উত্তরের ঈদযাত্রায় ৫৪ রুদ্ধদ্বার

সংগৃহীত ছবি
ঈদ মানে এক চিলতে হাসির ঝিলিক। আবার পথের ধুলোয় মিশে থাকা এক পশলা দীর্ঘশ্বাস। এ সময় নাগরিক ব্যস্ততা ছুটি দিয়ে হৃদয়ের টানে শত মাইলের পথ পাড়ি দেয় একদল কর্মজীবী; যাদের গন্তব্য— প্রিয়জনের স্নিগ্ধ মুখ।
গত বছরের নির্ঝঞ্ঝাট যাত্রার স্মৃতি এখনো অমলিন। তবে এবার মূল ছুটির চাঁদ দেখা দেয়নি। যেহেতু পাঁচদিনের ছুটি ঘোষণা হলেও ছুটি বাড়ানোর আলোচনা চলমান। আজ বৃহস্পতিবার তা জানা যাবে। যদি সময়ের পাল্লা ভারি না হয়, হয়তো ক্লান্তি আর ভোগান্তির কণ্টকাকীর্ণ পথ মাড়িয়ে পৌঁছাতে হবে শিকড়ের টানে।
হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে পথের ভোগান্তির আভাস তুলে ধরা হয়েছে। এতে সারাদেশে মোট যানজটের ১৫৯টি হটস্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। যদিও তখন পর্যন্ত ঢাকা থেকে বেনাপোল, বরিশাল ও মাওয়া পথের যানজটের সম্ভাব্য স্থানগুলো চূড়ান্ত করা হয়নি। বাকিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উত্তরাঞ্চলের পথে ৫৪ বাধা নিশ্চিত করা হয়েছে। আর ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের ৪৯টি, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ৬টি, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ৪২টি এবং ঢাকা-পাটুরিয়া-আরিচা মহাসড়কের যানজটের ৮টি হটস্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব অঞ্চলে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে জেলা, উপজেলা ও মেট্রোপলিটন পর্যায়ে সড়ক নিরাপত্তা কমিটি করা হচ্ছে।
সর্বশেষ ঈদযাত্রা সংক্রান্ত প্রাক প্রস্তুতিমূলক সভায় জানা গেছে এসব তথ্য। সভায় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মোহাম্মদ জিয়াউল হক বলছিলেন, ‘ঈদের অন্তত ১৫ দিন আগেই সকল প্রস্তুতি বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রত্যেক সংস্থা প্রধানকে নিজ আওতাধীন গুরুত্বপূর্ণ স্পটগুলো পরিদর্শন করে ১৫ রোজার মধ্যে ব্যবস্থা নিতে হবে।’
আগামীকাল সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের সভাপতিত্বে সড়ক বিভাগে ঈদযাত্রা নিয়ে সর্বশেষ বৈঠক বসবে। সেখান থেকে ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে সার্বিক দিক নির্দেশনা তুলে ধরা হবে।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) অপধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এবারও ঈদযাত্রায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির দেখা পাবেন উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলা ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি জেলার যাত্রীরা। কারণ ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নবীনগর পর্যন্ত এবং নবীনগর-বাইপাইল-চন্দ্রা মহাসড়কে তীব্র যানজট মানুষকে চরম ভোগান্তিতে ফেলতে পারে।
আবার মহাখালী থেকে উত্তরার আবদুল্লাহপুর হয়ে বাইপাইল-চন্দ্রা পথেও থাকবে যানজট। একই অবস্থা টঙ্গী থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত মহাসড়কে। এই পথে চলে বৃহত্তর ময়মনসিংহের যানবাহন।
আর ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা থেকে এলেঙ্গা হয়ে রংপুর পর্যন্ত অধিকাংশ অংশ ছয় লেন করা হয়েছে। এতে চলাচল সহজ হওয়ার কথা থাকলেও বাইপাইল এলাকায় আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজের কারণে নিচের সড়ক সরু হয়ে গেছে। চন্দ্রা মোড়ে বিভিন্ন গন্তব্যের বাসসহ যানবাহন একত্র হওয়ায় সেখানে যানজটের ঝুঁকি থাকে। টঙ্গী, গাজীপুর ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চল থেকে শ্রমিকেরা একসঙ্গে বের হলে চাপ আরও বাড়তে পারে। এলেঙ্গা এলাকায় সড়ক প্রশস্ত করার কাজ চলছে। অতিরিক্ত যানের চাপ পড়লে যমুনা সেতুর দুই প্রান্তেও জট হতে পারে। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে ওভারপাস নির্মাণকাজের কারণে নিচের সড়ক সংকুচিত, সেখানেও ধীরগতি দেখা দিতে পারে।
প্রস্তুতি সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গাজীপুর অংশে যানজট কমাতে মন্ত্রণালয় থেকে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এর মধ্যে তুরাগ নদীতে বিদ্যমান বেইলি ব্রিজ ও সংযোগ সড়ক সংস্কার করে লোকাল বাস চলাচল উপযোগী করা হবে। গাজীপুর চৌরাস্তায় ময়মনসিংহ থেকে ঢাকাগামী ফ্লাইওভারের রেলিং নির্মাণসহ অসম্পূর্ণ নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা হবে। আব্দুল্লাহপুর থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত মহাসড়কে বিআরটি উড়াল সড়ক, স্টেশন ও নিচের সড়কে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা হবে। এ ছাড়াও উড়াল সড়কের নিচে গাজীপুর শহর ও ঢাকা অভিমুখী ইউটার্ন নির্মাণসহ ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক জরুরিভিত্তিতে সংস্কার করতে বলা হয়েছে।
এদিকে রাজধানী থেকে বের হওয়ার পথে গাবতলী, সাভার, বাইপাইল, চন্দ্রা, উত্তরা থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা, কাঞ্চন ব্রিজ, সায়েদাবাদ, কাঁচপুর এলাকায় যানজটের আশঙ্কা রয়েছে। আর ঢাকা থেকে বের হয়ে দেশের ২১ জেলায় প্রবেশের বড় পথ গাজীপুর। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাজীপুরের দুর্ভোগ পেরিয়ে যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। তাই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য সদরঘাট, মহাখালী, সায়েদাবাদ, গাবতলী ও ফুলবাড়িয়া এই পাঁচটি টার্মিনালকে বিআরটিএ এবং পুলিশ কন্ট্রোলরুমের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।
‘এবার মহাসড়কগুলোয় বড় কোনো সমস্যা দেখছি না। উত্তরাঞ্চলের পথে কিছু জায়গায় সমস্যা হতে পারে। আশা করছি, ঈদযাত্রা ভালো হবে। আমাদের ভালো প্রস্তুতি রয়েছে’, এক প্রশ্নের জবাবে বলছিলেন সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাইনবোর্ড, কাঁচপুরের পূর্ব ঢাল ও মদনপুরে যানজটের আশঙ্কা রয়েছে। পদ্মা সেতু হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলগামী যানবাহনের জন্য সায়েদাবাদ, দোলাইরপাড় ও পোস্তগোলার জট মানুষকে ভোগাবে। বিশেষ করে দোলাইরপাড় মোড়ে গড়ে ওঠা কাউন্টারগুলোর সামনে এবং এক্সপ্রেসওয়ের প্রবেশমুখে বাসের বিশৃঙ্খলায় প্রতি ঈদেই তীব্র জট সৃষ্টি করছে। এক্সপ্রেসওয়ের টোল প্লাজায়ও চাপের কারণে জটের শঙ্কা রয়েছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বিমানবন্দর, উত্তরা, আবদুল্লাহপুর ও গাজীপুর চৌরাস্তা এলাকাও জটের ঝুঁকিতে রয়েছে। আগামীকালের বৈঠকে এসব সমস্যার প্রতিকার বের হয়ে আসবে এমনটাই আশা পরিবহন সংশ্লিষ্টদের।

