারা যাওয়ার জন্য দায়ী বন বিভাগের কর্মকর্তারা।’

‘মংলায় করমজল কুমির প্রজনন কেন্দ্রে প্রতিবছর হাজার হাজার পর্যটক যান শুধু এই কুমিরগুলোকে দেখার জন্য। কিন্তু এখানে কুমিরের সংখ্যা বৃদ্ধি না পাওয়ায় পর্যটকরা আসছে না। এখানে সফলভাবে কুমিরের প্রজনন করা গেলে পর্যটন শিল্পে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। তাই সরকারের কাছে আবেদন যেন পর্যটন কেন্দ্রটি যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচালনা করা হয়। আর তা না হলে আমরা এই অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে আন্দোলন করব,’ প্রতিবাদ জানালেন তিনি।

তবে অবহেলা বা অব্যবস্থাপনা নয়, দক্ষ জনবলের অভাবকেই বড় কারণ হিসেবে দেখছেন বন বিভাগের সখিনা বিট কর্মকর্তা রাহিমুল ইসলাম জুমেল।

‘প্রতিবছর কুমির ডিম দেয়, সেই ডিম থেকে বাচ্চা জন্ম হয়। কিন্তু দক্ষ জনবলের অভাবে কুমিরছানাগুলোকে বাঁচানো যাচ্ছে না। মূলত কুমিরের বাচ্চাগুলো জন্মানোর পর এগুলোকে বড় কুমির থেকে আলাদা করে রাখতে হয়। আলাদা না করলে বড় কুমির এই ছোট কুমিরের বাচ্চাগুলোকে খেয়ে ফেলে। তাই দক্ষ জনবলের অভাবে কুমিরছানাগুলোকে আলাদা করে রাখা যাচ্ছে না, ফলে বাঁচানো যাচ্ছে না। আমি দক্ষ জনবল চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাব। আশা করি তারা এ সমস্যা সমাধানে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে।’

স্থানীয়দের মতে, এই প্রজনন কেন্দ্র থেকে কুমির উৎপাদন করা গেলে দেশে কুমিরের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব। পরে এসব কুমির সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় আয়ও বাড়তে পারে।

    শেয়ার করুন: