আগামীর সময়

লিপস্টিক

ঠোঁটের আড়ালে রাজনীতি

ঠোঁটের আড়ালে রাজনীতি

সাজসজ্জায় লিপস্টিকের আধিপত্য সর্বজনবিদিত। ঠোঁট রাঙাতে কেবল নারীরা নন— পুরুষদের মধ্যেও দেখা যায় লিপস্টিকের ব্যবহার। কেবল সৌন্দর্যবর্ধন নয়, ব্যক্তিত্ব কেমন তাও প্রকাশ পায় লিপস্টিক ব্যবহারের মাধ্যমে। অবাক হচ্ছেন বুঝি! আসলে রঙের এই শৌখিন ব্যবহার ব্যক্তিগত হলেও এর রাজনৈতিক ইতিহাস বহু পুরনো। দীর্ঘদিন ধরেই ঠোঁটে রঙ ব্যবহার করে আসছেন নারীরা। তবে শুরুর দিকে সাজসজ্জায় ব্যবহৃত হত ফলের রস এবং বিভিন্ন প্রকার গাছের রস থেকে তৈরি রঙ।

সুমেরীয় সভ্যতা থেকে শুরু করে মিসর সভ্যতা। অতঃপর রোমান সভ্যতা। সাজসজ্জায় রঙের ব্যবহার নারী-পুরুষ সবার মধ্যে। ঠোঁট রাঙাতে তখন ব্যবহার করা হত জাম, বেরি জাতীয় ফল, পান পাতা, মাটি, হেনা, লাল সীসা ইত্যাদি। এছাড়াও গাছগাছালির শিকড়, পোকামাকড় এবং বিবিধ খনিজের ব্যবহারও দেখা যেত ঠোঁটে পরিধানের রং তৈরিতে। সেসব উপাদান ব্যবহার করা হত আঠার সাহায্যে যেন ঠোঁটে টেকসই হয়।
বলা হয়, মিসরের রানী ক্লিওপেট্রা ঠোঁটে লাল রঙ ব্যবহার করতেন। এই রঙ আসত বিটল পোকা থাকে। বিটল পোকা পিষে বানানো হত এই রঙ। এছাড়াও মিসরীয়রা লাল রঙ তৈরিতে ব্যবহার করত আরও কিছু উপাদান। যেমন: এলজিন, ব্রোমিন, আয়োডিন, ইত্যাদি। উচ্চবিত্ত মেসোপটেমিয়ানেরা ঠোঁট রাঙাতে ব্যবহার করত রত্নচূর্ণ।

ষোড়শ শতকের দিকে রানী এলিজাবেথও ছিলেন লিপস্টিকের প্রতি আসক্ত। তিনি সাধারণত ঠোঁটে লাল রঙ ব্যবহার করতে পছন্দ করতেন। লাল লিপস্টিক যদি কারো প্রিয় হয়ে থাকে তবে তিনি সাহসী এবং শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের অধিকারী বলে মনে করা হয়।

লিপস্টিক নামটি কীভাবে এলো

লিপস্টিক নামের প্রচলন হয় প্রথম ১৮৮০ সালে। সর্বপ্রথম বাণিজ্যিকভাবে লিপস্টিক তৈরি করা হয় ফ্রান্সে। সে সময় সুগন্ধি শিল্পের সঙ্গেই শুরু হয় লিপস্টিক শিল্পের। এক দশক পর, সারা ইউরোপ এবং আমেরিকাজুড়ে লিপস্টিক বিক্রি এবং এর প্রসারে বিজ্ঞাপন দেওয়া শুরু করা হয়।

আমরা বর্তমানে যে আকারের লিপস্টিক ব্যবহার করি, তা তৈরি হয় সর্বপ্রথম ‘মরিস লেভি; নামক এক নারীর হাত ধরে, ১৯১৫ সালে। তিনিই প্রথম লিপস্টিকের জন্য এমন ধাতব কৌটা তৈরি করেন যা ঠেলে উপরে তোলা যায়। তারই হাত ধরে লিপস্টিক আধুনিক ধাপ পার করে। এই লিপস্টিকের কৌটাটি ছিল সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে এবং সহজে বহনযোগ্য।

ঠেলে উপরে তোলা যে লিপস্টিক আজ আমরা আধুনিক লিপস্টিক বলে চিনি, এর নাম হলো ‘সুইভেল-আপ লিপস্টিক’।

যুগে যুগে লিপস্টিকের সঙ্গে সমাজ বাস্তবতা, বিতর্ক, ধর্মীয় বাধা, রাজনীতি জড়িয়ে গেলেও এই প্রসাধনীর জনপ্রিয়তা কমেনি একটুও। বরং বেড়েছে। দিনে দিনে লিপস্টকের রঙেও এসেছে বৈচিত্র্য।

লিপস্টিক নিয়ে বিতর্ক

১৯১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ভোটাধিকার আন্দোলনে ক্লারা জেটকিনসহ আন্দোলনরত অন্য নারীরা ক্ষমতা এবং স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে সর্বপ্রথম লাল লিপস্টিক পরে মিছিলে যোগ দেন। কারণ তখন ধারণা করা হত, কড়া মেকআপ করা কিংবা বোল্ড লিপস্টিক পরা নারীরা ব্যভিচারী।

জার্মানির বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, নাৎসি পার্টির নেতা হিটলার লাল লিপস্টিক অপছন্দ করতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন নারীদের লাল লিপস্টিক পরিধানের বিরুদ্ধে আইন জারি করেন তিনি। এছাড়াও ইতিহাসের নানা সময়ে নানা মতাদর্শ এবং ধর্মের উত্থানের সময়ে গাঢ় রঙের লিপস্টিক পরিধানে বাধা দেওয়া হত।

ধারণা করা হত যেসব নারীরা গাঢ় লিপস্টিক পরেন, তারা জাদুবিদ্যার সঙ্গে জড়িত কিংবা শয়তানের উপাসক। অনেক সমাজে যৌনকর্মীদের গাঢ় রঙের লিপস্টিক কিংবা কড়া মেকাপ নিতে বাধ্য করা হত। যেন দেখা মাত্র তাদের চিনতে পারা যায়। এখনও নানা দেশে ধর্মীয় মতাদর্শ মোতাবেক নারীদের লিপস্টিক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। উত্তর কোরিয়াতেও গাঢ় লাল লিপস্টিক ব্যবহার, চুল কাটা এবং সাজসজ্জায় বাধা আছে।

    শেয়ার করুন: