উপকূলের বাস্তবতা
গর্ভে অনাগত সন্তান, তবুও থেমে নেই মায়ের জীবনযুদ্ধ

সুন্দরবন ঘেঁষা চুনা নদীতে হাঁটুসমান কাদায় পা ডুবিয়ে গর্ভে অনাগত সন্তানের ভার নিয়েই মাছের পোনা ধরছেন দ্বীপালী মুন্ডা। ছবি: আগামীর সময়
মাথার ওপর আগুন ঝরাচ্ছে বৈশাখের তপ্ত রোদ। দুপুর গড়িয়েছে। ঝলসে দেওয়া গরম আর লবণাক্ত বাতাস উপেক্ষা করে হাঁটুসমান কাদায় পা ডুবিয়ে, গর্ভে অনাগত সন্তানের ভার নিয়েই সুন্দরবন সংলগ্ন চুনা নদীতে হাঁটছেন দ্বীপালী মুন্ডা।
এক হাতে শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজছেন। অন্য হাতে মাছের পোনা ধরার বিশেষভাবে তৈরি ছোট্ট জাল। তার চোখে এক ধরনের অদম্য দৃঢ়তা। নদীর প্রতিটি ঢেউ যেন তাকে থামাতে চায়, কিন্তু তিনি থামেন না। কারণ এই নদীই তার জীবিকা। আর অনাগত সন্তানের বাঁচার আশার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে তার এই লড়াই।
দেশের উপকূলীয় অঞ্চল সাতক্ষীরার শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালীনি ইউনিয়নের সুন্দরবনঘেঁষা দাতিনাখালী গ্রাম। গ্রামের তিনদিক নদী বেষ্টিত, মাঝখানে কাদামাটি আর প্রতিনিয়ত টিকে থাকার সংগ্রাম। এখানে জীবন মানেই প্রতিদিনের লড়াই। গ্রামটির অধিকাংশ নারীই দ্বীপালীর মতো মাছ ধরা পেশার সঙ্গে জড়িত। বিশেষ করে নদীতে পোনা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন তারা।
এই গ্রামের মুন্ডা পাড়ায় দ্বীপালী ও তার স্বামী অরুণ মুন্ডার বসবাস। তাদের রয়েছে চার সন্তান। এই চার সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেওয়া আর তাদের ভবিষ্যৎ গড়ার দায়ই যেন প্রতিদিন নতুন করে লড়াইয়ে নামায় এই দম্পতিকে। তাদের জীবন যেন উপকূলের হাজারো নিম্নআয়ের পরিবারের প্রতিচ্ছবি। অভাব, অনিশ্চয়তার পাশাপাশি সংগ্রামের মাধ্যমে টিকে থাকার এক কঠিন বাস্তবতা তাদের নিত্যসঙ্গী।
দ্বীপালী এখন আবারও সন্তানসম্ভবা। আর দেড় মাস পরই তার কোলজুড়ে আসবে নতুন প্রাণ। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেই বড় হয়ে উঠেছে দুশ্চিন্তা। তার শরীরে তীব্র রক্তস্বল্পতা। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তার প্রয়োজন তিন ব্যাগ রক্ত। ইতিমধ্যে এক ব্যাগ জোগাড় হলেও বাকি দুই ব্যাগের খরচ এখনও অনিশ্চিত। প্রতিটি দিন যেন তার জন্য সময়ের সঙ্গে এক নিঃশব্দ যুদ্ধ।
তবুও থেমে নেই দ্বীপালী মুন্ডার জীবন। গর্ভের সন্তানকে নিয়েই প্রতিদিন নদীতে নেমে বাগদা চিংড়ির পোনা ধরেন দ্বীপালী। কাদামাটি, লবণাক্ত পানি আর অনিশ্চিত পরিবেশ- সবকিছুকে উপেক্ষা করে কাজ করে যান তিনি। প্রতিটি পোনা যেন তার কাছে শুধু আয়ের উৎস নয়, বরং সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য একেকটি ছোট সঞ্চয়।
দ্বীপালীর স্বামী অরুণ পেশায় একজন জেলে। ভোর হওয়ার আগেই নদীতে পাড়ি জমান তিনি। দিনভর কঠোর পরিশ্রমের পর যে সামান্য আয় হয়, তা দিয়ে কোনোভাবে টিকে থাকে সংসার। সন্তানদের পড়াশোনা, খাবার, আর দ্বীপালী চিকিৎসা সব মিলিয়ে প্রতিদিনই তাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে নতুন চ্যালেঞ্জ। তবুও অরুণের কণ্ঠে হতাশা নেই; বরং আছে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়।
দ্বীপালী-অরুণের এই গল্প আসলে ব্যতিক্রম নয়,বরং উপকূলীয় অঞ্চলের একটি সাধারণ চিত্র।
বনজীবী নারী উন্নয়ন সংগঠনের পরিচালক ও স্থানীয় নারী সংগঠক শেফালী বিবি বলেছেন, উপকূলের নারীরা এখন পরিবার চালানোর বড় দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন। কিন্তু তাদের কাজের পরিবেশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। লবণাক্ত পানিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা থাকার কারণে তারা নানা স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। তবুও বিকল্প আয়ের সুযোগ না থাকায় তারা এই কাজ ছাড়তে পারছেন না।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় উপকূলীয় এই অঞ্চলে প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে কৃষিকাজ। ফলে নারীরা বাধ্য হচ্ছেন ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় যুক্ত হতে, যেমন- চিংড়ির পোনা সংগ্রহ। এই কাজে দীর্ঘসময় লবণাক্ত পানিতে থাকার কারণে তাদের ত্বক ও প্রজনন স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে।
শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. তরিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘গর্ভবতী নারীদের জন্য এ ধরনের শারীরিক পরিশ্রম ও লবণাক্ত পানিতে দীর্ঘসময় থাকা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এতে রক্তস্বল্পতা বাড়ে, সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে এবং মা ও গর্ভের শিশুর জন্য তৈরি হতে পারে জটিলতা। দ্বীপালীর মতো রোগীদের নিয়মিত বিশ্রাম ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা জরুরি।’
এদিকে উপকূলীয় এই অঞ্চলে এই কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা। উপজেলার দুর্গম ইউনিয়ন বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে হাসপাতাল বা দক্ষ চিকিৎসকের অভাব থাকায় জরুরি চিকিৎসাও অনেক সময় নাগালের বাইরে থেকে যায়। অর্থের অভাবে সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় দ্বীপালীর মতো অনেক নারীর জীবনই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
দ্বীপালী বিশ্বাস করেন, তার সন্তানরা এবং অনাগত নতুন প্রাণ একদিন এই দারিদ্র্য ও কষ্টের চক্র ভেঙে নতুন জীবন গড়বে।
অরুণও স্বপ্ন দেখেন, তার সন্তানরা শিক্ষিত হয়ে এমন এক ভবিষ্যৎ গড়বে যেখানে নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে প্রতিদিন জীবন বাজি রাখতে হবে না।





