আগামীর সময়

বাঘের বন, কুমিরের নদী–তবুও মধুর টানে সুন্দরবনে মৌয়ালরা

বাঘের বন, কুমিরের নদী–তবুও মধুর টানে সুন্দরবনে মৌয়ালরা

ছবিঃ আগামীর সময়

বাংলাদেশের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের গভীর অরণ্যে মৌমাছিরা তৈরি করে সোনালি মধু। আর সেই মধু সংগ্রহে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন ছুটে চলেন একদল সাহসী মানুষ (মৌয়াল)। বাঘ, কুমির ও বনদস্যুর ভয় উপেক্ষা করে তাদের এই জীবনসংগ্রাম এক অনন্য বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।

নিস্তব্ধ বনভূমির বুক চিরে ছোট ছোট নৌকায় করে যাত্রা শুরু হয় মৌয়ালদের। চারদিকে পানি আর সবুজে ঘেরা অজানা পথ পাড়ি দিয়ে তারা পৌঁছে যান জোয়ারে প্লাবিত বনভূমির গভীরে। পায়ের নিচে শ্বাসমূল, মাথার ওপর ঘন বৃক্ষরাজি–এই প্রতিকূল পরিবেশেই চলে জীবিকার সন্ধান।

ঘন জঙ্গলের ভেতর ‘কু’ শব্দ করে নিজেদের অবস্থান জানান দিয়ে দলবদ্ধভাবে এগিয়ে যান তারা। একসময় চোখে পড়ে কাঙ্ক্ষিত সেই দৃশ্য, গাছের ডালে ঝুলে থাকা মৌচাক। এরপর ধোঁয়া তৈরি করে মৌমাছি সরিয়ে দক্ষ হাতে গাছে উঠে চাক কেটে নামানো হয় মধু। তবে পুরো প্রক্রিয়াটিই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

যেকোনো মুহূর্তে বাঘের আক্রমণ, নদীতে কুমিরের উপস্থিতি কিংবা বনদস্যুর হুমকি–সবকিছু মাথায় নিয়েই কাজ করতে হয় মৌয়ালদের।

তবুও থেমে থাকে না তাদের জীবনযুদ্ধ। স্থানীয় মৌয়াল হাবিব শেখ জানালেন, প্রতি বছর জীবন বাজি রেখে বনে যাই। পরিবার-পরিজনের কথা মনে পড়ে। কিন্তু না গেলে সংসার চলবে না। আল্লাহর ভরসাতেই কাজ করি।

আরেক মৌয়াল রহিম গাজীর সবচেয়ে বেশি ভয় বাঘের। তার ভাষ্য, কখন কোথা থেকে বাঘ এসে আক্রমণ করবে বলা যায় না। তারপরও দলবদ্ধভাবে কাজ করি বলে কিছুটা সাহস পাই।

মৌয়ালরা জানান, চৈত্র মাস থেকেই শুরু হয় মধু সংগ্রহের মৌসুম। প্রথমে খলিশা ফুলের মধু পাওয়া যায়, যা স্বাদ ও গুণে সবচেয়ে উন্নত। এরপর পর্যায়ক্রমে গারণ, কেওড়া, গেওয়া ও অন্যান্য ফুলের মধু সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে খলিশা ফুলের মধুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি।

সংগ্রহ করা মধু আলাদা করে সংরক্ষণ করা হয়। মোম ও মধু পৃথক করে বাজারজাতের জন্য প্রস্তুত করা হয়। এই মধু শুধু দেশের চাহিদাই পূরণ করে না, বিদেশেও রপ্তানি হয়।

এদিকে, মৌয়াল ও বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বন বিভাগের টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি, এ বছর আগাম বৃষ্টিপাত হওয়ায় গত বছরের তুলনায় মধু আহরণ বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

ঢাংমারি ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা সুরঞ্জিত চৌধুরী জানিয়েছেন, এ বছর পূর্ব সুন্দরবনে ৭০০ কুইন্টাল মধু ও ২০০ কুইন্টাল মোম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে মৌয়ালরা মধু সংগ্রহ শুরু করেছেন।

‘অত্যন্ত পুষ্টিকর এই প্রাকৃতিক মধু সংগ্রহে মৌয়ালরা জীবনের সর্বোচ্চ ঝুঁকি নেন। তাদের এই অবদানে সরকারের রাজস্বও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বন বিভাগ নিরলসভাবে কাজ করছে’, পূর্ব সুন্দরবন বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর মন্তব্য।

    শেয়ার করুন: