শিল্পকর্ম না মানুষ, বোঝা দায়

ফ্যাশন যখন শিল্পের রূপ নেয়, তখন তৈরি হয় জাদু।
এ বছরের মেট গালার আসর বসেছিল নিউ ইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অফ আর্টের সেই জাঁকজমকপূর্ণ সিঁড়িতে, আর তার আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে সারা দুনিয়ায়। প্রতি মে মাসের প্রথম সোমবারে আয়োজন করা হয় এই রাজকীয় অনুষ্ঠানের, যেখানে জড়ো হন দুনিয়া কাঁপানো সব তারকারা।
ফ্যাশন যখন শিল্পের রূপ নেয়, তখন কেমন জাদু তৈরি হয় এবারের থিম ছিল ঠিক সেটাই। ঝকঝকে সব পোশাক পরে তারা মেপেছেন মেট মিউজিয়ামের সিঁড়ি, যার পেছনে লুকিয়ে ছিল নামী সব চিত্রকর্মের গল্প। সেইসব পোশাকের বাহার দেখে চোখ কপালে উঠেছে ফ্যাশন প্রেমীদের। চলুন দেখে নেওয়া যাক, কোন আটটি সাজ এ বছর কেড়ে নিয়েছে সবার মন।
রোজ / জর্জেস ব্র্যাকের ‘দ্য বার্ডস’ (১৯৫২-৫৩)
কে-পপ দুনিয়ার সেনসেশন রোজ যখন মেটের মঞ্চে এলেন, তখন সবার নজর কেড়েছে তার সেই সাবেকি কালো পোশাক। বিখ্যাত ডিজাইনার সেন্ট লরেন্টের তৈরি এই গাউনের সাথে তিনি জুড়ে দিয়েছেন ইটের সমান বড় এক পাখির ব্রোচ। শিল্পী জর্জেস ব্র্যাকের আঁকা সেই ডানা মেলা পাখিদের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে তার এই ছোট্ট সাজটি। খুব সাধারণ এই লুকটি আসলে আভিজাত্যের অন্য নাম হয়ে ধরা দিয়েছে সবার কাছে। তার সাথে থাকা স্টাইলিস্ট ল' রোচ যেন জাদুর ছোঁয়ায় রোজকে নিয়ে গেছেন সেই বিংশ শতাব্দীর ক্যানভাসে।
লিনা ডানহ্যাম / আর্তেমিসিয়া জেন্টিলেস্কির ‘জুডিথ স্লেয়িং হোলোফারনেস’ (আনুমানিক ১৬১২-১৬২০)
বিখ্যাত অভিনেত্রী লিনা ডানহ্যাম এবার যেন রক্তরাঙা হয়ে হাজির হয়েছিলেন লাল গালিচায়। কয়েক বছর বিরতির পর ফিরেই তিনি তাক লাগিয়ে দিয়েছেন ইতালীয় শিল্পী আর্তেমিসিয়া জেন্টিলেস্কির এক ভয়ংকর সুন্দর ছবিকে পুঁজি করে। শিল্পী মিশেল তার পোশাকে কোনো তলোয়ার বা যুদ্ধের সাজ রাখেননি, বরং ফুটিয়ে তুলেছেন ছবির সেই ঘাড় থেকে ছিটকে পড়া তাজা রক্তকে। লাল সিল্ক আর কাকের পালকের মিশেলে তৈরি সেই পোশাকটি দেখে মনে হচ্ছিল, কোনো এক জীবন্ত যুদ্ধক্ষেত্র থেকে উঠে এসেছেন এই তারকা।
জুলিয়ান মুর / জন সিঙ্গার সার্জেন্টের ‘মাদাম এক্স’ (১৮৮৩-৮৪)
অপূর্ব সুন্দরী জুলিয়ান মুর যখন কালো পোশাকে সামনে এলেন, তখন সবার মনে পড়ে গেছে সেই ‘মাদাম এক্স’ ছবির কথা। শিল্পী জন সিঙ্গার সার্জেন্টের আঁকা সেই বিতর্কিত চিত্রকর্মটি এক সময় প্যারিসে ঝড় তুলেছিল। একটি মাত্র ফিতা কাঁধ থেকে ঝুলে থাকা সেই গাউনটি ছিল তখনকার দিনের জন্য বিশাল এক সাহসের পরিচয়। ঠিক সেই ধাঁচেই তৈরি এই বোট্টেগা ভেনেটার পোশাকটি আবারও প্রমাণ করেছে যে, রুচিশীল ফ্যাশন কখনো পুরোনো হয় না। যদিও লরেন সানচেজ বেজোসও একই ঢঙের পোশাক পরেছেন, তবে মুরের স্নিগ্ধতা ছিল চোখে পড়ার মতো।
হান্টার শেফার / গুস্তাভ ক্লিম্টের ‘মাদা প্রিমাভেসি’ (১৯১২-১৯১৩)
হাল আমলের ক্রেজ হান্টার শেফারকে দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি যেন সোজা কোনো রঙিন স্বপ্ন থেকে নেমে এসেছেন। বিখ্যাত অস্ট্রিয়ান শিল্পী গুস্তাভ ক্লিম্টের আঁকা এক ছোট্ট মেয়ের প্রতিকৃতি থেকে তার এই সাজের মূল রসদ এসেছে। যদিও প্রাডার তৈরি এই পোশাকটি কিছুটা ছেঁড়া আর এলোমেলো দেখাচ্ছিল, কিন্তু তার সাথে লম্বা ট্রেইনটি ছিল দারুণ রাজকীয়। ঠিক সেই ছবির মতন করেই তিনি চোখের ওপর লেপেছিলেন নীল রঙের আইশ্যাডো, যা পুরো সাজকে করেছে একদম নিখুঁত।
ড্রি হেমিংওয়ে / স্যার পিটার পল রুবেনসের ‘মারচেসা ব্রিজিদা স্পিনোলা-ডোরিয়া’ (১৬০৬)
মডেল ড্রি হেমিংওয়ে যেন নিয়ে এসেছিলেন সতেরো শতকের ইউরোপের সেই জমিদারি আমেজ। শিল্পী পিটার পল রুবেনসের আঁকা এক সম্ভ্রান্ত মহিলার ছবির সাথে তার রুপালি এমব্রয়ডারি করা পোশাকটির ছিল অদ্ভুত এক মিল। বিশেষ করে গলার সেই বড় থিয়েট্রিকাল কলারটি দেখে মনে হচ্ছিল, শেক্সপিয়রের আমলের কোনো রানী বুঝি হেঁটে বেড়াচ্ছেন। তবে এর সাথে আবার উনিশ শতকের ভিউয়িং ডিভাইসের এক আধুনিক ছোঁয়াও মিশিয়ে দিয়েছেন ডিজাইনার মিশেল, যা সত্যিই ছিল দেখার মতো।
অ্যান হ্যাথাওয়ে / শেভরন গ্রুপ-এর ‘টেরাকোটা বেল-ক্রেটার’ (আনুমানিক ৩৫০-৩২৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)
আমাদের সবার প্রিয় অ্যান হ্যাথাওয়ে এবার যেন হয়ে উঠেছিলেন কোনো এক জীবন্ত কবিতা। ব্রিটিশ কবি জন কিটসের ‘ওড অন আ গ্রেসিয়ান আর্ন’ কবিতার সেই অমর পঙক্তিগুলো ফুটে উঠেছিল তার পোশাকে। শিল্পী পিটার ম্যাকগফ নিজের হাতে এঁকেছেন সাদা পায়রা আর শান্তির দেবীর ছবি, যা দেখতে ছিল একদম প্রাচীন গ্রিসের মাটির পাত্রের মতো। সিল্কের এই সাদা-কালো গাউনটি দিয়ে তিনি শুধু ফ্যাশনই করেননি, বরং বিশ্বশান্তির এক নীরব বার্তাও পৌঁছে দিয়েছেন সবার কানে।
হেইডি ক্লাম / রাফায়েল মন্টি-র ‘ভেইলড ভেস্টাল’ (১৮৪৬-৪৭)
সুপারমডেল হেইডি ক্লাম বরাবরই একটু বেশি চমক দিতে ভালোবাসেন, আর এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তিনি সেজেছিলেন এক জীবন্ত মার্বেল পাথর বা ভাস্কর্যের মতো, যার অনুপ্রেরণা ছিল ১৮৪৭ সালের বিখ্যাত সেই ‘ভেইলড ভেস্টাল’ মূর্তি। গায়ে পাথরের মতো রঙ মেখে, চোখে ধূসর কন্টাক্ট লেন্স পরে তিনি যখন এলেন, তখন চেনা কঠিন ছিল যে এটি সত্যিকারের মানুষ না কি কোনো পাথর। এই মূর্তিরা প্রাচীন রোমের আগুনের পাহারা দিত, আর হেইডি যেন সেই রক্ষাকর্তী হয়েই দাঁড়িয়ে ছিলেন সবার সামনে।
সিয়ারা / নেফারতিতির আবক্ষ মূর্তি (আনুমানিক ১৩৪৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)
সবশেষে বলা যাক সংগীতশিল্পী সিয়ারার কথা, যিনি যেন নিজেকে মুড়ে নিয়েছিলেন খাঁটি সোনার আবরণে। প্রাচীন মিশরের রানি নেফারতিতির সেই অসীম ক্ষমতা আর সৌন্দর্যকে সম্মান জানাতেই তার এই সোনালি সাজ। নেফারতিতির সেই লম্বা মুকুটের আদলে সাজানো চুল আর গয়না দেখে মনে হচ্ছিল, এক প্রাচীন সাম্রাজ্য বুঝি আবারও জেগে উঠেছে। রানী নেফারতিতি ছিলেন ফ্যাশন আর শক্তির প্রতীক, আর মেট গালার মঞ্চে সিয়ারা সেই রাজকীয়তাকেই নতুন করে তুলে ধরেছেন সবার মনে।
সূত্র: বিবিসি











