মানুষের মস্তিষ্কে যে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি
জিপিএস আমাদের দিকনির্ণয়ের ক্ষমতা কিছুটা কমিয়েছে, সার্চ ইঞ্জিন স্মৃতিশক্তির ওপর প্রভাব ফেলেছে- এ ধরনের আলোচনা বহুদিন ধরেই চলছে। এখন সেই বিতর্ক আরও বড় আকার নিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর প্রসারের সঙ্গে।
বিজ্ঞানীদের একটি অংশ মনে করছেন, এই প্রযুক্তি যদি অতিরিক্ত নির্ভরতার জায়গা তৈরি করে, তাহলে মানুষের চিন্তা, স্মৃতি, সৃজনশীলতা ও সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ ক্ষমতা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির স্নায়ুবিজ্ঞান বিভাগের গবেষক ও ল্যাবরেটরি ফর রিলেশনাল কগনিশনের পরিচালক অ্যাডাম গ্রিন বলেন, “যখন মানুষ নিজের চিন্তার বদলে যন্ত্রের ওপর নির্ভর করে, তখন সেই চিন্তার দক্ষতা সময়ের সঙ্গে কমে যেতে পারে।” তার মতে, মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখতে নিয়মিত মানসিক পরিশ্রম জরুরি, কারণ চিন্তার অনুশীলনই জ্ঞানীয় ক্ষমতা ধরে রাখে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ইউনিভার্সিটির ডেল মেডিকেল স্কুলের ক্লিনিক্যাল নিউরোসাইকোলজিস্ট ও সহযোগী অধ্যাপক জেরেড বেঞ্জি এই বিষয়ে তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি রাখেন। তার মতে, প্রযুক্তি সবসময়ই মানুষের চিন্তার ধরন বদলেছে।
তিনি বলেন, “প্রযুক্তি নিজে ভালো বা খারাপ নয়; বরং আমরা কীভাবে এটি ব্যবহার করি, সেটিই নির্ধারণ করে এর প্রভাব ইতিবাচক হবে নাকি নেতিবাচক।”
তবে সাম্প্রতিক গবেষণা আশার আলো দেখাচ্ছে না। উদ্বেগের একটি বড় জায়গা হলো ‘কগনিটিভ অফলোডিং’- অর্থাৎ চিন্তার দায়িত্ব বাইরের কোনো যন্ত্রের ওপর ছেড়ে দেওয়া। অতীতে মানুষ গাণিতিক হিসাব, দিকনির্ণয় বা তথ্য মনে রাখার জন্য মস্তিষ্ক ব্যবহার করত। কিন্তু এখন অনেক ক্ষেত্রেই সেই কাজগুলো প্রযুক্তি করে দিচ্ছে।
এর ফলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক অনুশীলন কমে যেতে পারে।
প্রায় দুই দশক আগে ‘ডিজিটাল ডিমেনশিয়া’ ধারণা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল, যেখানে বলা হয়েছিল প্রযুক্তি ব্যবহারে স্মৃতিশক্তি দুর্বল হতে পারে। তবে সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে, যেখানে ৫৭টি গবেষণা ও চার লাখের বেশি মানুষের তথ্য পর্যালোচনা করা হয়, সেখানে দেখা গেছে প্রযুক্তি ব্যবহার সরাসরি মানসিক অবক্ষয়ের কারণ নয়।
বরং কিছু ক্ষেত্রে এটি মানসিক সক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে।
এরপরেও সমস্যা থেকে যায়। কারণ মানুষ যখন সার্চ ইঞ্জিন বা এআই-এর ওপর বেশি নির্ভর করে, তখন তারা তথ্য মনে রাখার বদলে ‘কোথায় পাওয়া যাবে’ সেটাই মনে রাখে। একে অনেক সময় ‘গুগল ইফেক্ট’ বলা হয়। এই প্রবণতা এখন আরও শক্তিশালী হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে। এটি শুধু তথ্য খুঁজে দেয় না, বরং বিশ্লেষণও করে দেয়।
সৃজনশীলতার ক্ষেত্রেও উদ্বেগ রয়েছে। গবেষণা বলছে, এআই ব্যবহার করে তৈরি আইডিয়া অনেক সময় বেশি সাধারণ বা পূর্বানুমানযোগ্য হয়ে থাকে। কারণ মানুষের মস্তিষ্ক অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও ব্যক্তিগত স্মৃতি থেকে যেভাবে নতুন সংযোগ তৈরি করে, যন্ত্র সেই বৈচিত্র্য পুরোপুরি তৈরি করতে পারে না।
মনোযোগের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। দ্রুত তথ্য পাওয়ার অভ্যাস মানুষের ধৈর্য ও গভীরভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, কঠিন সমস্যা আগে নিজে চেষ্টা করে সমাধান করার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত, তারপর এআই ব্যবহার করা ভালো।
এআই ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করা আসলে সমাধান নয়। বরং কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদি এই প্রযুক্তি চিন্তার বিকল্প না হয়ে সহায়ক হয়, তাহলে এটি শেখা ও কাজের দক্ষতা বাড়াতেও সাহায্য করতে পারে।
সব মিলিয়ে প্রশ্নটি এখন আর প্রযুক্তি ভালো না খারাপ- এটি নয়, বরং আমরা নিজেদের চিন্তার ক্ষমতা কতটা ধরে রাখছি, সেটিই মূল বিষয়। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, মানব মস্তিষ্কের স্বতন্ত্র চিন্তা, কল্পনা এবং বিশ্লেষণ ক্ষমতাই এখনো সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সূত্র: বিবিসি



