যশোরেশ্বরী মন্দিরে মোদির দেওয়া মুকুট চুরি, ১৮ মাস পর চার্জশিট

ছবি: আগামীর সময়
সাতক্ষীরার শ্যামনগরের ঐতিহ্যবাহী যশোরেশ্বরী কালীমন্দিরে প্রতিমার মাথায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দেওয়া মুকুট চুরির ঘটনায় প্রায় ১৮ মাস পর আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়েছে। তবে এখনো শনাক্ত করা যায়নি মূল অভিযুক্তকে, উদ্ধার হয়নি চুরি যাওয়া মুকুটও।
সাতক্ষীরা আদালত সূত্রে জানা গেছে, গত ১৭ মার্চ অভিযোগপত্র দাখিল করা হলেও তা ২১ এপ্রিল অনলাইনে নথিভুক্ত হয়েছে। আগামী ১০ জুন মামলার অভিযোগপত্র উপস্থাপনের জন্য দিন ধার্য রয়েছে। সাতক্ষীরা জেলা গোয়েন্দা, অপরাধ ও তদন্ত (ডিবি) শাখার উপপরিদর্শক মাসুদ পারভেজ দুজনের বিরুদ্ধে এ অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
অভিযোগপত্রে উল্লেখিত আসামিরা হলেন- শ্যামনগরের ঈশ্বরীপুর গ্রামের মৃত ছিদাম সরকারের স্ত্রী রেখা সরকার (৪০) এবং ঢাকার কদমতলীর শেখ শফি মাহমুদের ছেলে সম্রাট ফারুখ মাওলা (৪২)।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২১ সালে মোদি শ্যামনগরে সফরকালে মন্দিরে পূজা দেন এবং প্রতিমার মাথায় একটি স্বর্ণের মুকুট উপহার দিয়ে সেটি নিজ হাতে পরিয়ে দেন। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর দুপুর ২টা ১০ মিনিট থেকে ২টা ৩৯ মিনিটের মধ্যে মন্দিরের সিসিটিভির ফুটেজ অনুযায়ী আল আমিন ওরফে স্বপন নামের (মামলার তদন্তে নাম জানা গেছে) এক যুবক মন্দির থেকে ওই মুকুট চুরি করে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ ওঠে।
ঘটনার পর পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মন্দিরের সেবায়েত, পরিচ্ছন্নতা কর্মী এবং সংশ্লিষ্ট কয়েকজনকে আটক করে। এরপর ২০২৪ সালের ১২ অক্টোবর মন্দির কমিটির পক্ষ থেকে জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় বাদী হয়ে শ্যামনগর থানায় করেন একটি মামলা।
তদন্ত চলাকালে পরিচ্ছন্নতা কর্মী রেখা সরকার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তিনি জানান, ২ লাখ টাকার প্রলোভনে তিনি মন্দিরের তালা খুলে রেখে চুরিতে সহায়তা করেন। একইসঙ্গে ঢাকার সম্রাট ফারুখ মাওলার সঙ্গে তার যোগাযোগের কথাও উল্লেখ করেন।
এরপর ২১ অক্টোবর ঢাকার রামপুরা এলাকা থেকে সম্রাট ফারুখ মাওলা ও তার বাবা শেখ শফি মাহমুদকে গ্রেপ্তার করা হয়। সম্রাট ফারুখ মাওলাও পরে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
মামলার তদন্ত চলাকালে সঞ্জয় বিশ্বাস, পারুল বিশ্বাস ও অপূর্ব সাহা জামিনে মুক্তি পান। পরবর্তীতে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদেরসহ শেখ শফি মাহমুদকে অভিযোগপত্র থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে রেখা সরকার হাইকোর্ট থেকে জামিন লাভ করেছেন, তবে সম্রাট ফারুখ মাওলার জামিন এখনো মঞ্জুর হয়নি।
তদন্ত কর্মকর্তা জানান, মামলায় মোট ১৫ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। তবে সিসিটিভি ফুটেজে মূল অভিযুক্ত আল আমিন ওরফে স্বপনকে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি এবং এখনো পর্যন্ত চুরি যাওয়া মুকুট উদ্ধার করা যায়নি।
এদিকে, মামলার বাদী জ্যোতি প্রকাশ চট্টোপাধ্যায় মুকুটটির ওজন ৩০ ভরি এবং ‘রুপার ওপর স্বর্ণের প্রলেপ দেওয়া’ গহনা হিসেবে উল্লেখ করেন। এর মূল্য প্রায় ১ লাখ টাকা বলা হয়। তবে মুকুটটি আসলেই স্বর্ণ না রুপার এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ না থাকায় বিষয়টি নিয়ে শ্যামনগরসহ দেশজুড়ে আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
অপরদিকে দেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী এই মন্দিরে এমন চুরির ঘটনা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দাখিল হলেও মূল অভিযুক্ত শনাক্ত ও মুকুট উদ্ধারে ব্যর্থতা মামলাটিকে এখনো রহস্যাবৃত রেখেছে বলে দাবি স্থানীয় সনাতন ধর্মালম্বীদের।
এ বিষয়ে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী নেতা বাংলাদেশ হিন্দু পরিষদ শ্যামনগর উপজেলা শাখার সদস্য সচিব উৎপল মন্ডল বলেছেন, যশোরেশ্বরী কালীমন্দির আমাদের শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, এটি ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের প্রতীক। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্দির থেকে মুকুট চুরির ঘটনায় দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও মূল আসামি ধরা না পড়া এবং মুকুট উদ্ধার না হওয়া আমাদের জন্য খুবই উদ্বেগজনক।
অন্যদিকে বাংলাদেশ সনাতন পার্টি (বিএসপি)-এর সাতক্ষীরা জেলার সদস্য সচিব মনোদ্বীপ কুমার মন্ডল বলেছেন, যশোরেশ্বরী কালী মন্দিরের মুকুট চুরির ঘটনায় চার্জশিট দাখিল একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হলেও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ দিক এখনো অপূর্ণ রয়েছে।



