নিরীক্ষায় অনিয়ম
রিং শাইনের একাধিক অডিটর-ফার্ম শেয়ারবাজারে নিষিদ্ধ
- আব্দুস সাত্তার ৫ বছর ও মাহফেল হক ৩ বছর নিষিদ্ধ
- মকবুল আহমেদ ৫ বছর ও আতা খান ৩ বছর নিষিদ্ধ
- রামেন্দ্র নাথ ৫ বছর ও সিরাজ খান ৩ বছর নিষিদ্ধ

মাহফেল হক অ্যান্ড কোং, আতা খান অ্যান্ড কোং, সিরাজ খান বসাক এন্ড কোং ও রিং শাইনের লোগো
শেয়ারবাজারে বস্ত্র খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি রিং সাইন টেক্সটাইল লিমিটেডের বিগত চার অর্থবছরের (২০১৭ থেকে ২০২০ সাল) নিরীক্ষা কার্যক্রমে গুরুতর অনিয়ম ও দায়বদ্ধতার ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়েছে। বিষয়টি অবহিত করা হলেও নিরীক্ষক (অডিটর) ও নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের (অডিট ফার্ম) নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) করেনি কোনো ভ্রুক্ষেপ।
এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় স্ব-উদ্যোগে কোম্পানিটির মনোনীত একাধিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান ও তাদের এনগেজমেন্ট পার্টনারদের (নিরীক্ষক) বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিএসইসির এক সভায় বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিএসইসি সূত্র বলছে, সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষা কার্যক্রমে অনিয়মের বিষয়ে অডিট খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এফআরসি ইতিপূর্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও তা কমিশনের কাছে সন্তোষজনক বিবেচিত হয়নি। ফলে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ রুলস, ২০২০ এর বিধি ১৪(৫) অনুযায়ী নিজস্ব ক্ষমতায় অতিরিক্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে কমিশন।
কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোম্পানিটির ২০১৮ সালের নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনাকারী নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান মাহফেল হক অ্যান্ড কোং-কে তিন বছরের জন্য শেয়ারবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানির নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা থেকে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির এনগেজমেন্ট পার্টনার মো. আব্দুস সাত্তারকে পাঁচ বছরের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে একই ধরনের কাজে।
নিরীক্ষা একটি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কাজ; এখানে অবহেলা বা গাফিলতি বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করে
এছাড়া ২০১৯ সালের নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান আতা খান অ্যান্ড কোং এবং সংশ্লিষ্ট এনগেজমেন্ট পার্টনার মকবুল আহমেদকে যথাক্রমে তিন ও পাঁচ বছরের জন্য বিএসইসির প্যানেল অব অডিটরসে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।
একইভাবে ২০২০ সালের নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনাকারী সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোং এবং সংশ্লিষ্ট এনগেজমেন্ট পার্টনার রামেন্দ্র নাথ বসাককেও যথাক্রমে তিন ও পাঁচ বছরের জন্য প্যানেল অব অডিটরসে অন্তর্ভুক্তির অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ২০১৭ সালের নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান আহমেদ অ্যান্ড আকতারের স্বত্বাধিকারী এনগেজমেন্ট পার্টনার কাঞ্চি লাল দাস মৃত্যুবরণ করায় তার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। তবে সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান অবস্থা ও তালিকাভুক্তির তথ্য যাচাইয়ের জন্য ইনস্টিটিউট অফ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অফ বাংলাদেশ (আইসিএবি) ও ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের কাছে চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিরীক্ষা কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা পুঁজিবাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে অনিয়ম বা গাফিলতি থাকলে তা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে এবং সৃষ্টি করতে পারে বাজারের ওপর আস্থার সংকট। নিরীক্ষা খাতে অনিয়মের বিরুদ্ধে এ ধরনের কঠোর অবস্থান পুঁজিবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কমিশন জানাচ্ছে, রিং সাইন টেক্সটাইলের নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান ও এনগেজমেন্ট পার্টনাররা তাদের পেশাগত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। নিরীক্ষা একটি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কাজ; এখানে অবহেলা বা গাফিলতি বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করে সরাসরি। আর এফআরসির গৃহীত পূর্ববর্তী ব্যবস্থাগুলো যথেষ্ট কঠোর বা প্রতিরোধমূলক ছিল না। ফলে শেয়ারবাজারে একটি ভুল বার্তা যাচ্ছে, নিরীক্ষায় অনিয়ম করেও দায় এড়ানো সম্ভব। এ পরিস্থিতিতে কমিশন নিজস্ব ক্ষমতা প্রয়োগ করে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের অধ্যাপক মো. আল-আমিন এ বিষয়ে আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এফআরসিকে আরও কার্যকর ও দৃশ্যমান ভূমিকা রাখতে হবে। বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে অডিট রিপোর্টের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে ওই রিপোর্টের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা থাকে না— পুরো শেয়ারবাজারের স্থিতিশীলতাই মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে।’




