বিদ্যুতের নতুন দর কার্যকর হতে পারে জুনে
- দেড় টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব
- ছাড় পাবেন ক্ষুদ্র গ্রাহক
- আয় বাড়বে সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা
- আইএমএফের চাপের প্রভাব

সংগৃহীত ছবি
কদিন আগেই সব ধরনের তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর বেড়েছে পরিবহন ভাড়া। ঊর্ধ্বমুখী দৈনন্দিন ব্যয়। এবার শুরু বিদ্যুতের দাম বাড়ার প্রক্রিয়া। আগামী ২০ মে শুনানিতে পাস হলে জুনে কার্যকর হতে পারে নতুন দর। বিদ্যুৎ-জ্বালানি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয়ে আরও বাড়বে দীর্ঘশ্বাস।
তেল আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়া, অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিশাল ক্যাপাসিটি চার্জ আর পাহাড়সম ভর্তুকির চাপ সামলাতেই মূল্যবৃদ্ধির এই প্রক্রিয়া বলে দাবি এ বিভাগের কর্মকর্তাদের।
পিডিবিসহ অন্য সব বিতরণ কোম্পানি বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব কমিশনে দিয়েছে জমা। এর ওপর গণশুনানি হবে আগামী ২০ ও ২১ মে। সেখানে যৌক্তিকতা যাচাই করে বিদ্যুতের নতুন দর ঘোষণা করা হবে
বিভিন্ন উৎপাদন কেন্দ্রের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনে তা পাইকারি দামে রাষ্ট্রায়ত্ত বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছে বিক্রি করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। বিতরণ কোম্পানিগুলো দেয় গ্রাহকপর্যায়ে। পিডিবি পাইকারি বিদ্যুৎ বিক্রির পাশাপাশি খুচরা—অর্থাৎ গ্রাহকপর্যায়েও সরবরাহ করে। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে দেড় টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। সে হিসাবে গ্রাহকপর্যায়ে প্রতি ইউনিটে বাড়তে পারে ৭০ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ১ টাকা ৩৮ পয়সা। তবে তা নির্দিষ্ট হবে গণশুনানির পর।
‘পিডিবিসহ অন্যসব বিতরণ কোম্পানি বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব কমিশনে দিয়েছে জমা। এর ওপর গণশুনানি হবে আগামী ২০ ও ২১ মে। সেখানে যৌক্তিকতা যাচাই করে বিদ্যুতের নতুন দর ঘোষণা করা হবে’— আগামীর সময়কে বলছিলেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ।
দেশের স্বল্প ব্যবহারকারী বা ‘লাইফলাইন’ বিদ্যুৎ গ্রাহকদের (৭০-৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারী) আপাতত এ বাড়তি চাপের বাইরে রাখার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা। এতে গ্রাহকের প্রায় ৬৩ শতাংশ সুরক্ষিত থাকতে পারেন, অন্য ৩৭ শতাংশের ওপর পড়বে বাড়তি চাপ।
বর্তমানে দেশে প্রায় পাঁচ কোটি বিদ্যুৎ গ্রাহক। বড় অংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের। তবে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে খরচ বাড়লে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্য ও সেবার দামে পড়তে পারে, যা মূলত সবাইকে চোকাতে হবে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।
এদিকে সঞ্চালন খরচও বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি প্রতি ইউনিটে অতিরিক্ত ১৬ পয়সা সঞ্চালন চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে, যা প্রভাব ফেলতে পারে চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণে।
ঘাটতি দেখিয়ে বারবার বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম বাড়ানো কোনো স্থায়ী সমাধান নয় বলে মনে করেন ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম।
তার অভিযোগ, বিদ্যুৎ খাতে লুটপাট ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ে তৈরি হয়েছে কৃত্রিম ঘাটতি। অদক্ষতা ও অতিরিক্ত ব্যয় কমালে ভর্তুকির চাপ কমত।
এর আগে বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের জন্য গত ৯ এপ্রিল গঠন করা হয় উচ্চপর্যায়ের একটি মন্ত্রিসভা কমিটি। সেই কমিটিতে গ্রাহকপর্যায়ে দাম ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব দেয় বিদ্যুৎ বিভাগ। তবে দাম অনেক বেশি হওয়ায় তা নিয়ে আপত্তি ওঠে। দাম কিছুটা কমিয়ে নীতিগত অনুমোদনের পর গত সোমবার প্রস্তাবটি বিইআরসিতে দেয় বিদ্যুৎ বিভাগ। সেটি আমলে নিয়ে কমিশন একটি কারিগরি কমিটিও গঠন করেছে।
কমিশনের নিয়ম অনুসারে, সংস্থাগুলোর প্রস্তাব মূল্যায়ন করবে কারিগরি কমিটি। তাদের সুপারিশ ও সব সংস্থার প্রস্তাব নিয়ে অংশীজনদের অংশগ্রহণে হবে গণশুনানি। সেখানে যৌক্তিকতা প্রমাণ করার ভিত্তিতে দাম বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে কমিশন। বিদ্যুৎ খাতে আয়-ব্যয়ের ঘাটতির সঙ্গে সরকারের প্রতিশ্রুত ভর্তুকি সমন্বয় করে ঠিক করা হবে দাম বাড়ানোর পরিমাণ।
পিডিবি বছরে ৯ হাজার কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। প্রতি ইউনিটের দাম দেড় টাকা বাড়লে বছরে সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা বেশি আয় করতে পারবে প্রতিষ্ঠানটি। আর ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়লে বছরে বাড়তি আয় হবে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। একই সঙ্গে আয় বাড়বে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেরও।
দেশের বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের (বৃদ্ধি অথবা হ্রাস) এখতিয়ার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি)। তবে ২০২২ সালের শেষদিকে আওয়ামী লীগ সরকার বিইআরসিকে পাশ কাটিয়ে নির্বাহী আদেশে দফায় দফায় বাড়িয়েছে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম। দেড় দশকে পাইকারিতে ১২ ও গ্রাহকপর্যায়ে ১৪ বার দাম বাড়ায় আওয়ামী লীগ সরকার। অন্তর্বর্তী সরকার এসে দাম বাড়ানোর ক্ষমতা ফেরায় বিইআরসিতে।
বিশেষ ক্ষমতা আইন করে দরপত্র ছাড়া একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। এতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া (ক্যাপাসিটি চার্জ) দিতে গিয়ে ব্যাপক চাপে পড়ে সরকার। যদিও জ্বালানির অভাবে সম্ভব হয় না সক্ষমতার অর্ধেক বিদ্যুৎ উৎপাদন।
সবশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ে। তখন পাইকারি পর্যায়ে প্রায় ৫ শতাংশ এবং খুচরায় গড়ে ৮ শতাংশ বাড়ে। বর্তমানে প্রতি ইউনিট খুচরা বিদ্যুতের গড়মূল্য ৮ টাকা ৯৫ পয়সা এবং পাইকারি ৭ টাকা ৪ পয়সা।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা উঠলেও সরকারের ঘোষণা ছিল দাম না বাড়ানোর। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে দ্বিগুণের বেশি হয়েছে বিশ্ববাজারে। দেশেও বেড়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে খরচ। ঘাটতি সামলাতে গত ১৮ এপ্রিল নির্বাহী আদেশে বাড়ানো হয় জ্বালানি তেলের দাম।
আইএমএফের চাপ
বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, ২০২৫ সালে এ খাত পর্যালোচনায় প্রতিনিধিদল পাঠায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে টানা দুই সপ্তাহ চলে তাদের আলোচনা। প্রতিনিধিদলের সুপারিশ, বিদ্যুৎ খাতে দক্ষতা বাড়ানো এবং ভর্তুকি কমাতে দরকার তিন বছর মেয়াদি একটি রোডম্যাপ। একই সঙ্গে পরামর্শ দেওয়া হয়; দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সুরক্ষা রেখে ধাপে ধাপে বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের।
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ বিক্রয়মূল্যের তুলনায় অনেক বেশি। প্রতি ইউনিটে বর্তমানে ঘাটতি প্রায় ৫ টাকা ৫০ পয়সা। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি, কয়লা ও তেলের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ হয়েছে আকাশচুম্বী। এ ছাড়া বসিয়ে রাখা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ মেটাতেও হিমশিম খাচ্ছে পিডিবি। চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ঘাটতি ছাড়িয়ে যেতে পারে ৫৬ হাজার কোটি টাকা।



