কোরিয়ান সংস্কৃতি চীনে নিষিদ্ধ, কিন্তু কেন?

চীনেও রয়েছে বিটিএসের বিপুল সংখ্যক ভক্ত। ছবি: সংগৃহীত
তিন বছরেরও বেশি সময়ের বিরতির পর আবারও মঞ্চে ফিরেছে দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় সংগীত দল বিটিএস। নতুন করে শুরু হওয়া তাদের এক বছরের বিশ্ব সফর ঘিরে ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছে। তবে এই সফরের তালিকায় নেই বিশ্বের অন্যতম বড় সংগীত বাজার চীনের নাম।
এই অনুপস্থিতি বিস্ময়ের নয়। বরং বিশ্লেষকদের মতে, চীনকে তালিকায় রাখা হলে সেটাই হতো অপ্রত্যাশিত। কারণ প্রায় এক দশক ধরে চীন কার্যত দক্ষিণ কোরিয়ার বিনোদনশিল্পের ওপর একধরনের অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা জারি রেখেছে। এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় শুধু সংগীত নয়, কোরিয়ান চলচ্চিত্র এবং টেলিভিশন নাটকও রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে চীনা ভক্তদের জন্য প্রিয় শিল্পীদের সরাসরি দেখা কঠিন হয়ে উঠেছে। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলের কনসার্টে বিপুলসংখ্যক চীনা ভক্ত যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। কেউ কেউ ইতোমধ্যেই সেখানে গিয়েছেন। তাদের কাছে এটি শুধু একটি কনসার্ট নয়, বরং দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রিয় শিল্পীদের সামনে থেকে দেখার বিরল সুযোগ।
চীনের এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক ঘটনা। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে দক্ষিণ কোরিয়া তাদের ভূখণ্ডে একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা স্থাপনের অনুমতি দেয়। এই ব্যবস্থাটি ‘থাড’ নামে পরিচিত। যদিও এর লক্ষ্য ছিল উত্তর কোরিয়ার হুমকি মোকাবিলা করা, চীন মনে করে এই ব্যবস্থার রাডার তাদের নিজস্ব ভূখণ্ডে নজরদারি চালাতে সক্ষম। এই আশঙ্কা থেকেই বেইজিং ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন খাতে চাপ সৃষ্টি শুরু করে।
তবে এই নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি কঠোর নয়। কিছু ক্ষেত্রে শিথিলতা দেখা যায়। যেমন- অনেক কে-পপ দলে বিদেশি সদস্য থাকায় তারা চীনে পারফর্ম করার সুযোগ পেয়েছে। এছাড়া চীনে কে-পপ পণ্যের অস্থায়ী দোকানগুলোতেও ভক্তদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। ভিডিও কনটেন্টের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে কিছুটা প্রবেশাধিকার বজায় রয়েছে। বিভিন্ন অনলাইনমাধ্যমে সীমিতসংখ্যক কোরিয়ান নাটক পাওয়া যায়, তবে সেগুলোর বেশিরভাগই পুরোনো। নতুন নাটকগুলো অনেক সময় অবৈধভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যা নির্মাতাদের জন্য আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
চীনের বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল হংকং এবং ম্যাকাওতে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর নয়। এই অঞ্চলগুলো নিজেদের আইন ও প্রশাসনিক কাঠামোর কারণে কিছুটা স্বাধীনতা ভোগ করে। ফলে বিটিএস তাদের ভবিষ্যৎ সফরে এই স্থানগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছে।
চীনের জন্য কে-পপ শুধু বিনোদন নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক প্রভাবের বিষয়। কোরিয়ান সংস্কৃতির ব্যাপক জনপ্রিয়তা চীনের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা ছিল। শুরুতে এটি পশ্চিমা সংস্কৃতির বিকল্প হিসেবে গ্রহণযোগ্য মনে হলেও পরবর্তী সময়ে এর প্রভাব এতটাই বাড়ে যে সরকার এটিকে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। এই প্রেক্ষাপটে ২০২১ সালে চীন টেলিভিশনে ‘নারীসুলভ’ চেহারার পুরুষ শিল্পীদের উপস্থিতি সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। অনেকের মতে, এই প্রবণতা দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের পপ সংস্কৃতির প্রভাবেই তৈরি হয়েছিল। একইসঙ্গে চীন নিজেদের সাংস্কৃতিক শক্তি বা প্রভাব বাড়ানোর দিকেও জোর দিচ্ছে।
দেশটি চায় তাদের নিজস্ব সংগীত ও বিনোদনশিল্প আন্তর্জাতিকভাবে শক্ত অবস্থান তৈরি করুক।
অন্যদিকে, চীন কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই নিষেধাজ্ঞার কথা স্বীকার করেনি। ২০২২ সালে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান বলেছেন, তারা দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি। উপকারী ও ইতিবাচক সাংস্কৃতিক বিনিময়ে তাদের কোনো আপত্তি নেই।
সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে বৈঠক হয়েছে, যেখানে সাংস্কৃতিক বিনিময় ধীরে ধীরে বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়া ধীরগতির হবে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এই দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা দক্ষিণ কোরিয়ার বিনোদনশিল্পকে তাদের কৌশল বদলাতে বাধ্য করেছে। এখন জাপান তাদের প্রধান বাজারে পরিণত হয়েছে, আর উত্তর আমেরিকা হয়ে উঠেছে নতুন প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র। একসময় যে চীনা বাজারকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা করা হতো, এখন সেটি আর আগের মতো গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবুও চীন এখনো একটি বড় সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে রয়ে গেছে।
সূত্র : ডেকান ক্রনিকল



