নানা সংকটে নড়বড়ে অর্থনীতি, দক্ষিণ কোরিয়ার সহায়তা চায় সরকার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মধ্যপ্রাচ্য সংকট, এলডিসি উত্তরণ ও যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির অনিশ্চয়তা বড় ধরনের সংকটে ফেলেছে দেশের অর্থনীতিকে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, বাণিজ্য প্রবাহের দুর্বলতা ও সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাত আরও ঘনীভূত করেছে সংকটকে। একই সঙ্গে কম রপ্তানি আয় ও বাড়তে জ্বালানি ব্যয় অর্থনীতিতে তৈরি করে ভারসাম্যহীনতার ঝুঁকি।
এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় দক্ষিণ কোরিয়ার ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন ফান্ডের (ইডিসিএফ) কাছে আড়াই হাজার কোটি টাকার ঋণ সহায়তা চেয়েছে সরকার। সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, ঋণের এ অর্থ ব্যয় হবে চলতি বাজেট সহায়তা হিসেবে।
ইডিসিএফ আগেও দেশের বিভিন্ন প্রকল্পে প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দিয়েছে। কিন্তু বাজেট ঘাটতি পূরণে প্রথমবারের মতো ঋণ চাওয়া হলো সংস্থাটির কাছে। অর্থনীতিবিদরা এ ঘটনা দেখছেন ঋণ ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে।
প্রকল্পের চেয়ে বাজেট সহায়তার ঋণের সুদ বেশি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে- এমনটি যোগ করে সরকারের সাবেক শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বললেন, দক্ষিণ কোরিয়ার কাছ থেকে এ ধরনের ঋণ পাওয়া অনেকটা অনিশ্চিত। ঋণ পেলে সেটি ভালো। তবে তাতে কঠিন শর্ত ও উচ্চ সুদহার হতে পারে।
ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, প্রকল্পের ঋণ পাওয়া সহজ হওয়ার কারণ সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে যন্ত্রপাতি ক্রয়সহ আনুষঙ্গিক বিষয় প্রতিপালন করতে হয়। বাজেট সহায়তা হিসেবে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বাইরে জাপান কিছু ঋণ দিচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কোনো রেকর্ড নেই এ ধরনের ঋণ দেওয়ার।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ, বিশেষ করে জ্বালানি ও খাদ্যবাজারে অস্থিরতা মোকাবিলায় দ্রুত নগদ সহায়তার বিকল্প উৎস খুঁজতে বাধ্য করেছে সরকারকে।
সার্বিক এ পরিস্থিতিতে বর্তমান স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং কাঠামোগত সংস্কার ত্বরান্বিত করাই প্রধান অগ্রাধিকার বলে মনে করেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার। তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশ এর প্রভাব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারবে না। এ ছাড়া দেশের জ্বালানি মজুত বর্তমানে প্রায় তিন মাসের চাহিদা মেটানোর মতো, যা একটি গুরুতর সীমাবদ্ধতা। জ্বালানির পাশাপাশি সার ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি পেলে তা সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করবে।
ইআরডির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাজেট সহায়তা হিসেবে সম্প্রতি ২০০ মিলিয়ন বা ২০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ সহায়তা চেয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) চিঠি দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন ফান্ডকে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে তৈরি করেছে অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে, যা বাড়িয়ে দিয়েছে মূল্য অস্থিরতা। এর প্রভাবে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে সৃষ্টি হয়েছে বড় ধরনের চাপ। বিশেষ করে, বাজেট ঘাটতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং মূল্যস্ফীতির ওপর চাপটা একটু বেশিই। এ চাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানের ওপরও ফেলছে নেতিবাচক প্রভাব।
চিঠিতে আরও বলা হয়, উল্লিখিত চ্যালেঞ্জ বাড়াতে পারে সরকারের ব্যয়, যা নতুন সরকারের সম্প্রসারিত সামাজিক সুরক্ষা এবং অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি— স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সুশাসন ও আইটি খাতে কার্যকর বাস্তবায়নকে ফেলতে পারে বাধার মুখে।
ইডিসিএফ কর্মকর্তা ইউ কিউং-জিনের উদ্দেশে লেখা ওই চিঠিতে বলা হয়, প্রাপ্ত বাজেট সহায়তা ঋণ বাংলাদেশের আর্থিক-শৃঙ্খলা, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও চলমান এবং পরিকল্পিত সামাজিক সুরক্ষা ব্যয় অব্যাহত রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। অবশ্য এসব বিষয়ে সুপারিশ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এ ছাড়া বৈশ্বিক সংঘাত বা বিঘ্নজনিত বহিঃঝুঁকি মোকাবিলায় দেশের সক্ষমতা জোরদারেও সহায়ক হবে।
নতুন সরকারের বিচক্ষণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং উদীয়মান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় নীতিমালা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় ওই চিঠিতে। কোরিয়া এক্সিম ব্যাংক অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে যৌথ অর্থায়নের মাধ্যমে এই বাজেট সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করার অনুরোধ জানায় সরকারের পক্ষ থেকে।
এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানালেন, ঋণ কর্মসূচি নিয়ে পরবর্তী আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ও কোরিয়ার মধ্যকার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তিতে সুযোগটি নিতে চায় বাংলাদেশ।
দক্ষিণ কোরিয়ার ইডিসিএফ সাধারণত অবকাঠামো, পরিবহন, পানি ও আইটি- এ ধরনের নির্দিষ্ট প্রকল্পে ঋণ দিয়ে আসছে। দাতা সংস্থার মধ্যে সরাসরি বাজেট সহায়তা করে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ। ফলে ইডিসিএফ তাদের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারে এ ধরনের কার্যক্রম নেই বললে চলে।
তারপরও এই দাতা সংস্থার কাছ থেকে সহায়তা পেলে অর্থনীতিতে চাপ কিছুটা কমবে বলে আশা। কারণ আইএমএফের ঋণের শর্ত পূরণে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, ভর্তুকি কমানো এবং আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার মতো সংস্কার করতে গিয়ে আর্থিক খাতে বেড়েছে সরকারের চাপ। এই ঋণ অনুমোদন হলে দেশের ঋণ ব্যবস্থাপনায় তৈরি হতে পারে একটি নতুন ধারা। যেখানে প্রকল্পভিত্তিক ঋণের পাশাপাশি বাজেট সহায়তা পেতে দ্বিপক্ষীয় উৎসগুলোর দিকে ঝুঁকবে সরকার।



