ব্রুস উইলিসের যে সিনেমা ফ্লপ থেকে হয়েছিল কাল্ট হিট

উইলিসের মূল চরিত্রটি হলো এক ক্যাপুচিনোপ্রেমী বিড়াল চোর, যে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির তৈরি নানা জিনিস চুরি করতে বাধ্য হয়।
আজ থেকে ঠিক ৩৫ বছর আগে মুক্তি পায় ‘হাডসন হক’ নামের এক আজব সিনেমা। সমালোচকরা সেই সময় ধুয়ে দেন এই অগোছালো প্রজেক্টটিকে।
পর্দার পেছনের হাজারো ঝামেলার জন্য এই সিনেমা হয়ে ওঠে ইতিহাসের এক কুখ্যাত নাম। অথচ সময়ের আবর্তে এখন এই সিনেমাটিকে অনেক বেশি ভালোবাসছে মানুষ। ফলে এই ফ্লপ ছবিটিকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে একনিষ্ঠ এক অনুরাগী গোষ্ঠী।
সবকিছুর শুরুটা হয় খুব সাধারণ এক বন্ধুত্বের মাধ্যমে। ব্রুস উইলিস ১৯৮০ সালে যখন ছিলেন সামান্য এক বারটেন্ডার, তখন রবার্ট ক্রাফট নামের এক সংগীতশিল্পীর সঙ্গে তার জমে ওঠে দারুণ খাতির। ক্রাফটের মুখ থেকে হাডসন হক নামের এক চোরের গান শুনে উইলিস তখন বলেছেন, এটি নিয়েই তিনি বানাবেন সিনেমা।
হাজারো তরুণ আড্ডায় এমন কথা বন্ধুদের বললেও উইলিস কিন্তু ঠিকই রাখেন নিজের দেওয়া সেই কথা। ১৯৯১ সালের মে মাসে সিনেমাটি শেষ পর্যন্ত আসে দর্শকদের সামনে রুপালি পর্দায়।
উইলিস তখন একদমই আন্দাজ করতে পারেননি যে তার এই শখের ছবি বক্স অফিসে পড়বে মুখ থুবড়ে। সিনেমার কলাকুশলীরা নিজেরাও একে বলতেন চরম ‘ব্যর্থ’ প্রজেক্ট।
লেখক ডেভিড হিউজ এখন লিখছেন, এই সিনেমার পেছনের অজানা সব গোলমালের গল্প নিয়ে। তার মতে, মুভিটি মোটেও ফেলনা নয় বরং বেশ মজার। ছবির কোনো মজার দৃশ্য পছন্দ না হলেও পরের দৃশ্যেই আপনি পাবেন হাসির নতুন কোনো খোরাক।
নিক ডি সেমলিয়েন তার বইয়ে উইলিসকে রাখেন অ্যাকশন জগতের এক দাপুটে রাজা হিসেবে। তবে তিনি এই সিনেমাকে অভিহিত করেছেন, এক জগাখিচুড়ি। উইলিস তখন চেয়েছিলেন স্টান্ট আর কমেডির সঙ্গে গানের এক জগাখিচুড়ি পাকিয়ে তৈরি করতে অদ্ভুত কিছু।
বারটেন্ডার থেকে সুপারস্টার হতে উইলিসের খুব একটা বেশি সময় লাগে না সে সময়। ডাই হার্ড সিনেমার সাফল্যের পর উইলিস হয়ে যান হলিউডের সব থেকে দামি এক রাঘববোয়াল।
প্রযোজক জোয়েল সিলভারকে উইলিস রাজি করান এই অদ্ভুত চুরির গল্প নিয়ে সিনেমা বানাতে। চিত্রনাট্য লিখতে গিয়ে দুই লেখকের মধ্যে শুরু হয় কলহ। একজন চাইছিলেন, পুরোদস্তুর অ্যাকশন ছবি বানাতে আর অন্যজন বিষয়টিকে করতে চাইছিলেন হাস্যরসে ভরপুর কিছু। সিলভার যখন স্টিভেন ডি সুজাকে ডাকেন নতুন চিত্রনাট্যের জন্য, তখন সিনেমার মূল কাঠামোটি দাঁড়ায় এক সিঁধেল চোরকে কেন্দ্র করে। ওডিসিওয়াস নামের সেই চোর লিওনার্দো দা ভিঞ্চির নকশা করা জিনিসগুলো চুরি করে সিসাকে সোনায় রূপান্তর করার এক অদ্ভুত নেশায় আক্রান্ত।
রোমে যখন ছবির শুটিং শুরু হয়, তখন থেকেই সবকিছু যেতে থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। সিনেমার প্রধান অভিনেত্রী সেটে অসুস্থ হয়ে পড়লে তার জায়গায় তড়িঘড়ি করে আনা হয় নতুন একজনকে।
পরিচালক মাইকেল লেহম্যানের কাজে উইলিস আর সিলভার বারবার দিচ্ছিলেন নিজেদের খামখেয়ালি সব পরামর্শ। অভিনেতা জেমস কোবার্ন তো বললেন, সেটে সবসময় তিন-চারজন পরিচালক করতেন মাতব্বরি। অভিনেতা রিচার্ড ই গ্র্যান্ট তার ডায়েরিতে তুলে ধরেন সেই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির এক জীবন্ত ছবি।
হোটেলে রুম না পাওয়া থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণহীন কুকুরের যন্ত্রণা- সবকিছুই বিগড়ে দেয় সবার মেজাজ। গ্র্যান্টের মতে, এই সিনেমাটি ছিল তার মস্তিষ্ক বিকল করার এক নিশ্চিত টিকিট। যখন তখন নতুন নতুন আইডিয়া মাথায় আসত সবার আর বাজেট হু হু করে যাচ্ছিল বেড়ে। ৪০ মিলিয়ন থেকে খরচ পৌঁছে যায় ৬০ মিলিয়নের সেই বিশাল পাহাড়ে। চিত্রনাট্য বারবার পরিবর্তনের ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যও বাতিল করতে হয় সময়ের অভাবে।
মস্কোর দৃশ্য ধারণ করতে তারা রোম থেকে চলে যান হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে এক অদ্ভুত কারণে। গ্র্যান্টের মতে, এটি ছিল কোনো পাগল বেবুনের যুক্তির মতো এক অবাস্তব সিদ্ধান্ত। যুক্তরাষ্ট্রে গসিপ কলামিস্টরা এ নিয়ে বেশ মেতেছিলেন মুখরোচক সব খবরে। সমালোচকরা একমত হয়ে বললেন, উইলিস সিসাকে সোনায় রূপান্তর করতে ব্যর্থ হয়েছেন শোচনীয়ভাবে। রোলিং স্টোনের রিপোর্টার তো বললেন, এত জঘন্য সিনেমা দর্শকদের পাগল করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
সিনেমাটি যাদের পছন্দ তারা অবশ্য দাবি করছেন, রিভিউগুলো ছিল প্রকৃতপক্ষে ব্যক্তিগত ক্ষোভের প্রতিফলন। লেখক কিম নিউম্যান মনে করেন, এটি ছিল বেশ বুদ্ধিদীপ্ত আর আধুনিক এক সৃষ্টি। সেই সময়ের অনেক হিট সিনেমার চেয়েও এটি বেশি ভালো বলে তিনি সাফ জানাচ্ছেন।
২০২২ সালে উইলিসের অবসরের পর এই সিনেমার প্রতি ভালোবাসা বেড়েছে ভক্তদের মনে কয়েক গুণ। ডি সেমলিয়েন এখন বলছেন, জেসন স্ট্যাথামের গতানুগতিক অ্যাকশন ছবির চেয়ে তিনি এটিকেই বেছে নেবেন।
রিচার্ড ই গ্র্যান্ট অবশ্য আজও এই সিনেমাকে ঘৃণা করেন নিজের মনের গভীর থেকে। তবে সিনেমাটি সব থেকে বেশি পছন্দ করেন সেই দুজন মানুষ যাদের স্বপ্ন ছিল এই সিনেমা বানানোর। ডেভিড হিউজ জানালেন, ব্রুস আর ক্রাফট এখন একসঙ্গে বসে দেখেন তাদের এই পুরনো সৃষ্টি। প্রায় ৩০ বছর পর ছবিটি আবার দেখে তারা দুজনেই একমত হন, এটি আসলে খুব একটা খারাপ ছিল না।
সূত্র: বিবিসি





