অমরত্বের কতটা কাছে মানুষ?

ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি
মানুষের অমরত্ব কতটা কাছে- এই প্রশ্নটি মানবসভ্যতার প্রাচীনতম কৌতূহলগুলোর একটি। ধর্ম, দর্শন ও সাহিত্য বহু শতাব্দী ধরে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে প্রথমবারের মতো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এই প্রশ্নকে বাস্তব গবেষণার পরিসরে নিয়ে এসেছে।
আজকের দিনে ‘অমরত্ব’ বলতে শুধু মৃত্যু এড়ানো নয়; বরং বার্ধক্য নিয়ন্ত্রণ, রোগ প্রতিরোধ, কোষ পুনর্গঠন এবং এমনকি চেতনার ধারাবাহিকতা রক্ষা করার মতো বিষয়গুলোকে বোঝানো হয়। তবে বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা হলো- আমরা এখনো অমরত্ব অর্জন থেকে অনেক দূরে, যদিও দীর্ঘায়ু অর্জনের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
মানবদেহে বার্ধক্য একটি বহুস্তরীয় জৈবিক প্রক্রিয়া। ২০১৩ সালে ‘সেল’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় ‘হলমার্ক অফ এজিং’ নামে পরিচিত বার্ধক্যের নয়টি প্রধান বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে জিনগত অস্থিতিশীলতা, টেলোমিয়ার ক্ষয়, এপিজেনেটিক পরিবর্তন, প্রোটিন ভারসাম্যহীনতা, কোষীয় সেনেসেন্স, স্টেম সেলের ক্লান্তি এবং কোষের মধ্যে যোগাযোগের পরিবর্তন। এই প্রতিটি প্রক্রিয়া মানুষের বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত এবং সম্মিলিতভাবে দেহের কার্যক্ষমতা কমিয়ে আনে।
টেলোমিয়ার নিয়ে গবেষণা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৯ সালে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত গবেষণা (ব্ল্যাকবার্ন, গ্রেইডার ও জোস্টাক) দেখায় যে টেলোমিয়ার হলো ক্রোমোজোমের প্রান্তে অবস্থিত একটি সুরক্ষামূলক কাঠামো, যা প্রতিবার কোষ বিভাজনের সময় ছোট হতে থাকে।
যখন টেলোমিয়ার একটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে নেমে যায়, তখন কোষ বিভাজন বন্ধ হয়ে যায় এবং কোষ ‘সেনেসেন্ট’ অবস্থায় প্রবেশ করে। টেলোমেরেজ নামক একটি এনজাইম টেলোমিয়ার পুনর্গঠন করতে পারে, এবং কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে এটি সক্রিয় করলে কোষের আয়ু বাড়তে পারে। তবে এর একটি
বড় সমস্যা হলো- অতিরিক্ত টেলোমেরেজ কার্যকলাপ ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, কারণ ক্যানসার কোষও এই প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিভাজিত হয়।
স্টেম সেল প্রযুক্তি মানুষের অমরত্ব-সংক্রান্ত আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। স্টেম সেল এমন কোষ যা বিভিন্ন ধরনের কোষে রূপান্তরিত হতে পারে এবং দেহের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পুনর্গঠনে সাহায্য করে। ‘নেচার’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাগুলো দেখিয়েছে যে স্টেম সেল থেরাপি এরই মধ্যে কিছু রোগের চিকিৎসায় সফল হয়েছে, যেমন- রক্তের ক্যানসার। ভবিষ্যতে সম্পূর্ণ অঙ্গ তৈরি করে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হলে, হৃদযন্ত্র, কিডনি বা লিভারের মতো অঙ্গের ব্যর্থতা আর মৃত্যুর কারণ হবে না।
তবে সম্পূর্ণ কার্যকর এবং নিরাপদ অঙ্গ-প্রতিস্থাপন প্রযুক্তি এখনো উন্নয়নের পর্যায়ে রয়েছে।
জিন সম্পাদনা প্রযুক্তি, বিশেষ করে ক্রিসপার-ক্যাস৯, আধুনিক জীববিজ্ঞানের সবচেয়ে বিপ্লবী আবিষ্কারগুলোর একটি। ২০২০ সালে এই প্রযুক্তির জন্য নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। ক্রিসপার প্রযুক্তির মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা নির্দিষ্ট ডিএনএ অংশ কেটে বা পরিবর্তন করে জিনগত রোগ সংশোধন করতে পারেন।
‘সায়েন্স’ ও ‘নেচার’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাগুলো দেখিয়েছে যে এই প্রযুক্তি বংশগত রোগ যেমন সিকল সেল অ্যানিমিয়া বা কিছু জেনেটিক ডিসঅর্ডার নিরাময়ে ব্যবহার করা সম্ভব। যদি বার্ধক্য-সম্পর্কিত জিনগুলো শনাক্ত করে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহলে মানুষের আয়ু উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।
তবে এর সঙ্গে নৈতিক ও সামাজিক প্রশ্ন জড়িত- মানুষের জিন পরিবর্তন করা কতটা গ্রহণযোগ্য, এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হবে; এসব এখনো স্পষ্ট নয়।
বার্ধক্যের আরেকটি কারণ হলো কোষের অভ্যন্তরে জমে থাকা ক্ষতিকর প্রোটিন ও বর্জ্য পদার্থ। এই সমস্যার সমাধানে ‘সেনোলাইটিকস’ নামে একটি নতুন ধরনের ওষুধ নিয়ে গবেষণা চলছে। ২০১৮ সালে ‘নেচার মেডিসিন’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সেনোলাইটিক ওষুধ প্রাণীর শরীর থেকে সেনেসেন্ট কোষ অপসারণ করে বার্ধক্যের লক্ষণ কমাতে সক্ষম হয়েছে। মানুষের ক্ষেত্রে এই গবেষণা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবে এটি বার্ধক্য বিলম্বিত করার একটি সম্ভাবনাময় উপায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এ ছাড়া ডিজিটাল অমরত্ব বা ‘মাইন্ড আপলোডিং’ ধারণাটি প্রযুক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত আকর্ষণীয়, তবে একইসঙ্গে বিতর্কিত। এই ধারণা অনুযায়ী, মানুষের মস্তিষ্কের সমস্ত নিউরাল সংযোগ ও স্মৃতি ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা হলে ব্যক্তি তার শারীরিক দেহের বাইরে ‘বেঁচে থাকতে’ পারে।
তবে ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন নিউরোসায়েন্স’ জার্নালে ২০১৯ সালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্র বলছে, জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, মানব মস্তিষ্কের জটিলতা এত বেশি যে বর্তমান প্রযুক্তি দিয়ে সম্পূর্ণভাবে তা অনুকরণ করা সম্ভব নয়। মানুষের মস্তিষ্কে প্রায় ৮৬ বিলিয়ন নিউরন এবং তাদের মধ্যে ট্রিলিয়ন সংযোগ রয়েছে, যা সঠিকভাবে ম্যাপ করা এখনো অসম্ভবের কাছাকাছি।
ক্রায়োনিক্স একটি বিতর্কিত কিন্তু জনপ্রিয় ধারণা, যেখানে মৃত্যুর পর মানুষের দেহ বা মস্তিষ্ককে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হয় ভবিষ্যতে পুনর্জীবিত করার আশায়। ‘ক্রায়োবায়োলজি’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, কোষ ও টিস্যু জমাট বাঁধার সময় যে ক্ষতি হয়, তা সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ করা এখনো সম্ভব হয়নি। ফলে ক্রায়োনিক্স এখনো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত কার্যকর পদ্ধতি নয়।
মানুষের আয়ু বৃদ্ধির ক্ষেত্রে জীবনধারার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসা বিষয়ক জার্নাল ‘দ্য ল্যানসেট’ ও ‘নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিন’ এ প্রকাশিত বহু গবেষণায় দেখা গেছে, সুষম খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ধূমপান ও অতিরিক্ত অ্যালকোহল পরিহার- এসবই দীর্ঘায়ুর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
‘ক্যালরিক রেসট্রিকশন’ নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে যে কম ক্যালোরিযুক্ত খাদ্যাভ্যাস প্রাণীদের আয়ু বাড়াতে পারে। একইসঙ্গে কিছু ওষুধ যেমন- মেটফোরমিন ও রাপামাইসিন বার্ধক্য ধীর করার সম্ভাবনা দেখিয়েছে, তবে এগুলো এখনো সাধারণ মানুষের জন্য অ্যান্টি-এজিং ওষুধ হিসেবে অনুমোদিত নয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বায়োটেকনোলজির সমন্বয়ও অমরত্বের গবেষণাকে ত্বরান্বিত করছে। এআই ব্যবহার করে নতুন ওষুধ আবিষ্কার, জিন বিশ্লেষণ ও রোগ নির্ণয় দ্রুততর করা সম্ভব হচ্ছে। ‘নেচার বায়োটেকনোলজি’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে যে এআই-নির্ভর ওষুধ আবিষ্কার পদ্ধতি প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় অনেক দ্রুত ও কার্যকর।
সব মিলিয়ে বর্তমান বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ভিত্তিতে বলা যায়, মানুষের প্রকৃত অমরত্ব এখনো অর্জনযোগ্য নয়। তবে ‘হেলদি লাইফস্প্যান’ বা সুস্থ জীবনকাল বাড়ানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং বিভিন্ন জনসংখ্যা গবেষণা অনুযায়ী, বর্তমানে মানুষের গড় আয়ু ক্রমাগত বাড়ছে, এবং আগামী কয়েক দশকে এটি আরও বৃদ্ধি পাবে। কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন, ভবিষ্যতে মানুষ ১২০ বছরের বেশি সুস্থ জীবনযাপন করতে পারবে, যদিও এটি এখনো নিশ্চিত নয়।
অমরত্ব অর্জনের পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো বার্ধক্যের জটিলতা। এটি কোনো একক কারণের ফল নয়, বরং বহু জৈবিক প্রক্রিয়ার সম্মিলিত ফল। তাই একটি একক সমাধান দিয়ে অমরত্ব অর্জন সম্ভব নয়; বরং বিভিন্ন প্রযুক্তি ও চিকিৎসা পদ্ধতির সমন্বয় প্রয়োজন।
নৈতিক ও সামাজিক দিক থেকেও অমরত্ব একটি বড় প্রশ্ন তৈরি করে। যদি মানুষ অমর হয়ে যায়, তাহলে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, সম্পদের সীমাবদ্ধতা, সামাজিক বৈষম্য- এসব সমস্যা আরও তীব্র হতে পারে। এছাড়া অমরত্ব কি সবার জন্য উপলব্ধ হবে, নাকি শুধুমাত্র ধনী ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত সমাজের জন্য- এই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
সুতরাং, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানুষের জীবনকাল বাড়ানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও প্রকৃত অর্থে অমরত্ব এখনো অনেক দূরের লক্ষ্য। বর্তমান গবেষণার ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী শতাব্দীতে আমরা বার্ধক্যকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করতে পারব, কিন্তু সম্পূর্ণ অমরত্ব অর্জন করতে হলে প্রয়োজন হবে আরও গভীর বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এবং প্রযুক্তিগত বিপ্লব।



