শাহরুখের ফ্লপ ‘ফ্যান’ কেন এখনো আলোচনায়

সংগৃহীত ছবি
শাহরুখ খানের বহুল আলোচিত ‘ফ্যান’ ছবিটি ব্যবসায়িকভাবে সফল হয়নি। তবে সময়ের সঙ্গে এটি পরিণত হয়েছে এক গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত চলচ্চিত্রে। বিশেষ করে শাহরুখ খানের ক্যারিয়ারে এই ছবিটি এখন নতুনভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে। পরিচালক মনীশ শর্মা সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ছবির নির্মাণ ভাবনা এবং নানা গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন।
ছবির একটি বিশেষ দৃশ্য আজও দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলে। সেখানে দেখা যায় সুপারস্টার আরিয়ান খান্নার অন্ধভক্ত গৌরব চাঁদনা। এই ভক্ত আবার দেখতে অনেকটাই আরিয়ান খান্নার মতো। ভক্ত একদিন হঠাৎ করে ঢুকে পড়ে তারকার বিলাসবহুল সমুদ্র-তীরবর্তী বাড়িতে। এরপর সে চলে যায় আরিয়ানের ব্যক্তিগত স্টাডি রুমে, যেখানে সাজানো রয়েছে তার ক্যারিয়ারের ট্রফি, পোস্টার এবং স্মৃতিচিহ্ন। এক দীর্ঘ শটে ধারণ করা এই দৃশ্যে গৌরব ধীরে ধীরে সবকিছু ভাঙচুর করতে শুরু করে। তার ভেতরের ক্ষোভ, হতাশা আর অন্ধ বিশ্বাস যেন একে একে প্রকাশ পেতে থাকে। যে ভালোবাসা একসময় ছিল নিঃস্বার্থ ভক্তি, তা রূপ নেয় তীব্র বিদ্বেষে। এই দৃশ্যটি শুধু চরিত্রের ভাঙনের নয়, বরং ভক্তির অন্ধকার দিক। ছবিতে বোঝানো হয়েছে, ভক্ত নিজেই তার প্রিয় তারকার উপর এক ধরনের অধিকার দাবি করতে শুরু করে। সেটির এক শক্তিশালী প্রতিফলন এই চিত্র। বর্তমান সময়ের সোশ্যাল মিডিয়া-নির্ভর ভক্ত সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে এই বিষয়টি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন পরিচালক মনীশ।
গৌরব চরিত্রের সূচনায় তাকে একটি সাইবার ক্যাফে পরিচালনা করতে দেখা যায়। এই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে মনীশ শর্মা ব্যাখ্যা করেন, এটি মূলত একটি পরিচালনাগত সিদ্ধান্ত। চরিত্রটি গড়ে তোলার সময় ভাবা হয়েছিল, গৌরব একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে, খুব বেশি মেধাবী নয়, তাই জীবিকা নির্বাহের জন্য একটি ইন্টারনেট ক্যাফে চালানো তার জন্য স্বাভাবিক পছন্দ। ২৪ বছর বয়সী এই যুবকের জীবনের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা ছিল তার আইডল আরিয়ান খান্নার মতো হওয়া। যদিও অনেকেই এটিকে গল্পের একটি পূর্বাভাস হিসেবে দেখেন। যেখানে ডিজিটাল জগত ভক্তিকে যেমন উস্কে দেয়, তেমনি তা ধ্বংসের দিকেও নিয়ে যেতে পারে। তবে শর্মা বলেন, শুরু থেকেই এমন প্রতীকী ভাবনা ছিল না। চিত্রনাট্যকার হাবিব ফয়সাল এবং শরৎ কাটারিয়ার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে এই ধারণাগুলো তৈরি হয়েছে। তার মতে, চলচ্চিত্র নির্মাণ একটি চলমান প্রক্রিয়া, যেখানে গল্পের সঙ্গে মানানসই সিদ্ধান্তগুলো সময়ের সঙ্গে বিকশিত হয়।
ছবিটির দ্বিতীয়ার্ধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। প্রথম অংশে যেখানে মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারের আবহ, সেখানে দ্বিতীয় অংশে তা রূপ নেয় এক অ্যাকশনধর্মী গল্পে। অনেক দর্শকের মতে, এই পরিবর্তন ছবির মৌলিকত্বকে কিছুটা ক্ষুণ্ন করেছে। তবে মনীশ শর্মা এই ধারণার সঙ্গে একমত নন। তার মতে, ছবিটিকে কখনোই দুই ভাগে ভাগ করে দেখা হয়নি। তিনি, তার চিত্রনাট্যকাররা, প্রযোজক আদিত্য চোপড়া এবং শাহরুখ খান— সবাই ছবিটিকে দেখেছেন একটি যাত্রা হিসেবে। এটি একজন অদ্ভুত, আবেগপ্রবণ তরুণের গল্প, যে তার প্রিয় তারকার প্রতি অস্বাভাবিক রকমের ভালোবাসা পোষণ করে। এই যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে, যা গৌরবের ভেতরের মানুষটিকে পুরোপুরি বদলে দেয়। সেই পরিবর্তনের পর গল্প স্বাভাবিকভাবেই আরও তীব্র ও নির্মম হয়ে ওঠে।
নির্মাতাদের লক্ষ্য ছিল, প্রথমার্ধে গৌরবের জগৎ, তার ভালোবাসা এবং আবেগ দর্শকের কাছে প্রতিষ্ঠিত করা, যাতে মাঝপথে সেই পরিবর্তন আসার পর দর্শক তার সঙ্গে যুক্ত থেকেই তার যাত্রার পরবর্তী অংশ অনুসরণ করতে পারে।
ছবিটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গৌরব এবং আরিয়ান চরিত্রের পারস্পরিক প্রতিফলন। অনেক দর্শকই এই বিষয়টি লক্ষ্য করেছেন, এবং মনীশ শর্মাও স্বীকার করেছেন যে, ‘রিফ্লেকশন’ বা প্রতিফলনই ছিল ছবির মূল থিম। ছবির যে দৃশ্যে গৌরব এবং আরিয়ান প্রথমবার মুখোমুখি হয়, একটি আয়নার সামনে বসে, সেটিই ছিল শুটিংয়ের প্রথম দৃশ্য। এর আগে একটি টেস্ট শুট করা হয়েছিল, যেখানে গৌরবের লুক পরীক্ষা করা হয় এবং তাকে ট্রেনে মুম্বাই যাওয়ার একটি দৃশ্য ধারণ করা হয়। তবে পরে সেটি আবার নতুন করে শুট করা হয়, কারণ নির্মাতারা তখনও শুটিং স্টাইলসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিলেন।
মিরর সিনটি নিয়ে শর্মা বলেন, তিনি সিনেমাটোগ্রাফার মানু আনন্দকে স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, ছবিতে অনেক প্রতিফলন ব্যবহার করতে চান, তবে সেগুলো যেন কখনোই খুব সরাসরি বা চোখে পড়ার মতো না হয়; বরং সেগুলোর ভেতরে একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার থাকতে হবে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, গৌরবকে কখনো সরাসরি আয়নায় তাকাতে দেখা যায় না; বরং তাকে দেখা যায় আয়নার প্রতিফলনে। আবার একটি দৃশ্যে বিমানে বসে আরিয়ান আয়নার দিকে তাকিয়ে একটি কৃত্রিম হাসি দেয়— যা তার তারকাজীবনের ভেতরের চাপা আবেগ ও শূন্যতাকে ফুটিয়ে তোলে।
ছবির আরেকটি বহুল আলোচিত দৃশ্য হলো, যখন গৌরব প্রথমবার আরিয়ানকে তার বাড়ির বাইরে দেখে। এই দৃশ্যে শাহরুখ খানের অভিনয় নিয়ে ব্যাপক প্রশংসা হয়েছে। মনীশ শর্মা জানান, ছবিতে যে শটটি ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি ছিল একেবারে প্রথম টেক। সেই মুহূর্তে তিনি নিজেই আবেগে কাঁপছিলেন। এমনকি সিনেমাটোগ্রাফার পরে এসে জানান, হয়তো ক্যামেরার ফোকাস ঠিক ছিল না। কিন্তু শর্মা দৃঢ়ভাবে বলেন, এমন অভিনয়ের মুহূর্তকে কোনোভাবেই বাদ দেওয়া যায় না। যদিও শাহরুখ চাইলে একই দৃশ্য আবার করতে পারতেন, তবুও কিছু মুহূর্ত থাকে যা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তৈরি হয় এবং সেটিই সবচেয়ে সত্য হয়ে ওঠে।
গৌরব চরিত্রটি যতটা আলোচিত হয়েছে, তার চেয়েও বেশি সূক্ষ্ম ও গভীর ছিল আরিয়ান চরিত্রে শাহরুখ খানের অভিনয়— এমনটাই মনে করেন পরিচালক। তিনি বলেন, চরিত্রটিকে আরও বাস্তব ও বহুমাত্রিক করে তুলতে শাহরুখ নিজেই অনেক ছোট ছোট বিষয় যোগ করেছিলেন। যেমন, বিয়ের একটি দৃশ্যে এক ব্যবসায়ীর দ্বারা আরিয়ানকে অপমানিত হওয়ার মুহূর্তটি ছিল শাহরুখের নিজস্ব ভাবনা। আবার একটি ক্লোজ-আপ দৃশ্যে, যেখানে আরিয়ান তার ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকে— এই ধরনের সূক্ষ্ম মুহূর্তগুলোতেই তিনি চরিত্রটির ভঙ্গুরতা ও একাকীত্ব ফুটিয়ে তুলেছেন, যা ভাষায় ব্যাখ্যা করা কঠিন, কিন্তু দর্শক অনুভব করতে পারে।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস



