আইএমএফের শর্ত উপেক্ষার সুপারিশ
রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল ৫ বিলিয়ন ডলারে বাড়ানোর দাবি এফবিসিসিআইয়ের

ছবিঃ আগামীর সময়
রপ্তানিকারকদের জন্য বৈদেশিক মুদ্রার সহায়তা জোরদার করতে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) আবারও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআই। সংগঠনটি বলছে, বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও সম্ভাব্য ডলার সংকট মোকাবিলায় ইডিএফের আকার অন্তত ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা জরুরি।
আজ সোমবার (৬ এপ্রিল) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে এক বৈঠকে এ দাবি জানান ব্যবসায়ী নেতারা।
গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এফবিসিসিআই মহাসচিব মো. আলমগীর বলেছেন, একসময় ইডিএফের আকার ছিল ৭ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে তা কমে ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ এখন স্থিতিশীল রয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে ভবিষ্যতে ডলার বাজারে চাপ তৈরি হতে পারে। এ কারণে আগাম প্রস্তুতি হিসেবে ইডিএফ ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার প্রস্তাব দিয়েছেন।
তিনি জানান, গভর্নর এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। ধীরে ধীরে তহবিলের পরিমাণ বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন।
জানা গেছে, রপ্তানিকারকদের স্বল্পসুদে ঋণ সহায়তা দিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ইডিএফ গঠন করা হয়। ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এর আকার ছিল ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বা ৩৫০ কোটি। করোনামহামারির সংক্রমণ শুরুর পর প্রথম দফায় সরকারের নির্দেশে ইডিএফের আকার ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হয়। পরবর্তী সময়ে কয়েক দফা বাড়িয়ে ৭ বিলিয়ন ডলারে নেওয়া হয়।
তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ শর্ত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে রিজার্ভ ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করায় তহবিলটি কমিয়ে বর্তমানে প্রায় ২৩০ কোটি বা ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে।
গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকে ব্যবসায়ী নেতারা ঋণের সুদহার এক অংকে নামিয়ে আনা, ব্যাংক একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। একইসঙ্গে একক গ্রাহক ঋণসীমা ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাবও তুলে ধরেন তারা।
তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ একটি ব্যাংক তার পরিশোধিত মূলধনের বড় অংশ একজন গ্রাহককে ঋণ দিলে খেলাপির ঝুঁকি বাড়ে। অতীতে এমন পরিস্থিতির কারণে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ৪৫ শতাংশেরও বেশি বেড়ে যাওয়ার নজির রয়েছে। যদিও ২০২৬ সালের মধ্যে খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ আইএমএফের কাছ থেকে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। শর্ত ভঙ্গ হলে অবশিষ্ট কিস্তির অর্থ ছাড়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সতর্কতার ওপর জোর দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা।
এফবিসিসিআই লিখিত প্রস্তাবে বলেছে, ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত ঋণখেলাপীদের আলাদা করে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। সংগঠনটি স্পষ্ট করেছে, তারা কখনোই ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের পক্ষে নয়। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা বা ব্যবসায়িক ঝুঁকির কারণে যারা অনিচ্ছাকৃতভাবে খেলাপি হয়েছেন, তাদের পুনর্বাসনে সহায়ক নীতি গ্রহণ করা উচিত।
একইসঙ্গে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। তাদের মতে, এ দুই ধরনের নীতির সমন্বয় ঘটলে ব্যাংকিং খাতে ভারসাম্য ফিরবে এবং ঋণের গুণগত মান উন্নত হবে।
এফবিসিসিআই নেতারা জানান, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দেশীয় ও বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জে জর্জরিত। এ অবস্থায় ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এফবিসিসিআই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
• ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা
• ডলার বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং আমদানি-রপ্তানিতে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ নিশ্চিত করা
• ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পে প্রণোদনা ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা
• বেসরকাখাতে ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধি এবং সরকারি ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো
• প্রবাসী আয় বাড়াতে প্রণোদনা ও সহজ আর্থিক সুবিধা
• এসএমই ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতবিহীন ঋণ ও ব্যাংকিং সহায়তা কেন্দ্র চালু
• গ্রীন ফাইন্যান্সিং ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করা
• শিল্পখাতের ব্যাংকিং সমস্যা দ্রুত সমাধানে বিশেষ কমিটি গঠন
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, সঠিক নীতি সহায়তা, কার্যকর তদারকি এবং ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারলে দেশের অর্থনীতি আবারও গতি ফিরে পাবে এবং বিনিয়োগ পরিবেশ শক্তিশালী হবে।



