আগামীর সময়

কোরিয়ান সংস্কৃতি কীভাবে বিশ্ব দখল করল

কোরিয়ান সংস্কৃতি কীভাবে বিশ্ব দখল করল

অস্কার মঞ্চে ম্যাগি কাং। ছবি: অস্কার

কোরিয়ান সংস্কৃতি কীভাবে বিশ্ব দখল করল

বিনোদন ডেস্ক

টরন্টোর অভিবাসী জীবনের ভেতর বেড়ে ওঠা ম্যাগি কাং শৈশবে ব্যান্ড এইচ.ও.টির গান পছন্দ করতেন। কিন্তু বিদেশি বন্ধুদের প্রকাশ্যে সেই ভালোবাসার কথা বলতে পারতেন না। কারণ তখনকার সামাজিক বাস্তবতায় কে-পপকে অনেকেই তুচ্ছ বিষয় মনে করত; এমনকি তার এশীয় বন্ধুরাও। অথচ কাংয়ের কাছে এটি কেবল বিনোদন নয়, বরং নিজের অস্তিত্বেরই একটি অংশ— একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়। এই লুকিয়ে রাখা ভালোবাসা একদিন বিশ্বমঞ্চে প্রকাশ হয়।

২০২৬ সালের মার্চে তার লেখা ও পরিচালনার অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র ‘কে-পপ ডেমন হান্টার্স’ এক ঐতিহাসিক অর্জন করে। এটি অস্কারে সেরা অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্রের পুরস্কার জিতে নেয়, আর এর গান ‘গোল্ডেন’ হয়ে ওঠে প্রথম কোনো কে-পপ শিল্পীর গান, যা সেরা মৌলিক গানের পুরস্কার জেতে। লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে ওসাকা—বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ভাষার শিশুরা ও তাদের পরিবার এই গান গাইছে। পুরস্কার গ্রহণ করতে গিয়ে কাং আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘আমার মতো মানুষদের নিজেদের এমন গল্পে দেখতে এত সময় লেগেছে, তার জন্য আমি দুঃখিত।’

এই সাফল্য আলাদা করে তোলে আরেকটি বিষয়, এটি কোরিয়ান সংস্কৃতির বৈশ্বিক উত্থানের এক নতুন উচ্চতা। যদিও এর আগে ‘প্যারাসাইট’ অস্কারে সেরা চলচ্চিত্র জিতে ইতিহাস গড়েছিল, কিন্তু এই নতুন সাফল্য যেন এক দীর্ঘ ঢেউয়ের চূড়ান্ত রূপ। আজ কে-পপ স্টেডিয়াম ভরিয়ে দিচ্ছে— বিটিএস এবং ব্ল্যাকপিংকের মতো ব্যান্ড সেই জনপ্রিয়তা পেয়েছে, যা আগে পশ্চিমা তারকাদের জন্য সংরক্ষিত ছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, অ্যালবাম বিক্রি, কনসার্ট, স্ট্রিমিং— সব মিলিয়ে প্রায় ২০২৫ সালে কে-পপের মোট বৈদেশিক আয় ১.৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাছে।

কে-সংস্কৃতি শুধু সংগীতেই সীমাবদ্ধ নেই। ‘স্কুইড গেম’ বিশ্বে সবচেয়ে বেশি দেখা ধারাবাহিকগুলোর একটি হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে কোরিয়ান খাবারের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে— ২০২৪ সালেই বিশ্বজুড়ে কোরিয়ান রেস্টুরেন্টের সংখ্যা প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বড় সুপারস্টোরগুলোতে ফ্রোজেন কিমবাপ এতটাই জনপ্রিয় হয়েছে যে, বারবার স্টক শেষ হয়ে যাচ্ছে। আবার কে-বিউটি পণ্যও পেয়েছেন দারুণ জনপ্রিয়তা। শামুকের নির্যাস, চালের পানি বা মৌমাছির বিষযুক্ত ক্রিম তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ব্যাপক চাহিদা তৈরি করেছে।

এখন বড় প্রশ্ন— দক্ষিণ কোরিয়া কীভাবে এটি সম্ভব করল? মাত্র প্রায় ৫ কোটি মানুষের একটি দেশ, যা একসময় উপনিবেশ, যুদ্ধ এবং সামরিক শাসনের অভিজ্ঞতা পেরিয়ে এসেছে— তারা কীভাবে এমন সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার করল? উত্তরটি জটিল এবং বহুস্তরের। এর শুরু নব্বইয়ের দশকে। একটি সরকারি পরামর্শক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, ‘জুরাসিক পার্ক’ সিনেমার আয় প্রায় ১৫ লাখ হুন্ডাই গাড়ি রপ্তানির সমান। এই তথ্য দক্ষিণ কোরিয়ার নীতিনির্ধারকদের চমকে দেয়। তারা বুঝতে পারে— গল্পও একটি শক্তিশালী রপ্তানি পণ্য হতে পারে। এরপর থেকেই সরকার চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ায়। স্থানীয় সিনেমাকে রক্ষা করতে স্ক্রিন কোটা চালু হয়, ভর্তুকি দেওয়া হয় এবং একটি শক্তিশালী অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়।

এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মিকি লি। তিনি সিজে গ্রুপের ভাইস চেয়ারওম্যান এবং স্যামসাং প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের সদস্য। ১৯৯৪ সালে যখন স্টিভেন স্পিলবার্গ, ডেভিড গেফেন এবং জেফরি ক্যাটজেনবার্গ নতুন একটি চলচ্চিত্র স্টুডিও গঠনের পরিকল্পনা করেন, তখন লিও সেই দলে যোগ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। পরে সিজে গ্রুপের মাধ্যমে লি ড্রিমওয়ার্কস স্টুডিওতে ৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেন এবং এর একটি বড় অংশীদার হন। এই চুক্তি শুধু ব্যবসায়িক ছিল না— এটি কোরিয়ান চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। দেশে ফিরে লি মাল্টিপ্লেক্স, স্টুডিও এবং বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা করেন, যা পরবর্তীতে কোরিয়ান চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে আনে।

‘প্যারাসাইট’ এই যাত্রার একটি বড় মাইলফলক। ২০২০ সালে এটি অস্কারে সেরা চলচ্চিত্র জিতে প্রথম অ-ইংরেজি ভাষার সিনেমা হিসেবে ইতিহাস গড়ে। যুক্তরাষ্ট্রে এটি ৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার আয় করে এবং পরবর্তীতে শতাব্দীর অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়। সেই সময় পরিচালক বং জুন-হোর ‘সাবটাইটেলের এক ইঞ্চি বাধা’ মন্তব্য বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে।

এই সময়ে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্স একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা স্থানীয় ভাষার কনটেন্ট তৈরি ও বিশ্বব্যাপী একসঙ্গে মুক্তি দেওয়ার মাধ্যমে কোরিয়ান কনটেন্টকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। ফলে ‘স্কুইড গেম’ বা এই ধরনের কনটেন্ট মুহূর্তেই বৈশ্বিক দর্শকের কাছে পৌঁছে যায়।

কোরিয়ান কনটেন্টের আরেকটি শক্তি হলো— এর গল্প বলার ধরণ। বড় বাজেট বা প্রযুক্তির ওপর নির্ভর না করে তারা গল্পের গভীরতা ও নির্মাণশৈলীর ওপর গুরুত্ব দেয়। এই কারণে তাদের গল্পগুলো আলাদা হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে তাদের প্রডাকশন প্রক্রিয়া দ্রুত এবং ফলাফলমুখী, যা হলিউডের দীর্ঘসূত্রতার বিপরীতে একটি বড় সুবিধা।

কে-পপের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে ভক্তদের ভূমিকার মাধ্যমে। এখানে দর্শক শুধু শ্রোতা নয়— তারা সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। বিটিএস এই মডেলকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে তোলে। ভক্তরা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণা চালায়, গান স্ট্রিম করে, ভোট দেয়— এভাবে শিল্পীর সাফল্যের অংশ হয়ে ওঠে। ২০১৯ সালের তাদের বিশ্বভ্রমণ কনসার্ট উত্তর আমেরিকায় এক নতুন রেকর্ড গড়ে। পরে ইংরেজি ভাষায় গান প্রকাশ করে তারা ভাষার বাধাও ভেঙে দেয়।

এই সাফল্যের পেছনে আরেকটি গভীর উপাদান হলো ‘হান’। কী এই ‘হান’? এটি এক ধরনের সম্মিলিত বেদনা, যা কোরিয়ার ইতিহাসে প্রোথিত। উপনিবেশ, যুদ্ধ এবং বিভক্তির অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া এই অনুভূতি কোরিয়ান গল্পে গভীরতা এনে দেয়। গল্পগুলোতে নায়করা নিখুঁত নয়, সমাপ্তি সবসময় সুখের নয়— বরং বাস্তবের মতোই জটিল। এটিও সিনেমার নতুন ভাষা হয়ে উঠে। এই পুরো যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো— এখন অনেক কোরিয়ান কনটেন্ট তৈরি করছেন কোরিয়ান-আমেরিকান নির্মাতারা। ফলে এই কনটেন্টগুলো দুই সংস্কৃতির মিশ্রণে তৈরি, যা বৈশ্বিক দর্শকের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।

তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণ, একই ধরনের গল্পের পুনরাবৃত্তি কি দর্শককে ক্লান্ত করে না? কোরিয়ান সিনেমায় এসব ঝুঁকি রয়েছে। তবুও অনেক নির্মাতা আশাবাদী-যদি মৌলিকতা ও গল্পের জোর থাকে, তাহলে এই যাত্রা থামবে না।

সূত্র: ভ্যারাইটি

    শেয়ার করুন: