না খেয়ে জমানো টাকায় দেওয়া হয় ফি, তবুও পরীক্ষা দিতে পারেনি জান্নাতুল

এসএসসি পরীক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস।
গতকাল মঙ্গলবার এসএসসি পরীক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌসের দিন শুরু হয়েছিল অন্য পরীক্ষার্থীর মতোই। বাবা-মা, প্রতিবেশীদের থেকে দোয়া নিয়ে পৌঁছেছিলেন পরীক্ষা কেন্দ্রে। সেখানেই পাওয়ার কথা ছিল প্রবেশপত্র। তবে অন্যরা প্রবেশপত্র পেলেও, পাননি জান্নাতুল। অনুরোধ আর কান্না কিছুতে হয়নি লাভ, স্বপ্ন ভেঙেছে তার।
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার আলিম মাদ্রাসা পরীক্ষাকেন্দ্রে ঘটেছে এ ঘটনা। উপজেলার বালুয়া মাসুমপুর ইউনিয়নের সন্তোষপুর হাচিয়া গ্রামের বাসিন্দা রিকশাচালক জিয়াউর রহমানে মেয়ে জান্নাতুল। বুজরুক সন্তোষপুর কারামতিয়া ফাজিল মাদ্রাসা থেকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল তার।
মেয়ে পরীক্ষা দিতে না পারায় স্বপ্ন ভেঙেছে জান্নাতের বাবা-মায়েরও। ‘পরীক্ষার ফরম পূরণের জন্য দিয়েছি ২ হাজার ৩০০ টাকা। এক মাস একবেলা না খেয়ে জমিয়েছিলাম এই টাকা; কিন্তু প্রবেশপত্র না পাওয়ায় আমার মেয়েটা পরীক্ষা দিতে পারল না। ভাঙা ঘরে থেকেও ডাক্তার হওয়া স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেল ওর’ বলছিলেন জান্নাতুলের মা এসমোত আরা।
মেয়েকে পড়াতে তাদের সংগ্রামের কথা জানালেন দরিদ্র এই গৃহিণী। জানান, রিকশাচালক বাবার পক্ষে মেয়ের লেখাপড়ার খরচ চালানো ছিল খুবই কষ্টকর। তবু মেয়ের ইচ্ছার কথা ভেবে সংসার খরচের টাকা বাঁচিয়ে পরীক্ষার ফরম পূরণ করেছিলেন তিনি। পুরোদমে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতিও নিয়েছিল জান্নাতুল। সবার কাছে দোয়া নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার সকালে পরীক্ষাকেন্দ্রে গিয়েছিল সে। কিন্তু সব ভেস্তে যায় এক নিমিষেই। পরীক্ষাকেন্দ্রে সবাই প্রবেশপত্র পেলেও প্রবেশপত্র আসেনি জান্নাতুলের। এ কারণে পরীক্ষা দিতে পারেনি সে। কান্নাকাটি করে শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা না দিয়ে বাড়ি ফিরে আসতে হয় তাকে।
জান্নাতুল অভিযোগ করে বলছিলেন, ‘অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার আগেই পেয়েছে প্রবেশপত্র; কিন্তু আমাদের দেওয়া হয় পরীক্ষার দিন কেন্দ্রে। সেখানে ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয় প্রবেশপত্রের জন্য। বাকি সবাই প্রবেশপত্র পেলেও আমি না পাওয়ায় পরীক্ষা দিতে পারিনি।’
তিনি জানান, বিষয়টি জানাজানি হলে আমাকে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এ কে মোনায়েম সরকারের কাছে নিয়ে যায় কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ। তখন অধ্যক্ষ স্যার আমাকে বললেন, ‘মা, এ বছর তোমার পরীক্ষা দেওয়া হলো না। সামনের বছর পরীক্ষা দিতে যা খরচ হবে সব আমি দেবো।’
‘এরপর মাদ্রাসার অন্য শিক্ষকরা আমাকে বাড়িতে রেখে যায়। তারা আমার আম্মুকে দুই হাজার টাকা দিতে চেয়েছিল। আম্মু সেই টাকা নেয়নি। কারণ লাখ টাকা দিলেও তো তারা আমার এক বছর ফিরিয়ে দিতে পারবে না’, কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন জান্নাতুল। ‘আমি এই বছরেই পরীক্ষা দিতে চাই’, যোগ করেন তিনি।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে দায় স্বীকার করলেন মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এ কে মোনায়েম সরকার। বললেন, জান্নাতুলের প্রবেশপত্র কেন আসেনি সেটা আমিও বুঝে উঠতে পারছিনা। বোর্ডে যোগাযোগ করে খোঁজ নিচ্ছি বিষয়টি।



