মধ্যপ্রাচ্য সংকটেও রেমিট্যান্সে স্বস্তি
- গত মার্চে প্রবাসী আয় ৩.৭৬ বিলিয়ন ডলার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ইরান-ইসরায়েল চলমান সংকটেও স্বস্তির ছোঁয়া প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে। উপসাগরীয় ৬টি দেশসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের হামলার কারণে নতুন করে প্রবাসী পাঠানো যায়নি আগের মতো। তবে এর প্রভাব পড়েনি প্রবাসী আয়ে। টানা ৫ মাস ধরে এসেছে প্রায় তিন বিলিয়নের বেশি রেমিট্যান্স। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ও অস্থিরতার প্রভাবে অনেক শ্রমিক দেশে এসে সময়মতো ফিরতে পারেননি। আবার নতুন করে বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রেও ভোগান্তিতে পড়েছেন কেউ কেউ। এতে মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কিন্তু এত কিছুর পরেও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে স্বস্তি দেখা গেছে। ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে এ ধারা চলতি মাসেও একই রকম ইতিবাচক থাকতে পারে। সব মিলে চলতি অর্থবছরে ২৯ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। রেমিট্যান্সের ধারা অব্যাহত না থাকলে দেশের অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ৩ দশমিক ১৩ বিলিয়ন (৩১৩ কোটি) ডলার। আর ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে গত মার্চে দেশের রেমিট্যান্স সংগ্রহের রেকর্ড ভেঙে প্রবাসী আয় এসেছিল ৩ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার। গত ফেব্রুয়ারিতে তা ছিল ৩ দশমিক শূন্য ২ বিলিয়ন ডলার। আর তার আগে জানুয়ারিতে রেমিট্যান্স সংগ্রহ ছিল ৩ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার। গত ডিসেম্বরে ৩ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।
বর্তমানে ব্যাংকিং চ্যানেল এবং সরকারের নীতি শক্তিশালী হওয়ার কারণে রেমিট্যান্সপ্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে আরও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যাতে রেমিট্যান্সের প্রবাহ আরও দ্রুত বেড়ে যায়
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলামের মতে, দেশের অর্থপাচারের অন্যতম পথ হুন্ডি এবং ব্যবসার আড়ালে আন্ডার ইনভয়েসিং ও ওভার ইনভয়েসিংয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ আসায় ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স বেড়েছে। এমনকি যুদ্ধেও মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক পাঠানো কমে গেলেও বেড়েছে রেমিট্যান্স।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের (জুলাই-এপ্রিল) ২৯ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ২৪ দশমিক ৫৪ কোটি ডলার। এ সময়ে বেড়েছে ৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার, যা শতকরা হিসাবে ১৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
চেঞ্জ ইনিয়েশিটিভের গবেষক এবং অর্থনীতিবিদ হেলাল আহমেদ জনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটেও রেমিট্যান্স বৃদ্ধি দেশের জন্য ইতিবাচক বার্তা। তবে মধ্যপ্রাচ্য সংকট বড় হলে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সব মিলে দেশের প্রতি প্রবাসীদের অবিচল সমর্থন এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিবেশে কার্যকর নীতির কারণে রেকর্ড রেমিট্যান্সের মাইলফলক স্পর্শ করেছে গত মার্চে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলেছে, দেশের ইতিহাসে রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করে ২০২১ সালের আগস্টে। আওয়ামী লীগ পতনের পর সেখান থেকে কমে ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার ও গ্রস রিজার্ভ ২৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলারে নেমে যায়। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে রিজার্ভ বেড়েছে ১০ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে রিজার্ভ ছাড়িয়েছে ৩৫ বিলিয়ন ডলার।
রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক তাসনীম সিদ্দিকী বলেছেন, ‘বর্তমানে ব্যাংকিং চ্যানেল এবং সরকারের নীতি শক্তিশালী হওয়ার কারণে রেমিট্যান্সপ্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে আরও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যাতে রেমিট্যান্সের প্রবাহ আরও দ্রুত বেড়ে যায়। সার্বিকভাবে ফাঁকফোকর দূর করা গেলে একটা সময় দেশে প্রতি মাসে সাড়ে ৩ থেকে ৪ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসবে।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বর মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল ২ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার। অক্টোবর ও সেপ্টেম্বর মাসে দেশে প্রবাসী আয় এসেছিল যথাক্রমে ২ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার এবং ২ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার। তবে আগস্ট ও জুলাইয়ে যথাক্রমে প্রবাসীয় আয় এসেছিল ২ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার এবং ২ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার। এদিকে, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছর জুড়ে দেশে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার।



