ডিজেলের দামে লাফ
ভাড়ার নৈরাজ্যে গণপরিবহন এখন তর্ক-বিতর্কের মঞ্চ
- ঢাকার নগর পরিবহনে ইচ্ছামতো ভাড়া আদায়
- সরকারি সিদ্ধান্ত ছাড়া ভাড়া না বাড়ানোর নির্দেশ মালিক সমিতির
- সরকারের পক্ষ থেকে এখনই ভাড়া না বাড়ানোর আহ্বান
- যাত্রী ও চালক-হেলপারদের মধ্যে হচ্ছে হাতাহাতিও

ফাইল ছবি
ডিজেলের দাম বাড়ার পর সরকারি সিদ্ধান্ত ছাড়া কোনোভাবেই বাসের ভাড়া না বাড়াতে পরিবহন মালিকদের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। সরকারের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে এখনই ভাড়া না বাড়ানোর আহ্বান।
কিন্তু কে শোনে কার কথা, ঢাকার নগর পরিবহনগুলোয় ইচ্ছামতো আদায় হচ্ছে ভাড়া। এতে দুই দিন ধরে গণপরিবহনগুলো হয়ে উঠেছে যাত্রী ও চালক-হেলপারদের তর্ক-বিতর্কের মঞ্চ। হাতাহাতির মতো অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটছে কখনো কখনো।
এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন— কবে আসবে ভাড়া বৃদ্ধির সরকারি ঘোষণা? কতটুকু বাড়বে ভাড়া? কবে বন্ধ হবে ভাড়ার নৈরাজ্য, কমবে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি?
‘মালিকরা সরকারের কথামতো বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। শ্রমিকদের বিষয়টি থাকে না তাদের মাথায়। তাদের সিদ্ধান্ত মেনে চলতে গেলে ছাড়তে হবে কাজ’
গত শনিবার রাতে সরকার নির্ধারণ করে দিয়েছে জ্বালানি তেলের নতুন দাম। এরপর প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বেড়ে হয়েছে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০, অকটেন ১৪০ এবং পেট্রল ১৩৫ টাকা, যা কার্যকর হয়েছে রবিবার থেকে। রাজধানীর অধিকাংশ বাস ডিজেলচালিত হওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে গণপরিবহনে। এরপর থেকেই বিশৃঙ্খলা আর নৈরাজ্যের কবলে খাতটি।
বুধবার ঘটনাস্থলে দেখা গেছে, সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় স্বল্প দূরত্বের যাত্রায় আদায় হচ্ছে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া। কোনো কোনো রুটে বেড়েছে আরও। অবশ্য কিছু পরিবহনে এখনো নেওয়া হচ্ছে আগের ভাড়াই।
ফারদিন নামে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী জানালেন, আগে শেওড়াপাড়া থেকে ধানমণ্ডি ৩২-এর স্টুডেন্ট ভাড়া ছিল ১০ টাকা। কিন্তু দুদিন থেকে তা নেওয়া হচ্ছে ১৫ টাকা। যে কারণে ঝামেলা বাধছে পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে।
আফনান হোসেন নামে আরেক যাত্রী জানালেন, রমজান পরিবহন নামের একটি বাসে আগে কাকরাইল থেকে শাহবাগ পর্যন্ত ভাড়া ছিল ১৫ টাকা, যা দূরত্ব হিসেবে স্বাভাবিকেরও অনেক বেশি। সোমবার থেকে মাত্র সোয়া দুই কিলোমিটার ওই পথটুকুর ভাড়া আদায় হচ্ছে ২০ টাকা করে।
আফনানের মতো ওই পথে চলাচলকারী যাত্রীরা বাড়তি ভাড়া আদায়কে তুলনা করলেন ডাকাতির সঙ্গে। হেলাল আহমেদ নামে রমজান পরিবহনের আরেক যাত্রীর অভিযোগ, ‘ওয়েবিল’ নামের ‘অবৈধ সিস্টেম’ জারি রেখে পকেট কাটা হচ্ছে যাত্রীদের। তার দাবি, কাকরাইল থেকে মৎস্য ভবন ৫ টাকা হতে পারে, সর্বোচ্চ ১০ টাকা নেওয়া উচিত। কিন্তু আগে ১৫ টাকা নিত, এখন ২০ টাকা নিচ্ছে— এটা ডাকাতি ছাড়া কিছু না।
একই চিত্র দেখা গেছে মালিবাগ থেকে মহাখালী রুটেও। আজমেরী পরিবহন আগে যেখানে ১০ থেকে ১৫ টাকা ভাড়া নিত, এখন আদায় করা হচ্ছে ২০ টাকা। একইভাবে ‘বলাকা’ পরিবহনও ৫ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে ভাড়া।
বেশি ভাড়া নেওয়া পরিবহনগুলোর চালক-সহকারীদের যুক্তি, বাড়তি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে তাদের। কিন্তু মালিকরা তার দায় নিচ্ছেন না। ফলে জ্বালানির বাড়তি পয়সা যাচ্ছে তাদের পকেট থেকেই। এজন্য বাধ্য হয়েই বাড়াতে হয়েছে ভাড়া ।
পরিচয় প্রকাশ না করা শর্তে এক চালকের অভিযোগ, ‘মালিকরা সরকারের কথামতো বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। শ্রমিকদের বিষয়টি থাকে না তাদের মাথায়। তাদের সিদ্ধান্ত মেনে চলতে গেলে ছাড়তে হবে কাজ।’
তবে যাত্রী কল্যাণ সমিতি এভাবে ভাড়া বাড়ানোকে বলছে অযৌক্তিক। সংস্থাটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেছেন, ‘ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে। আগের হিসাব অনুযায়ী বাস ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১৫ পয়সা বাড়তে পারে। এর বেশি বাড়ানো হলে জনরোষ তৈরি হবে।’
এদিকে সব পরিবহন ভাড়া বাড়ায়নি। মেনে চলছে মালিক সমিতির নির্দেশনা। গুলিস্তান-শাহবাগ-উত্তরা রুটের ‘এয়ারপোর্ট’ পরিবহন এখনো নিচ্ছে আগের ভাড়াই। শাহবাগ থেকে মহাখালী বা বনানী পর্যন্ত রাখা হচ্ছে ২০ টাকা। ‘এয়ারপোর্ট’ পরিবহনের একটি বাসের চালকের সহকারী কামরুল জানালেন, তারা অপেক্ষা করছেন সরকারের সিদ্ধান্তের। একই অবস্থান নিয়েছে মিরপুর রুটের শিকড় পরিবহন ও বিআরটিসির বাসগুলো।
গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের নির্দেশ দিয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত বাস ভাড়া না বাড়াতে বলেছে। অবশ্য সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম পরিবহন খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে জ্বালানির দাম ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দ্রুত ও যৌক্তিকভাবে ভাড়া পুনর্নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন সরকারের প্রতি।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির অতিরিক্ত মহাসচিব এ এম এস আহমেদ খোকন জানিয়েছেন, বাড়তি ভাড়া নেওয়ার কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি তাদের পক্ষ থেকে। গত রবিবারের বৈঠকেও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি, আজ বুধবার মন্ত্রণালয়ে এ নিয়ে বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে বৃহস্পতিবার সিদ্ধান্ত হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। বুধবার সচিবালয়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে নতুন বাস ভাড়া নির্ধারণ সংক্রান্ত বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী জানালেন, সভায় পরিবহনের নতুন ভাড়া নির্ধারণ হয়নি। বাস-ট্রাকসহ পরিবহনের নতুন ভাড়া নির্ধারণ নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে বৃহস্পতিবার।
এর আগে ২০২২ সালের আগস্টে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলে ওই সময় সরকারি সিদ্ধান্তে পরিবহন ভাড়াও বাড়ানো হয়। ওই সময় দূরপাল্লার বাসে প্রতি কিলোমিটার ভাড়া ২.২০ টাকা এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে ২.৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এ ছাড়া সর্বনিম্ন ভাড়া বাসে ১০ টাকা এবং মিনিবাসে ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এরপর নানা অজুহাতে পরিবহন মালিকরা বিভিন্ন সময় ভাড়া বাড়ানোর তৎপরতা চালিয়েছিলেন। কিন্তু ভাড়া বাড়ায়নি সরকার।



