রাজশাহীতে হামের ভয়াবহ বিস্তার, আক্রান্তের হার ৩৫ শতাংশ

ছবিঃ আগামীর সময়
রাজশাহী বিভাগে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে হামের সংক্রমণ। বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া ৫২০ জনের নমুনা সংগ্রহ করে। এর মধ্যে ১৪৩ জনের শরীরে হামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সে হিসাবে পরীক্ষিত রোগীর প্রায় ৩৫ শতাংশ (৩৪ দশমিক ৭০ শতাংশ) শিশু হামে আক্রান্ত।
বর্তমানে হাম পজিটিভ কিংবা উপসর্গ নিয়ে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২২৯ জন রোগী। যেসব এলাকায় একাধিক রোগী শনাক্ত হচ্ছে, সেসব এলাকাকে প্রাদুর্ভাব এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এ পর্যন্ত বিভাগে ২৬টি এলাকা প্রাদুর্ভাব হিসেবে শনাক্ত হয়েছে।
এর মধ্যে পাবনায় সর্বোচ্চ ১০টি এলাকা থেকে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। রাজশাহীর ছয়টি এলাকায় হাম শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে পাঁচটি রাজশাহী মহানগরের ভেতরে। এছাড়া নওগাঁয় পাঁচটি, চাঁপাইনবাবগঞ্জে তিনটি এবং নাটোর ও সিরাজগঞ্জে একটি করে এলাকা আক্রান্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ আশঙ্কা করছে, প্রাদুর্ভাবের এলাকা আরও বাড়তে পারে।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান জানান, যেসব এলাকায় একাধিক রোগী শনাক্ত হয়েছে, সেগুলোকে আউটব্রেক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এসব এলাকায় টিকাদানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এদিকে, রোগীর চাপ সামাল দিতে বিশেষ প্রস্তুতি নিয়েছে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল। হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস জানান, হাসপাতালে ৪০ শয্যার একটি হাম আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। এছাড়া শিশু ওয়ার্ড ও মেডিসিন বিভাগে আলাদা আইসোলেশন কর্নার করা হয়েছে। রোগী আরও বাড়লে প্রয়োজনে একটি শিশু ওয়ার্ড পুরোপুরি আইসোলেশন ওয়ার্ডে রূপান্তর করা হবে।
রামেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েকদিনে রোগীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২৯ মার্চ ৯৩ থেকে বৃহস্পতিবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩২ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় ১২ জনসহ শুক্রবার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল ১৩০ জন শিশু। এ সময়ে ১৩ শিশুকে চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে এবং মারা গেছে একজন।
শিশুদের জন্য নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রের (পিআইসিইউ) শয্যা ১২ থেকে বাড়িয়ে ১৮টি করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি শয্যা হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য নির্ধারিত। এছাড়া গুরুতর রোগীদের চিকিৎসায় বিকল্প হিসেবে হার্ট ফাউন্ডেশনেও পাঠানো হচ্ছে। বর্তমানে রামেক হাসপাতালে ১২ জন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যে শিশুর পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্কদের উপস্থিতিও দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, হামের সংক্রমণ শুধু শিশুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বড়দের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার আগামী রবিবার (৫ এপ্রিল) থেকে দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে। রাজশাহীতে নতুন টিকা না এলেও পূর্বে মজুদ থাকা ৩৮ হাজার ৫৯০ ডোজ টিকা দিয়েই কার্যক্রম শুরু হবে।
জেলার সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) সুপারিনটেনডেন্ট কস্তুরি বেগম জানান, ২০২৪ সালে ৯ মাস বয়সে ৫৬ হাজার ৪৯০ জন শিশু প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে ৫৫ হাজার ৫০৩ জন দ্বিতীয় ডোজ টিকা পেয়েছে। ২০২৫ সালে প্রথম ডোজ পেয়েছে ৫৯ হাজার ২৫৯ জন এবং দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছে ৫৮ হাজার ৩০২ শিশু।
তবে রামেক হাসপাতালের আইসোলেশন সেন্টারে দেখা গেছে, চিকিৎসা নিতে আসা বেশিরভাগ শিশুর বয়স ৬ মাসের কম। প্রায় ৬৫ শতাংশ শিশু ৯ মাসের আগেই আক্রান্ত হয়েছে। আগে ৯ থেকে ১৫ মাস বয়সে টিকা দেওয়া হলেও এবার ৬ মাস বয়সী শিশুদেরও টিকার আওতায় আনা হচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি বেশিরভাগ শিশুর বয়স ৬ মাসের কম হওয়ায় উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।
‘টিকাদানের মাধ্যমে সংক্রমণ কমানো সম্ভব হলে ছোট শিশুদের ঝুঁকিও কমে আসবে’, টিকা নিশ্চিত করতে পারলে করোনার মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে না বলে আশা প্রকাশ করেছেন রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান।

