এনবিআরকে বিএসইসির চিঠি
অমনিবাস বিওতে অতিরিক্ত কর, বিনিয়োগে নিরুৎসাহের আশঙ্কা

কোলাজ: আগামীর সময়
শেয়ারবাজারের মাধ্যমে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তনের (টিডিএস) হার নির্ধারণকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে নতুন জটিলতার। স্টক ব্রোকার ও মার্চেন্ট ব্যাংকারদের মাধ্যমে পরিচালিত অমনিবাস বিও হিসাবকে ‘কোম্পানি করদাতা’ হিসেবে বিবেচনা করায় ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ হারে অতিরিক্ত কর কাটা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) উদ্বেগ জানিয়ে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নীতিগত ব্যাখ্যা ও সংশোধনের অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
সম্প্রতি এনবিআর চেয়ারম্যানকে এ-সংক্রান্ত চিঠি দিয়েছেন বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। এ তথ্য জানা গেছে সংশ্লিষ্ট সূত্রে।
বিএসইসি জানিয়েছে, বাস্তবে অমনিবাস বিও হিসাবগুলো ব্রোকার বা মার্চেন্ট ব্যাংকারের নিজস্ব বিনিয়োগ নয়; বরং এসব হিসাবের প্রকৃত মালিকানা থাকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের হাতে। ফলে এসব ক্ষেত্রে ‘কোম্পানি করদাতা’ হিসেবে ১৫ শতাংশ হারে কর আরোপ করায় ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের ওপর অযৌক্তিক অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। আয়কর কাঠামোর সাম্প্রতিক সময়ের পরিবর্তনের ফলে সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে প্রাপ্ত সুদের ওপর করপোরেট ও নন-করপোরেট করদাতার জন্য আলাদা হার নির্ধারণ করা হয়েছে কোম্পানির ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ এবং ব্যক্তি বা অন্যান্য করদাতার ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ। কিন্তু অমনিবাস বিও হিসাবকে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বিবেচনা করায় বাস্তবে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রেও ১৫ শতাংশ হারে কর কেটে নেওয়া হচ্ছে।
চিঠিতে বলা হয়, আয়কর আইনের বিধান অনুযায়ী, সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে প্রাপ্ত সুদের ওপর উৎসে কর প্রথমে ৫ শতাংশ নির্ধারিত থাকলেও ২০২৫ সালের জুনে ১০ শতাংশ করা হয়। পরবর্তী সময়ে একই বছরের অক্টোবরে গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে করপোরেট ও নন-করপোরেট করদাতার জন্য পৃথক হার নির্ধারিত হয়। এতে কোম্পানির ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ এবং কোম্পানি ছাড়া অন্যান্য করদাতার ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর নির্ধারণ করা হয়। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজারের মাধ্যমে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। এতে সরকারের উদ্যোগে গড়ে ওঠা নতুন বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্মই প্রশ্নের মুখে পড়বে।
বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ জানান, শেয়ারবাজারের মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সরকারি সিকিউরিটিজে অংশগ্রহণ বাড়াতে ২০২২ সালের জুনে অর্থ বিভাগের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ব্রোকার ও মার্চেন্ট ব্যাংকারদের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা নিলামে অংশ নেন এবং অস্থায়ীভাবে একটি অমনিবাস বিও হিসাবের মাধ্যমে সরকারি সিকিউরিটিজ ক্রয়ের সুযোগ পাচ্ছেন। এই প্রক্রিয়ায় একটি অমনিবাস বিও হিসাব ব্যবহৃত হয়, যেখানে নিলামে প্রাপ্ত সিকিউরিটিজ সাময়িকভাবে রাখা হয় এবং পরে তা সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের নিজ নিজ বিও হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। ফলে এই হিসাব শুধু মধ্যবর্তী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে, এটি কোনো করপোরেট বিনিয়োগ নয়। প্রকৃত মালিকানা ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের কাছেই থাকে। তবে বর্তমান কর প্রয়োগের পদ্ধতির কারণে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ১০ শতাংশের পরিবর্তে ১৫ শতাংশ হারে কর কাটা হচ্ছে, যা অতিরিক্ত করের বোঝা তৈরি করছে। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি শেয়ারবাজারের মাধ্যমে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগে অনাগ্রহ বাড়তে পারে।
বিএসইসি মনে করছে, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী সরকারি সিকিউরিটিজ বাজারে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হলে বাজারের গভীরতা ও তারল্য কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এ অবস্থায় অমনিবাস বিও হিসাবগুলোকে ‘কোম্পানি করদাতা’ হিসেবে বিবেচনা না করে ‘কোম্পানি ছাড়া অন্যান্য করদাতা’ হিসেবে গণ্য করার জন্য এনবিআরের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়।
একাধিক ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত কর কেটে নেওয়ার কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। অনেকেই ইতোমধ্যে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ থেকে সরে আসার কথাও ভাবছেন।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এই জটিলতা দ্রুত সমাধান না হলে সরকারি সিকিউরিটিজের বাজারে সাধারণ বিনিয়োগের অংশগ্রহণ কমে যেতে পারে। এতে সরকারি সিকিউরিটিজের বাজার সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে এটি শেয়ারবাজারের সঙ্গে মুদ্রা বাজারের (মানি মার্কেট) মধ্যে যে সংযোগ তৈরির চেষ্টা চলছে, সেটিও বাধাগ্রস্ত হবে।



