বিজিআইসির লুটপাটে ক্ষতিগ্রস্ত শেয়ারহোল্ডাররা

সংগৃহীত ছবি
কয়েক কোটি টাকার অনিয়ম করেছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির (বিজিআইসি) ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। এতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে কোম্পানিটির মুনাফা। ফলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন শেয়ারহোল্ডাররা। বীমা আইন ও আন্তর্জাতিক হিসাব মানেরও (আইএএস) লঙ্ঘন ঘটেছে এই কোম্পানিতে।
দেশের প্রথম বেসরকারি সাধারণ বীমা কোম্পানি হলো বিজিআইসি। ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত পুরনো এ বীমা কোম্পানিটির ব্যবসায় কোনো উন্নতি নেই। যার মূল কারণ কর্তৃপক্ষের অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনা। ৪০ বছর আগের এই কোম্পানির মুনাফা ও লভ্যাংশ খুবই সাদামাটা।
ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় বছরের মধ্যে ২০২১ সালে বিজিআইসির সর্বোচ্চ ১.৯২ টাকা শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) হয়। সেই বছরে শেয়ারহোল্ডারদের দেওয়া হয় সর্বোচ্চ ১২.৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ। সর্বশেষ ২০২৫ সালে কোম্পানিটির ইপিএস দাঁড়িয়েছে ১.৫১ টাকায় এবং নগদ লভ্যাংশ দেওয়া হবে ১১ শতাংশ।
কোম্পানিটি কারসাজির শেয়ারে বিনিয়োগের কারণে ব্যবসায় বড় ধাক্কা খেয়েছে, যদিও দীর্ঘদিন ধরে শেয়ারবাজারের সঙ্গে তারা জড়িত। দেখা গেছে, গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর শেয়ারবাজারে বিজিআইসির বিনিয়োগ ছিল ২৩.৮৭ কোটি টাকা। ওইদিন যার বাজার মূল্য নেমে আসে ১২.৪৭ কোটি টাকায়। অর্থাৎ শেয়ার ব্যবসায় ক্ষতি হয়েছে ১১ কোটি ৪০ লাখ টাকা বা ৪৮ শতাংশ।
বিজিআইসি কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে কোম্পানিটির সর্বশেষ প্রকাশিত ২০২৪ সালের আর্থিক প্রতিবেদনেও। নিরীক্ষক জানিয়েছেন, বিজিআইসি কর্তৃপক্ষ ২০২৪ সালে আইডিআরএয়ের এসআরও নং ২৮০-ল/২০১৮-তে বর্ণিত সীমা লঙ্ঘন করে ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত ব্যয় করেছে। বরাদ্দকৃত টাকার চেয়ে তারা ১০ কোটি ৩৩ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করেছে এই খাতে। ফলে ওই বছরে প্রায় সমপরিমাণ মুনাফা কম হয়। অনিয়ম না করলে কোম্পানিটির মুনাফা ৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ১৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকায়।
এ অনিয়মের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন মালিক, তথা শেয়ারহোল্ডাররা। যদি তারা আইনবহির্ভূত অতিরিক্ত ব্যয় না করতেন, তাহলে অনেক বেশি লভ্যাংশ পেতেন শেয়ারহোল্ডাররা। এই অনিয়মের ফলে শেয়ারহোল্ডাররা বঞ্চিত হচ্ছেন এবং লাভবান হচ্ছেন কর্মীরা। অথচ এ শ্রম আইন পরিপালন করছে না কোম্পানির কর্তৃপক্ষ। এর মাধ্যমে কোম্পানিটি প্রতারণা করছে নিজেদের কর্মীদের সঙ্গেই।
২০০৬ সালের শ্রম আইনের ২৩২ ধারা অনুযায়ী, প্রতিটি কোম্পানিতে ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড (ডব্লিউপিপিএফ) গঠন করা এবং তা পরবর্তী ৯ মাসের কর্মীদের মধ্যে বিতরণ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বিজিআইসি কর্তৃপক্ষ তা না করে কর্মীদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছেন।
তবে বীমাসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে আইনটি কার্যকর না করার বিষয়ে শ্রম মন্ত্রণালয়ের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে বিএফআইডি। এ ছাড়া বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনও আবেদন করেছে। এরপর দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে বীমা খাতে ডব্লিউপিপিএফ করতে হবে না, এমন কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তা সত্ত্বেও আইন অনুযায়ী ফান্ড গঠন করেনি বিজিআইসি কর্তৃপক্ষ।
আন্তর্জাতিক হিসাব মানও লঙ্ঘন করেছে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। গ্র্যাচুইটি ফান্ড গঠন করলেও অ্যাকচুয়ারিয়াল ভ্যালুয়েশন করেনি তারা, যা আইএএস ১৯-এর স্পষ্ট লঙ্ঘন।
এসব বিষয়ে লিখিত বক্তব্যে বিজিআইসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আহমেদ সাইফুদ্দীন চৌধুরী বলেছেন, শেয়ারবাজারে ১৯৯৬ সালে অস্বাভাবিক দরপতন হয়। তারপরও বিজিআইসির শেয়ারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। আর শ্রম আইন কলকারখানার ক্ষেত্রে যেভাবে পরিপালনের অবকাশ থাকে, বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে সেরূপ কোনো অবকাশ নেই।
উল্লেখ্য, ১৯৮৯ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া বিজিআইসির পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ৫৪ কোটি ৩ লাখ টাকা। এরমধ্যে ৬৬.৬০ শতাংশ মালিকানা রয়েছে শেয়ারবাজারের বিভিন্ন শ্রেণির (উদ্যোক্তা/পরিচালক ছাড়া) বিনিয়োগকারীদের হাতে। বুধবার (০৬ মে) কোম্পানিটির শেয়ার দর দাঁড়িয়েছে ৩৬.৮০ টাকায়।



