ভয়ঙ্কর শব্দ ‘অপহরণ’, সুন্দরবন এলাকায় এটিই যেন প্রচলিত!

ছবি: আগামীর সময়
অপহরণ! এই শব্দটি শুনলে আঁতকে উঠবে না, এমন মানুষ পাওয়া কষ্ট। অথচ এই ভয়ঙ্কর শব্দটিই এখন অহরহ শোনা যাচ্ছে সুন্দরবনের পাশের এলাকার শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষের মুখে। কারণ প্রতিনিয়ত বনদস্যুদের হাতে অপহরণের শিকার হচ্ছে মধু ও মৎস্য আহরণ করতে বনে যাওয়া কারও বাবা, কারো সন্তান, কারও ভাই আবার কারও স্বামী।
জীবিকার তাগিদে এসব হতদরিদ্র মানুষগুলো বনে গেলেই তাদের ওপর হামলে পড়ছে সশস্ত্র দস্যুরা। লাখ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় তাদের কাছে। চাহিদা মাফিক চাঁদা দিতে ব্যর্থ হলে করা হয় নির্মম নির্যাতন। শেষমেশ তাদের ভাগ্যে জোটে অপহরণের মতো ভয়ঙ্কর পরিণতি।
সম্প্রতি সুন্দরবনের পূর্ব-পশ্চিম দুই অঞ্চলেই যেন চলছে বনজীবী অপহরণের এক নীরব প্রতিযোগিতা। প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে এমন অঘটন। গোটা সুন্দরবনই এখন দস্যু বাহিনীর দখলে। দস্যুদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে সুন্দরবন সংশ্লিষ্ট বিশাল একটি জনগোষ্ঠী।
বনসংলগ্ন এলাকার ভুক্তভোগী কয়েকজন জেলে ও মহাজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একেকটি দস্যু বাহিনীর একাধিক তথ্যদাতা (সোর্স) ও চাঁদা আদায়কারী রয়েছে লোকালয়ে। কে কখন বনে যায়, কে চাঁদা দিয়েছে বা কে দেয়নি, তাদের নিয়ে কে কী আলোচনা করছে- এর সব তথ্য দস্যুদের কাছে টাইম টু টাইম পৌঁছে দেয় তারা।
ফলে, কোনও বনজীবী যদি তাদের নির্মমতার কথা প্রকাশ করে তাহলে পরবর্তীতে বনে যাওয়া তার জন্য বন্ধও হতে পারে চিরতরে। আর গেলেও তার জীবন মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা থাকে। যে কারণে নীরবে চাঁদা ও মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে আসার পরও দস্যুদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু পূর্ব বনবিভাগ থেকে গত এক মাসে অর্ধ শতাধিক জেলে অপহরণের শিকার হয়েছেন বিভিন্ন দস্যু বাহিনীর হাতে। এদের মধ্যে বেশিরভাগই গোপনে মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে এসেছেন। এখনও বনদস্যু জাহাঙ্গীর বাহিনীর কাছে অন্তত ১৩ জন জেলে জিম্মি থাকার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া এসব বাহিনীকে নিয়মিত চাঁদা দিতে হচ্ছে শত শত বনজীবীকে।
গত সোমবার (৩ মে) রাতে শরণখোলা রেঞ্জের আলোরকোল এলাকা থেকে একটি নৌকাসহ ১১ জেলেকে এবং মঙ্গলবার (৪ মে) সন্ধ্যায় বনের ছোট খাজুরা এলাকা থেকে আরও দুই জেলেকে অপহণ করে নিয়ে যায় দুর্ধর্ষ বনদস্যু জাহাঙ্গীর বাহিনী। অপহৃতদের মুক্তিপণ হিসেবে জনপ্রতি দাবি করা হয়েছে এক লাখ টাকা করে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলা উত্তর রাজাপুর ও চালিতাবুনিয়া গ্রামের চার মৎস্য ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের আলোরকোল ও খাজুরা এলাকা থেকে তাদের জেলেদের ১৩টি নৌকায় হানা দিয়ে ১৩ জেলেকে তুলে নিয়ে যায় বনদস্যু জাহাঙ্গীর বাহিনী। পরে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অপহৃতদের মুক্তির জন্য জনপ্রতি ১ লাখ টাকা ১৩ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছে দস্যুরা। দ্রুত মুক্তিপণের টাকা পরিশোধ করে জেলেদের ছাড়িয়ে নিতে মোবাই ফোনের মাধ্যমে মহাজনদের চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। অন্যথায় করুণ পরণতি ভোগ করতে হবে। দস্যুদের এমন হুমকিতে এবং বিশাল অংকের মুক্তিপণ দাবি করায় উৎকণ্ঠায় পড়েছেন অপহৃত জেলেদের মহাজন ও পরিবার।
অপহৃত জেলেরা হলেন, শরণখোলা উপজেলার উত্তর রাজাপুর গ্রামের সজিব হাওলাদার (২৭), রুবেল হাওলাদার (৩০), হাফিজুল (২২), লুৎফর হাওলাদার (৩০), বাদল হাওলাদার (৩৫), আলমগীর ফরাজী (৫০), ইয়াসিন হাওলাদার (২৩), ছগির হাওলদার (৩২), রাকিব হাওলাদার (২৪), চালিতাবুনিয়া গ্রামের ছরোয়ার (৩৭), ছগির বয়াতী (৪০) এবং পাথরঘাটার উপজেলার পদ্মাস্লুইস এলাকার রুবেল (২৫) ও খুলনার বটিয়াঘাটার দেব চন্দ্র (২৫)।
এই ঘটনার একদিন আগে গত ২ মে বনদস্যু করিম শরীফ ও নানাভাই বাহিনীর কাছে ১৩দিন জিম্মি থাকা ৬ জেলে ফিরে এসেছেন। এক লাখ ২০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ওই জেলেদের মুক্ত করেন তাদের মহাজন।
বনদস্যু জাহাঙ্গীর বাহিনীর অপহরণের শিকার শরণখোলার উত্তর রাজাপুর গ্রামের কুদ্দুস হাওলাদারের ভাষ্য, এক লাখ টাকা করে মুক্তিপণ চেয়েছে দস্যুরা। আমি গরিব মানুষ, কোথায় পাব এত টাকা। মহাজনকে অনুরোধ করেছি যেকোনোভাবে আমার ছেলেসহ সবাইকে ছাড়িয়ে আনার জন্য। মহাজনও মুক্তিপণের টাকা কমানোর জন্য দস্যুদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। অপহৃতদের পরিবারের সবাই রয়েছে দুশ্চিন্তায়।
পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা স্টেশন কর্মকর্তা (এসও) মো. খলিলুর রহমান জানালেন, সম্প্রতি সুন্দরবনে অপহরণের ঘটনা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দস্যুদমনে চলছে অপারেশন, তার মধ্যেই একের পর এক ঘটছে দস্যুতা। এতে জেলে সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তারা বনে ভয় পাচ্ছে এখন। জেলে অপহরণের বিষয়টি কোস্ট গার্ডকে জানানো হয়েছে।
এ ব্যাপারে কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজনের ভাষ্য, দস্যুদমনে তাদের অপারেশন অব্যাহত রয়েছে। অপহৃত জেলেদের অবস্থান সনাক্তে চলছে গোয়েন্দা তৎপরতা।



