নিম্নাঞ্চল প্লাবিত
আধাপাকা ধান কেটে শেষ রক্ষার চেষ্টা

কিছুটা ক্ষতি কমাতে আধাপাকা ধান কেটে নিয়েছেন কৃষকরা। ছবি: আগামীর সময়
টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার হাকালুকি হাওরপাড়ের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় এরই মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ জমির আধাপাকা ধান কেটে নিয়েছেন কৃষকরা। অবশিষ্ট প্রায় ২০ শতাংশ পাকা-আধাপাকা ধান তলিয়ে গেছে অতিবৃষ্টি ও ঢলে। ফলে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন হাজার হাজার প্রান্তিক কৃষক।
বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেই হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে নেমে ধান কাটছেন কৃষকরা। অনেকেই নৌকায় করে বাড়িতে তুলছেন কাটা ধান। তবে টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় কঠিন হয়ে পড়েছে ধান শুকানো। অনেক জমির ধানেও গজাতে শুরু করেছে চারা।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে বড়লেখায় ৫ হাজার ৬২৫ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে বোরোর। এর মধ্যে ৩ হাজার ৬৯৫ হেক্টর হাকালুকি হাওর এলাকায় এবং ১ হাজার ৯৩০ হেক্টর নন-হাওর এলাকায়। ধানে থোড় বের হওয়ার সময় থেকেই শুরু হয় টানা বৃষ্টি। এতে হাওরাঞ্চলের প্রায় ৩ হাজার হেক্টরের আধাপাকা ধান আগাম কেটে ফেলেন কৃষকরা। গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে আংশিক বা অর্ধনিমজ্জিত হয়েছে অবশিষ্ট ৫ শতাধিক হেক্টরের বেশিরভাগ জমি।
বৃহস্পতি ও শুক্রবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ইউনিয়নের কামিলপুর, দাসেরবাজারের মাইজুমজুড়ি, বর্নির দ্বিতীয়ারদেহী ও নোয়াগাঁও, সুজানগরের কটালি বিলসহ বিভিন্ন এলাকায় পানিতে নেমে ধান কাটছেন কৃষকরা।
কুটাউড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল মতলিব জানিয়েছেন, প্রায় পেকে গিয়েছিল তার দুই বিঘা জমির ধান। কয়েকদিন আগে কাটার পরিকল্পনা থাকলেও টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে হাওর। এখন পানি না কমলে পচে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে ধান।
আরেক কৃষক রহিম উদ্দিন বলেছেন, ‘পানির মধ্যে কষ্ট করে ধান কেটে নৌকায় করে বাড়িতে আনা হচ্ছে। কিন্তু বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে শুকানো যাচ্ছে না। এতে ফলন যেমন কমছে, তেমনি বাজারদামও সন্তোষজনক নয়।’
এ সময় দেখা দিয়েছে শ্রমিক সংকটও। পানিতে নেমে কাজ করতে ঝুঁকি থাকায় শ্রমিকরা দ্বিগুণ মজুরি চাইলেও পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
অনেক কৃষক আগে কাটা ধান জমা করেছিলেন খলায়। কিন্তু হঠাৎ পানি ঢুকে তলিয়ে যেতে শুরু করেছে সেই ধানও। ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হলেও তাতে তেমন মিলছে না সুফল।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্তদের বড় অংশ চাষ করেছেন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে। অনেকে বর্গাচাষি। ফলে ফসলহানির পাশাপাশি ঋণ পরিশোধ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবার্তার পর দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দেওয়া হয় কৃষকদের। এতে অনেকেই আগাম ধান কেটে কিছুটা ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
তিনি জানান, হাওরপাড় এলাকায় ধান কাটা শেষ হয়েছে প্রায় ৯০ শতাংশ। বাকি জমির কিছু অংশ আংশিক বা সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হলেও ধান ঘরে তোলার চেষ্টা করছেন কৃষকরা। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৫ হেক্টর জমি দুর্যোগে আক্রান্ত। যার মধ্যে ৬ হেক্টর আংশিক এবং ৫ হেক্টর সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য তিন মাসের সরকারি সহায়তা বা প্রণোদনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে বৃহস্পতিবার বিকেলে হাকালুকি হাওরপাড়ের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে ইউএনও মাহবুব আলম মাহবুব ও কৃষি কর্মকর্তা মনোয়ার হোসেন কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় সর্বাত্মক সহযোগিতার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্টদের।



