দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের আলোচনায় গতি
খুলবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নতুন দুয়ার, ঘুচবে দীর্ঘ অপেক্ষা
- সেতু নির্মাণের ব্যবস্থা নিতে সেতু মন্ত্রণালয়ে চিঠি মন্ত্রী আফরোজা খানমের
- দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর প্রতিশ্রুতি রয়েছে বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে
- বাস্তবায়ন হলে তা হবে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার স্বপ্নপূরণের অংশ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় প্রথম পদ্মা সেতু চালুর পর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থায় এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। তবে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া এবং মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া নৌপথ ব্যবহারকারী বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর কমেনি ভোগান্তি। কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ এবং পাবনাসহ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একাংশের মানুষ এখনো নির্ভরশীল এ রুটের ফেরি পারাপারে। দীর্ঘ যানজট এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায় ফেরি চলাচল বন্ধ থাকলে পণ্যবাহী ট্রাক ও যাত্রীবাহী বাসের শত শত যাত্রীকে পড়তে হয় চরম দুর্ভোগে, যা নিরসনে ফের জোরালো হচ্ছে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের দাবি। নতুন সরকারের উচ্চপর্যায়েও সম্প্রতি এ নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন করে চিঠিপত্র চালাচালি।
পদ্মাঘেঁষা জেলা মানিকগঞ্জের সংসদ সদস্য বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম গত ২৯ মার্চ এ সেতু নির্মাণের ব্যবস্থা নিতে চিঠি পাঠিয়েছেন সেতু মন্ত্রণালয়ে। এটি মূলত বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ও প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্বপ্নপূরণের একটি অংশ। ১৯৯৮ সালে প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শুরু হলেও মাঝে এর গতি ছিল থমকে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর এখন এটি ফের এসেছে আলোচনায়।
প্রস্তাবিত এ সেতুর দৈর্ঘ্য হতে পারে ৬ কিলোমিটারের বেশি। এটি রেল সংযোগসহ সম্ভাবনা রয়েছে ডাবল-ডেকার হওয়ার। আর এতে করে কমবে নদী পারাপারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা। পারাপার সম্পন্ন হবে মাত্র ৫-১০ মিনিটে।
সেতুটি নির্মিত হলে ২১ জেলার যাতায়াতে সময় সাশ্রয় হবে দুই-তিন ঘণ্টা। ফরিদপুর, যশোর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার তৈরি হবে সরাসরি সংযোগ। এতে কৃষিপ্রধান এ অঞ্চলের কাঁচামাল দ্রুত পৌঁছাবে ঢাকা। পণ্য পরিবহনে গতি আসায় বৃদ্ধি পাবে জাতীয় জিডিপি। পাশাপাশি গ্যাস সংযোগের সুবিধা পাওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে সৃষ্টি হবে কলকারখানা ও কর্মসংস্থান।
পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ঘাটে অতীতে ফেরি পারাপারের সময় ঘটেছে অনেক দুর্ঘটনা। সেতুটি হলে মানুষের জীবনহানির ঝুঁকি কমবে। এ ছাড়া এটি ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ওপর চাপ কমাবে এবং বঙ্গবন্ধু সেতুর শক্তিশালী বিকল্প রুট হিসেবে কাজ করবে।
এমন প্রেক্ষাপটে সরকারের উচ্চমহল এবং সেতু বিভাগ থেকে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে সমীক্ষা ও আলোচনার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
আফরোজা খানম যোগাযোগ মন্ত্রণালেয়ে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করেন, ‘এই সেতু নির্মাণ বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতিশ্রুতি। এ সেতুটি নির্মাণ হলে দক্ষিণাঞ্চলের জনসাধারণের যাতায়াতব্যবস্থা আরও সহজীকরণ হবে। পাশাপাশি এ সেতু এই অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং নতুন নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।’
দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য পদ্মা সেতু তৈরির প্রাক সম্ভাব্যতার সমীক্ষা শুরু হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। সেই সমীক্ষার বাস্তব রূপ পায় ২০২২ সালের ২৫ জুন সেতুর উদ্বোধনের মাধ্যমে। এতে পার হয়েছে ২৪ বছর।
পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পরপরই আলোচনায় আসে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের বিষয়টি। এর প্রাথমিক সমীক্ষা শুরু হয়েছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে, যা শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৪ সালের জুনে। তবে সেই সরকারের আমলে সেটি আর এগোয়নি।
বর্তমানে বৃহত্তর ফরিদপুর, যশোর ও কুষ্টিয়ার মানুষ ফেরির মাধ্যমে দৌলতদিয়া ঘাট থেকে পদ্মা পার হয়ে আসেন নদীর পাটুরিয়া প্রান্তে। সাধারণত ফেরিতে যানবাহন লোড-আনলোড এবং ঘাটে ভেড়ার সময়ের ওপর ভিত্তি করে নদী পার হতে চলে যায় অন্তত এক ঘণ্টা। এ ছাড়া ঘন কুয়াশায় ফেরি চলাচল বন্ধ থাকলে তাদের অপেক্ষা করতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তবে সেতু নির্মাণ হলে এ সময় নেমে আসবে মাত্র ৫ থেকে ১০ মিনিটে।
বিশেষ করে ঈদ এলেই জীবনের শঙ্কা নিয়ে ঘরে ফিরতে হয় এ অঞ্চলের যাত্রীদের। ঝুঁকি নিয়েই পার হতে হয় প্রমত্তা পদ্মা।
বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, এবার শেষমেশ সত্যিই দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটে হতে চলেছে সেতু— এমন আশায় বুক বেঁধেছেন এ অঞ্চলের বহু মানুষ। তাদেরই একজন রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দির সোনাপুর গ্রামের বাসিন্দা ডা. মাহমুদ। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘সেতু নির্মাণ হলে আমাদের যোগাযোগব্যবস্থায় বড় অগ্রগতি হবে। পাশাপাশি সেতুর মাধ্যমে গ্যাস আসবে আমাদের অঞ্চলে। ফলে এখানে বিভিন্ন শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে। যার ফলে এ অঞ্চলে সৃষ্টি হবে নতুন নতুন কর্মসংস্থান, যা সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সবক্ষেত্রেই বড় পরিবর্তন আনবে।’
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনসাধারণের কাছে এ সেতু দৃশ্যমান হওয়া একটি আশা। তারা মনে করেন, দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণ শেষ হলে তাদের সময় যেমন বাঁচবে, ঠিক তেমনি পারাপারের ঝুঁকিও কমবে। পাশাপাশি এ সেতু তাদের শিক্ষা, বাণিজ্যে ও জীবনযাত্রার মানে ফেলবে ইতিবাচক প্রভাব, যা তাদের জন্য একটি বৃহৎ দুয়ার খুলবে।
দ্বিতীয় পদ্মা সেতুকে নিজের অঞ্চলের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ হিসেবে দেখছেন কুষ্টিয়ার কুমারখালীর মোশারফ হোসেন। তিনি বললেন, ‘আমাদের এ অঞ্চলটি তাঁতশিল্প এলাকা, সেতু থাকলে সকালে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিলে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টার ভেতর খুব সহজেই ঢাকা যেতে পারবে মানুষ। বর্তমানে ফেরি পারাপারের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেরিঘাটে বসে থাকতে হয়। এতে করে সঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে দেরি হয়।’
‘পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরি পারাপারের সময় বাস বা ট্রাক নদীতে পড়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। দ্বিতীয় পদ্মা সেতু হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১০টির বেশি জেলার লাখ লাখ মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন হবে। সেই সঙ্গে দেশের অর্থনীতিতে রাখবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।’
যমুনা সেতু ও প্রথম পদ্মা সেতুর ওপর চাপ কমাতে এবং ঢাকার সঙ্গে সংযোগ আরও সহজতর করতে দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামানের মতে, সেতু শুধু যোগাযোগ করিডর নয়, অর্থনৈতিক করিডরও হতে হবে। বড় বিনিয়োগের আগে জিডিপির দিকে লক্ষ রেখে এগোতে হবে।



