নতুন অর্থবছরের মুদ্রানীতি ঘোষণা ৩০ জুন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর) জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে আগামী ৩০ জুন। তবে এবারও সংকোচনমূলক নীতির ধারা থেকে সরে আসছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আসন্ন মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার আগের মতোই ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হতে পারে। মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখাই এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য। তবে নীতি সহায়তা, তারল্য সহায়তা এবং বাজার থেকে ডলার কেনার মতো পদক্ষেপের কারণে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এদিকে ডলারের বিপরীতে টাকার মান সামান্য কমানোর ইঙ্গিত রয়েছে। কিছুটা বাড়তে পারে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের হার। সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে এবার অর্থবছর শুরুর আগের দিন নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান তার প্রথম মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত একাধিক সূত্র বলছে, মূল্যস্ফীতি কমে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না আসা পর্যন্ত নীতি সুদহার না কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন গভর্নর। সর্বশেষ গত এপ্রিল মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয় ৯ দশমকি শূন্য ৪ শতাংশ। এই হার মার্চে ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। সুতরাং এপ্রিল মাসের মূল্যস্ফীতির তথ্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা।
অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি কমার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেটি এখনো স্থিতিশীল হয়নি। বরং এপ্রিলের তথ্য দেখাচ্ছে, মূল্যচাপ আবার কিছুটা বেড়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও মার্চের ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ থেকে বেড়ে এপ্রিলে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ হয়েছে। এর মানে চাপটি শুধু চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস বা সবজির বাজারে সীমাবদ্ধ নয়; বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, পরিবহন, পোশাক, জ্বালানি-সম্পর্কিত খরচসহ জীবনযাত্রার প্রায় সব ক্ষেত্রেই বেড়েছে ব্যয়।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের ভাষ্য, ‘এখন সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বলে তেমন কিছু নেই। শুধু বাড়তি নীতি সুদহার সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির সঙ্গে যায়। এর বাইরে কারখানায় নগদ সহায়তা, ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অব্যাহত ডলার কেনায় বাজারে প্রচুর নগদ টাকা বাড়ছে। এতে বিনিয়োগ কিছুটা বাড়বে। তবে ইরান হামলার ঘটনায় দেশে রাজনৈতিক সরকার থাকা সত্ত্বেও তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে নতুন বিনিয়োগ আসার ক্ষেত্রে থেকে যাচ্ছে অনিশ্চয়তা।’
এমন পরিস্থিতিতে নীতি সুদহার, যা আছে সেটাই রাখা ছাড়া উপায় নেই। এর পক্ষে-বিপক্ষে নানা যুক্তি ও সমালোচনা থাকতে পারে। সবকিছু বিবেচনায় শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে না। এটি নিয়ন্ত্রণ করতে সামষ্টিক অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সমন্বয় জরুরি। এমনটাই মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান ৩০ জুন বিকেল ৩টায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স হলে মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন। তার আগে ২৫ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক পর্ষদে রেওয়াজ অনুযায়ী সদস্যদের অনুমোদন নেওয়া হবে। আর ২১ জুন মনিটরি পলিসি কমিটির ১২তম সভায় মুদ্রানীতি বিস্তারিত আলোচনার জন্য তোলা হবে। তার আগে ৪ জুন অর্থনীতিবিদ, সাংবাদিক, গবেষক, ব্যবসায়ী, ডেপুটি গভর্নরসহ সংশ্লিষ্ট স্টকহোল্ডারদের সঙ্গে মুদ্রানীতি নিয়ে সভার আয়োজন করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের শেষদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতিতে চলছে। সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারিতে ঘোষিত মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসএলফ রেট সাড়ে ১১ শতাংশ ও এসডিএফ ৮ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমতে শুরু করলে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে বাড়তে থাকে মূল্যস্ফীতি। বর্তমানেও প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৮৮ পয়সা পর্যন্ত বিক্রি হয়।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতি ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ হয়। আর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুরোমাত্রায় সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে মূল্যস্ফীতি ধাপে ধাপে কমতে কমতে ২০২৫ সালের অক্টোবরে ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমে আসে। কিন্তু সম্প্রতি টানা ৬ মাস বেড়ে ফের মূল্যস্ফীতি ছাড়িয়েছে ৯ শতাংশ।



