আবাসন প্রকল্প
বহুতল ভবনে ঘিঞ্জি জীবনের শঙ্কা হরিজন সম্প্রদায়ের

ছবি: আগামীর সময়
যারা সারাদিন নিয়োজিত থাকেন পরিচ্ছন্নতা কাজে, সেই হরিজন সম্প্রদায়ের আবাসন এলাকার চিত্র ঠিক বিপরীত। ছোট্ট এলাকায় গাদাগাদি করে বসবাস করে একাধিক পরিবার। ঘিঞ্জি এসব কলোনিতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বড় হয় তাদের শিশুরা। এসব থেকে পরিত্রাণের জন্য বগুড়ার দুটি হরিজন কলোনিতে বহুতল আবাসিক ভবন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি)।
চলতি বছরের মার্চ থেকে শহরের চকসূত্রাপুরে প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে শুরু হয়েছে ভবনের নির্মাণকাজ। তবে নির্মাণের শুরুতেই আবাসন প্রকল্পটি নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়। হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষের প্রশ্ন, মাত্র এক রুমের ফ্ল্যাটগুলো দিয়ে কীভাবে আবাসন সংকট মিটবে? বড় পরিবার নিয়ে বহুতল ভবনে আবার সেই ঘিঞ্জি জীবনই কী কাটাতে হবে?
বগুড়া পৌরসভার কর্মকর্তারা জানান, গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বগুড়ায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য দুটি বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। অনুমোদন অনুযায়ী চকসূত্রাপুরে বসবাসরত হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য ৭২টি ফ্ল্যাট এবং কাটনারপাড়ায় ৪৮টি ফ্ল্যাট নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। নির্মাণের পর বগুড়া পৌরসভার কাছে তারা হস্তান্তর করবে ভবন দুটি।
এরমধ্যে শুরুতে চকসূত্রাপুর এলাকায় হরিজন কলোনিতে সাত তলাবিশিষ্ট ভবন তৈরির জন্য বরাদ্দ হয় ১৮ কোটি ৪৬ লাখ ৯১ হাজার ৬৮৩ টাকা। এই কাজের জন্য ২০২৪ সালের ২৫ জুলাই ইলেকট্রো গ্লোব নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়। প্রথম দফায় কাজ শেষ করার মেয়াদ ছিল ২০২৬ সালের ২৪ আগস্ট পর্যন্ত। কিন্তু মেয়াদ অনুযায়ী কাজ শুরু করতে না পারায় নতুন করে চুক্তি হয়। কাজ শেষ করার পরবর্তী মেয়াদ ২০২৭ সালের ২৪ আগস্ট পর্যন্ত।
এই প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি ভবনের নিচ তলায় থাকবে কমন স্পেস। সেখানে কমিউনিটি সেন্টারের আদলে হরিজনরা পালন করবেন বিভিন্ন উৎসব। ভবনে থাকবে লিফট। দোতলা থেকে হবে আবাসিক ফ্ল্যাট। প্রতিটি পরিবারের জন্য বরাদ্দ থাকবে একটি করে ফ্ল্যাট। প্রতিটি ফ্ল্যাটে থাকবে একটি করে বেডরুম, লিভিং রুম, রান্নাঘর ও বাথরুম।
এদিকে, কাটনারপাড়ায় স্থান সংকুলান না হওয়ায় ৪৮টির বদলে ৩৬টি ফ্ল্যাট নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এলজিইডি।
হরিজন সম্প্রদায়ের লোকজন জানান, একাধিক সদস্য নিয়ে এক রুমের ফ্ল্যাটে বসবাস করলে পশুর মতো জীবন হবে। এই পরিস্থিতির কারণে দেশের অনেক জেলায় প্রকল্প শুরু করেও থমকে গেছে।
চকসূত্রাপুরের কলোনিতে হরিজন সম্প্রদায়ের প্রায় ৩০০ ঘর ছিল। বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য ঘরগুলোর তিন ভাগের এক ভাগ ভাঙা পড়েছে।
কলোনির বাসিন্দা রেবতি রানী জানান, বর্তমানে অস্থায়ী টিনের ঘরে বসবাস করছেন তারা।
তিনি বললেন, ‘শাশুড়ি, চার ছেলে ও স্বামী নিয়ে বসবাস করি। এত টাকা খরচ করে বিল্ডিং বানিয়ে খালি এক রুম দেবে সরকার। এই এক রুমে আমরা কীভাবে থাকব?’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক নারী প্রশ্ন করেছেন, ‘একটা রুমে বেটা, বেটার বউ, মেয়ে ও মেয়ের জামাই নিয়ে থাকতে পারবেন? আমরা তাহলে কীভাবে থাকব? তাহলে এই এক রুম দেওয়ার চেয়ে না দেওয়াই ভালো।’
বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদের কোষাধ্যক্ষ ও কাটনারপাড়া কলোনির বাসিন্দা সবুজ হরিজন বললেন, আমাদের এখানে ৬৫ ঘর হরিজন আছে। প্রতি পরিবারের জন্য একটি রুম কোনো কাজে আসবে না। বরং আরও মানবেতর জীবন কাটাতে হবে। এমন হলে আমাদের ভবন দিয়ে লাভ নেই। বরং এখন যেমন আছি, এভাবেই ভালো আছি।’
চকসূত্রাপুরের একাধিক বাসিন্দা জানান, বহুতল ভবন নিয়ে তাদের মধ্যে কাজ করছে ভীতি। কারণ হরিজন সম্প্রদায়ের লোকজন সবাই মদ্যপানে অভ্যস্ত। বয়স্ক নারী-পুরুষ মদ্যপ অবস্থায় উঁচু স্থানে বা সিঁড়ি বেয়ে চলাচলে নিরাপদ বোধ করেন না। এ ছাড়া বহুতল ভবনে স্বস্তিবোধ করেন না তারা।
বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদের সহসভাপতি শ্রী টুটুল হরিজন জানান, ভবন হলে সবার জন্য ভালোই হবে। এটা হওয়ার পর চকসূত্রাপুরে আরেকটি ১০ তলা ভবন হবে।
ইলেকট্রো গ্লোব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাইট প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেছেন, ‘চকসূত্রাপুর কলোনিতে প্রায় ৯ হাজার বর্গফুট আয়তনের ওপর সাততলা ভবন হবে। কাজ শুরু করতে আমাদের দেরি হয়েছে। এখন আর কোনো সমস্যা নেই। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করে ফেলব কাজ।’
প্রকল্পটির শুরু থেকে নানা রকম সমস্যায় পড়তে হয়েছে বলে জানান বগুড়া সদর উপজেলা প্রকৌশলী মো. মোবারক হোসেন।
মোবারক বলেছেন, ‘প্রতিটি ফ্ল্যাটে একটির বদলে দুটি রুম দেওয়া যায় কিনা এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলব আমরা। তাহলে আরও একটু ভালোভাবে থাকতে পারবে এই সম্প্রদায়ের মানুষ।’



