হঠাৎ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হাওরের ৫০ হাজার কৃষক

ছবি: আগামীর সময়
কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে আকস্মিক বন্যায় প্লাবিত হয়েছে ১৩ হাজার ১২২ হেক্টর বোরো জমি। ধান কাটার মৌসুমের একেবারে শেষ সময়ে এ বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৫০ হাজার কৃষক। কৃষি বিভাগের হিসাবে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫৯ কোটি টাকা।
পূর্ব অষ্টগ্রাম হাওরের সাবমার্সেবল সড়কে দাঁড়িয়ে গৃহিণী মালা রানী আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘সুদে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে ধান চাষ করেছিলাম, সব পানির নিচে। এখন ঋণ শোধ করব কীভাবে।’ তার সন্তানরা তখন পানিতে তলিয়ে যাওয়া পচা ধান যতটুকু সম্ভব তুলে আনার চেষ্টা করছিল, অন্তত বছরের খাবারটুকু জোগাড়ের আশায়।
একই ইউনিয়নের কৃষক মো. রিপন খান জানিয়েছেন, ১০ একর জমিতে ধান চাষ করেও তুলতে পেরেছেন মাত্র ২ একরের। ডুবে গেছে বাকি সব।
তার ভাষ্য, ‘প্রতি একরে প্রায় ৭০ মণ ধান ফলনের আশা ছিল; কিন্তু খরচ হয়েছে প্রায় ৭০ হাজার টাকা। এখন শ্রমিক-সংকট এত বেশি যে, একজন শ্রমিকের মজুরি দিতে হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। তারপরও যা পারি কাটছি, শুধু বছরের খাবার বাঁচানোর জন্য।’
মিঠামইন উপজেলার কৃষক মোস্তফা মিয়ার হতাশাও কম নয়। তিনি বলেছেন, সরকারনির্ধারিত দাম প্রতি কেজি ৩৬ টাকা হলেও তার কোনো লাভ নেই। পানির নিচে আমার সব জমির ফসল। আর যাদের ধান আছে, তারাও বিক্রি করতে পারবে কি না সন্দেহ। ভেজা ধান নেয় না সরকার। আর শুকানোও যাচ্ছে না এই আবহাওয়ায়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান বলেছেন, বুধবার পর্যন্ত জমি তলিয়ে গেছে কিশোরগঞ্জে ১৩ হাজার ১২২ হেক্টর বোরো ধানের। ক্ষেত থেকে ধান কাটতেই পারেনি অনেক কৃষক। কেউ ধান কেটে খলায় তুললেও তা শুকাতে না পেরে পচে যাচ্ছে বা নষ্ট হচ্ছে চারা গজিয়ে। এতে প্রায় ২৫৯ কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছে কৃষকেরা।
এদিকে ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার। চলতি মৌসুমে জেলায় সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮ হাজার ৩৩০ টন ধান, যা ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চলবে। নির্ধারিত দরে প্রতি কেজি ৩৬ টাকা দামে কেনা হলেও নেওয়া হবে না ভেজা বা নিম্নমানের ধান। একজন কৃষক সর্বোচ্চ ৭৫ মণ ধান বিক্রি করতে পারবেন এবং লেনদেন হবে ব্যাংকের মাধ্যমে।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মোশারফ হোসেন জানিয়েছেন, কৃষি বিভাগের তালিকার ভিত্তিতে সংগ্রহ করা হবে ধান। পাশাপাশি মিলারদের মাধ্যমে ভেজা ধান শুকিয়ে পরে চাল সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে কিছুটা উপকৃত হতে পারে কৃষকেরা। ৩ মে কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর কেনা হয়েছে ৬ মে পর্যন্ত জেলায় ২৭ টন ধান।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন জানিয়েছেন, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সার্বক্ষণিক নজরদারি চলছে। সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষকদের।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য তিন মাসের মানবিক সহায়তা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। এতে খাদ্যশস্যের পাশাপাশি বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে দেওয়ার কথা রয়েছে নগদ সহায়তা। তবে মাঠের বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে। সহায়তা পৌঁছানোর আগেই নিঃস্ব হয়ে পড়েছে অনেক কৃষক।
হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশির নিচে ডুবে রয়েছে কৃষকদের লালিত স্বপ্ন। প্রত্যেকের সামনে এখন অনিশ্চিত জীবিকার কঠিন বাস্তবতা।



