দুই মাসের কাজ সাত দিনে, বিনিয়োগে নতুন বার্তা বিডার

ফাইল ছবি
বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের অন্যতম প্রধান অভিযোগ ছিল রয়্যালটি পেমেন্ট, টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ফি ও আউটওয়ার্ড রেমিট্যান্স অনুমোদনে মাত্রাতিরিক্ত সময় ও প্রশাসনিক জটিলতা। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মতে, ব্যবসা চালুর পর মুনাফা বা প্রযুক্তি ফি বিদেশে পাঠাতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করা ছিল এ দেশের বিনিয়োগ পরিবেশের অন্যতম বড় বাধা।
অবশেষে সেই অচলায়তন ভাঙার দাবি করছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। সংস্থাটি জানিয়েছে, রয়্যালটি পেমেন্ট-সংক্রান্ত সেবা পুরোপুরি ডিজিটাল করায় অনুমোদনের সময় এখন দেড়-দুই মাস থেকে কমে মাত্র ৭-১০ কার্যদিবসে নেমে এসেছে। ফলে সময় সাশ্রয় হয়েছে প্রায় ৮৩ শতাংশ এবং কাজের গতি বেড়েছে ৬ গুণ।
বিশ্লেষকরা এ পদক্ষেপকে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে একটি কৌশলগত অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। কারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ব্যবসা শুরুর অনুমোদনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো অর্জিত লাভ বা প্রযুক্তি ফি সহজে নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার নিশ্চয়তা।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে চট্টগ্রাম বন্দর ইজারা চুক্তি হচ্ছে না: বিডা চেয়ারম্যান
০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশে কর্মরত বহুজাতিক কোম্পানিগুলো মূল প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি, ব্র্যান্ড লাইসেন্স, কারিগরি সহায়তার বিনিময়ে নিয়মিত অর্থ পাঠায়, যার অনুমোদন দেয় বিডা। এতদিন এ প্রক্রিয়াটি ছিল এনালগ ও কাগজনির্ভর। একটি অনুমোদনের জন্য প্রায় ৫০০ পৃষ্ঠার নথি হাতে হাতে জমা দিতে হতো।
এরপর বিভিন্ন দপ্তরে যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনার চক্করে কেটে যেত কয়েক সপ্তাহ থেকে দুই মাস পর্যন্ত। এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে শুধু যে আর্থিক পরিকল্পনা ব্যাহত হতো তা নয়, বিদেশি মূল কোম্পানিগুলোর কাছে বাংলাদেশের প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে নেতিবাচক বার্তা যেত।
বিনিয়োগসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলোতে এসব সেবা অত্যন্ত দ্রুত দেওয়া হয়। ফলে বাংলাদেশে বিনিয়োগ টানতে শুধু কর ছাড় বা প্রণোদনা যথেষ্ট নয়, প্রশাসনিক গতি বাড়ানোও জরুরি হয়ে পড়েছিল।
বিডা জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেবাটি পুরোপুরি অনলাইনে (bidaquickserv.org) চালু হয়েছে। এখন বিনিয়োগকারীরা অনলাইনেই আবেদন, ফি পরিশোধ ও আবেদনের সর্বশেষ অবস্থা ট্র্যাক করতে পারছেন। নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থায় কর্মকর্তাদের যাচাই প্রক্রিয়াও অনেক সহজ ও মানসম্মত হয়েছে।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেছেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে সেবা সময়মতো, সহজ ও সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়ায় দেওয়া জরুরি। ডিজিটাল ব্যবস্থার ফলে কাজের গতি বাড়ার পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়াটি আরও কাঠামোবদ্ধ হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি ইতিবাচক নীতিগত বার্তা পৌঁছাবে। অতীতে বাংলাদেশে বিনিয়োগ অনুমোদন পাওয়া সহজ হলেও ব্যবসা পরিচালনার পরবর্তী ধাপে যেমন লাভ প্রত্যাবাসন, ভিসা বা রয়্যালটি অনুমোদনে জটিলতা ছিল বড় সমস্যা। বিশ্বব্যাংকের সহজ ব্যবসা সূচকে পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণও ছিল এ প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা।
বিডার ওয়ান-স্টপ সার্ভিস (ওএসএস) নিয়ে শুরুতে অনেক প্রশ্ন থাকলেও সংস্থাটি এখন দাবি করছে, তাদের প্ল্যাটফর্মে বর্তমানে ৪৭টি সংস্থার ১৪২টির বেশি বিনিয়োগসেবা পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে বিডার নিজস্ব সেবা রয়েছে ৪০টি।
তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মই যথেষ্ট নয়; বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআরের মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় আরও বাড়াতে হবে। তবেই পুরো বিনিয়োগপ্রক্রিয়ায় প্রকৃত গতি আসবে এবং দেশ কাঙ্ক্ষিত সুফল পাবে।





