আধিপত্যের সংঘর্ষে নিঃস্ব অন্তত ২০ পরিবার

সংগৃহীত ছবি
বাগেরহাটের চিতলমারী-পাটগাতি সড়কে মাঝামাঝি এলাকায় চিংগড়ী গ্রাম। একপাশে শেখপাড়া, অন্যাপাশে বিশ্বাসপাড়া। শুক্রবার সকালে গ্রামে দেখা গেল, সড়কজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ইটের ভাঙা অংশ। শেখপাড়ার দিকে এগোতেই নাকে এলো পোড়া গন্ধ। বসতঘরগুলো যেন এক একটা ধ্বংসস্তুপ। সামনে বসে বিলাপ করছেন এসব বাড়ির লোকজন।
বৃহস্পতিবার রাতে শেখ গ্রুপ ও বিশ্বাস গ্রুপের তিন ঘণ্টার সংঘর্ষে সর্বস্ব খুইয়েছে এ গ্রামের অন্তত ২০টি পরিবার। নিহত হয়েছেন শেখ বাড়ির এক যুবক। শুক্রবার সেখানে থমথমে পরিস্থিতি। টহল দিতে দেখা গেছে পুলিশকে।
শেখ ও বিশ্বাস গ্রুপের মধ্যে মধুমতি নদীর চর দখল ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব বহুদিনের। প্রায়ই ঘটে সংঘর্ষ, প্রাণহানির ঘটনাও নতুন নয়। স্থানীয়দের কথায় জানা গেল এ তথ্য। সবশেষ বৃহস্পতিবারের সংঘর্ষে পথে বসেছে শেখপাড়ার কয়েক পরিবার।
শুক্রবারের আলো ফুটতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সেসব ক্ষতচিহ্ন। প্রতিপক্ষের হামলায় বসতঘরের পাশাপাশি খুঁটি পুড়ে যাওয়ায় গোটা গ্রাম এখন বিদ্যুতবিচ্ছিন্ন।
পোড়া ঘরের সামনে বিলাপ করছিলেন লিয়াকত শেখ। ‘আগুন দিয়ে আমার সব শেষ করে দিয়েছে। কী খাব, কী করব কিছুই জানি না।’
‘প্যারালাইজড স্বামীকে নিয়ে অসহায় অবস্থায় আছি। ঋণ করে আনা ধানও পুড়ে গেছে’- বলছিলেন মনোয়ারা বেগম।
আগুন দেয়ার পাশাপাশি কয়েক বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাতও হয়েছে বলে জানালেন কয়েকজন। শেখপাড়ার জয়নব বেগমের অভিযোগ, ঘর মেরামতের জন্য ধার করে নেওয়া ৫০ হাজার টাকা লুট হয়েছে। পুড়ে গেছে তার গবাদিপশুও। পুলিশের উপস্থিতিতেই হামলা চালিয়ে লুট করা হয়েছে স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ অর্থ- বলছিলেন বাবলু শেখ।
ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, বৃহস্পতিবার বিকেলে শেখপাড়ার আরিফ শেখ নামে এক যুবক মোটরসাইকেলে যাওয়ার সময় বিশ্বাস পরিবারের লোকজন তাকে ধারাল ‘ফুলকুচি’ দিয়ে আঘাত করে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। সন্ধ্যার পর তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বিশ্বাসপাড়ার সাইদ বিশ্বাস ও সোহাগ মেম্বারের নেতৃত্বে প্রায় ৩০০ জনের একটি দল পরে শেখপাড়ায় হামলা চালায়।
সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত এই সংঘর্ষ ও হামলা চলে। এতে রাজিব শেখ (২৫) নামে এক যুবক নিহত এবং অন্তত ২৫ জন আহত হন। পরে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিস গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে এবং আগুন নেভায়।
চিতলমারী ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা আব্দুল ওয়াদুদ বললেন, আগুন নেভাতে গিয়ে বাধার মুখে পড়তে হয়েছে বলে কাজে খানিকটা বেগ পেতে হয়েছে। চার ইউনিটের চেষ্টায় পরে নেভানো গেছে আগুন। ততক্ষণে ২০ থেকে ২৫টি ঘর পুড়ে গেছে।
পাল্টা হামলার আশঙ্কায় শুক্রবার ঘর থেকে মূল্যবান মালামাল নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে দেখা গেছে বিশ্বাসপাড়ার লোকজনকে। শেখপাড়া থেকে হামলার হুমকি আসছে বলে অভিযোগ তাদের।
বাগেরহাটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) শামীম হোসেন গোটা ঘটনাটি নিশ্চিত করেছেন। নিহত রাজিবের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য রাখা আছে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। আহতদের অনেকে ওই হাসপাতালে ভর্তি।
হামলায় জড়িত সন্দেহে সৌরভ বিশ্বাস (১৯) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে বলেও জানালেন পুলিশ কর্মকর্তা শামীম।

