ব্যাংকের ধারেকাছে না গিয়েও ঋণখেলাপি
- প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন ব্যাংকটির তৎকালীন ব্যবস্থাপক নূরুল ইসলাম।

ছবিঃ আগামীর সময়
মাঠে চাষ করার মতো নেই এক শতক জমিও। এমনকি জীবনে কোনদিন পা রাখেননি ব্যাংকের সিঁড়িতে। এমন সব মানুষের বাড়িতে পৌঁছে যাচ্ছে ঋণখেলাপির ‘লাল নোটিশ'।
চাঞ্চল্যকর এই জালিয়াতির ঘটনাটি ঘটেছে জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় অবস্থিত অগ্রণী ব্যাংকের শাখায়।
শুধু জীবিত নয়, পনের থেকে বিশ বছর আগে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের নামেও দিব্যি তোলা হয়েছে কৃষিঋণ।
অভিযোগ উঠেছে, সাধারণ কৃষকদের নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে ও ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন ব্যাংকটির কালাই শাখার তৎকালীন ব্যবস্থাপক নূরুল ইসলাম।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জালিয়াতির মাধ্যমে এসব ঋণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল মূলত ২০১৬-১৭ সালের দিকে।
ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই কালাই পৌরসভার আঁওড়া মহল্লা এবং আহম্মেদাবাদ ইউনিয়নের হারুঞ্জা ও ঝামুটপুর গ্রামের বাসিন্দা।
ব্যাংকের দেওয়া খেলাপি ঋণের তালিকা অনুযায়ী, ঝামুটপুর গ্রামের ৩৮ জন, হারুঞ্জা গ্রামের ৩৩ জন এবং আঁওড়া মহল্লার ১৬ ব্যক্তির নামে দেখানো হয়েছে এই ভুয়া ঋণ।
ব্যাংক থেকে নোটিশ পেয়ে রীতিমতো হতবাক আঁওড়া মহল্লার বাসিন্দা নূর আলম মণ্ডল। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করলেন, ‘ব্যাংক কোথায় সেটাই আমি চিনি না। অথচ আমার নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে ভুয়া কাগজে নয়-দশ বছর আগে তোলা হয়েছে ঋণ। এখন টাকা পরিশোধের নোটিশ পেয়ে চরম আতঙ্কের মধ্যে আছি।’
এই জালিয়াতির হাত থেকে রেহাই পাননি মৃত ব্যক্তিরাও। আঁওড়া মহল্লার আব্দুর রাজ্জাক মোল্লা মৃত্যুবরণ করেছেন প্রায় ১৫ বছর আগে। অথচ নথিপত্রে দেখানো হয়েছে, তিনি পঞ্চাশ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন ২০১৬ সালে। যা সুদে-আসলে বর্তমানে নিরানব্বই হাজার দুইশ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
বাবার নামে এমন নোটিশ পেয়ে ক্ষুব্ধ ছেলে সোহেল মোল্লা বললেন, ‘বেঁচে থাকতেই সব ঋণ শোধ করেছেন বাবা। হঠাৎ দেখছি ২০১৭ সালেও নাকি তিনি ঋণ নিয়েছেন। আমার বাবা কি কবর থেকে উঠে এসে ব্যাংকের লোন নিয়েছেন? দেশে আসলে লুটপাটের মহোৎসব চলছে।’
একই গ্রামের খলিলুর রহমান ১৮ বছর আগে মারা গেলেও তার নামেও পঞ্চাশ হাজার টাকার ভুয়া ঋণ রয়েছে।
ব্যাংকের নিয়মানুযায়ী ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে সরাসরি যাচাই-বাছাই করার কথা থাকলেও, দালাল চক্রের মাধ্যমে গ্রামের সাধারণ মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও ছবি সংগ্রহ করতেন নূরুল।
একই গ্রামের ভ্যানচালক পুতুল চন্দ্র জানান, একটি ভ্যান কেনার আশায় তিনি অগ্রণী ব্যাংকের তৎকালীন মাঠ কর্মকর্তা আব্দুস সামাদকে দুই হাজার টাকা, নিজের ছবি ও এনআইডি কার্ড দিয়েছিলেন। ভ্যান বা ঋণ কোনটাই না পেলেও এখন তার ঘাড়ে চেপেছে নিরানব্বই হাজার দুইশ টাকার ঋণের বোঝা।
অন্যদিকে, ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজ করা জাহানারা বেগমের নামেও পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা তোলা হয়েছে। ব্যাংকে গিয়ে তিনি দেখতে পান, ফাইলে ছবি ও এনআইডি কার্ড তার হলেও স্বাক্ষরটি সম্পূর্ণ জাল।
এই চক্রের অন্যতম সহযোগী আব্দুস সামাদ অকপটে স্বীকার করে বলেছেন, ‘এলাকার মানুষের আইডি কার্ড ও ছবি এনে দিলে ম্যানেজার সাহেব আমাকে প্রতি ফাইলের জন্য দুই হাজার টাকা করে দিতেন। আমি প্রায় ৬০-৭০ জনের কাগজ তাকে দিয়েছি। তবে এসব দিয়ে যে তিনি ঋণ তুলবেন, তা আমার জানা ছিল না।’
তিনি অভিযোগ করেন, নুরুল তাকে চাকরি খাওয়ার হুমকি দিয়ে এসব ভুয়া নথিতে জোরপূর্বক স্বাক্ষর করিয়ে নিয়েছিলেন।
অগ্রণী ব্যাংক কালাই শাখার বর্তমান ব্যবস্থাপক সাব্বির আহমেদ জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে জালিয়াতির ঘটনাটি। এরই মধ্যে শনাক্ত হয়েছে বেশ কিছু ভুয়া ঋণ। স্থগিত করা হয়েছে অভিযুক্ত সাবেক ম্যানেজারের অবসরকালীন সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা।
অগ্রণী ব্যাংকের জয়পুরহাট আঞ্চলিক সহকারী মহাব্যবস্থাপক জুলফিকার আলী আকন্দ জানান, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর অভিযুক্তের পেনশনের টাকা থেকে জালিয়াতির এই অর্থ সমন্বয় করা হবে।
তবে যার বিরুদ্ধে এত বড় অভিযোগ, সেই সাবেক ব্যবস্থাপক নূরুল ইসলামের কণ্ঠে অনুশোচনার লেশমাত্র নেই। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাম্ভিকতার সুরে বললেন, ‘চাকরি শেষ করে অবসরে এসেছি। বয়সও অনেক হয়েছে। এত আগের কথা কি আর মনে থাকে। এসব বাদ দিন। সংবাদটি যাতে প্রকাশ না হয় তার জন্য কী করতে হবে সেটা বলুন।’



