দখলের ফুটপাতে ফুটন্ত কেটলি
- ফুটপাত পথচারিদের নামিয়ে দিয়েছে রাস্তায়
- ১২০ ফুট সড়ক নেমেছে ৪০-৫০ ফুটে
- পুলিশ কী করছে বছরভর-উঠেছে প্রশ্ন
- দখলদারমুক্ত হওয়া নিয়ে সংশয়

সারি সারি দোকান। চলে বেঞ্চ পেতে খাওয়া দাওয়া। কলার খোসা, কাটা তরমুজ, মাছের কাটা, কাঠের টুকরো, তেল মবিলের মতো বর্জ্য ফুটপাথেই পড়ে থাকে। পুতিময়দুর্গন্ধ ছড়ায় মাঝেমধ্যেই।
শুধু খাওয়ার বন্দোবস্ত? ভাষানটেকের এই ফুটপাতে কী নেই। বাঁশ, কাঠ, লোহালক্কর সংসার সাজানোর সব! আর এই সব ধারণ করতে গিয়ে ফুটপাত পথচারিদের নামিয়ে দিয়েছে রাস্তায়। তাদের ওপর উঠে যাচ্ছে অটোরিক্সা মিনিট্রাক।
ভাষানটেক-মিরপুর ১৪ রাস্তাটি প্রশস্তে ১২০ ফুট। লন্ডন শহরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার চেয়ে চওড়া। অবৈধ দখলে সড়কটি কোথাও ৪০ থেকে ৫০ ফুটে নেমেছে। বাকি অংশেও অস্থায়ী বাসস্ট্যান্ড, রিক্সা গ্যারেজ আর পার্কিংয়ের কারণে চলাচল দায়। একটু পর পর চায়ের দোকান। মনে হয় পুরো ভাষানটেকবাসী চায়ের জন্য তৃষ্ণার্ত। দখলের ফুটপাতে ফুটন্ত কেটলি। সসপেনে টগবগ করে ফুটছে গরুর দুধের নামে কন্ডেন্স ও পাউডার মিল্কের অদ্ভূত মিশেল।
ঢাকা শহরে উচ্ছেদের হাওয়া। গত রবিবার সরেজমিনে গিয়ে সেই হাওয়া ঢুকল কানে। গলা চড়িয়ে পুলিশের প্রচারণা ‘আমরা আসছি... নির্বার্হী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে। কাজেই সরে পড়ুন। নইলে এবার ছাড় নেই...।’
কিন্তু পুলিশ কী করছে বছরভর? থানা তো ফুটপাতের গা ঘেঁষেই? সিটি করপোরেশন অফিসার-কর্মীরাই বা করছেনটা কী? ফুটপাতের কয়েকজন বিক্রেতা হাসলেন। তারা প্রায় সমস্বরে পাল্টা প্রশ্ন করেন, পুলিশ-করপোরেশন কর্মীরা কী নেতাদের সঙ্গে ‘টক্কর’ দেওয়ার সাহস দেখাবে? ভাষানটেক নিয়ে তাদের ভাষ্য, ‘সব সরকারই ফুটপাত দখলমুক্ত করতে চায়। ভাষানটেক ফুটপাত দখলমুক্ত করতে চেয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারও। নেমেও পিছু হটতে বাধ্য হয়। এবার নতুন সরকার। আমাদের উচ্ছেদ করে কী লাভ? যারা আমাদেরকে বসায় তাদের ধরা দরকার। আমরা টাকা দেই। সেই টাকা কে নেন, কোথায় কোথায় যায় তা খোলাসা করতে গেলে বিপদ।’
এই সড়কের দুপাশে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর। আছে বিশ্বখ্যাত সিআরপি পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্র। যেখানে সেবা নিতে ছুটেন ঢাকার সবপ্রান্তের মানুষ। আসেন রাজধানীর বাইরে থেকেও। ঢাকা ডেন্টাল কলেজ, জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন, সরকারি হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, জাতীয় জরিপ অধিদপ্তর, ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট একাডেমিসহ আছে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষার্থী, সেবাগ্রহিতা ও সাধারণ মানুষ নিত্য চলাচলে ব্যবহার করেন সড়কটি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সড়কের দুই পাশজুড়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ দোকানপাট ও স্থাপনা। সড়কটির মতো এর ফুটপাতের দশাও বেহাল। ফাঁকা ফুটপাত মাঝেমধ্যে দেখা যায়। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ আসার মতো! বসানো হয়েছে কাঁচাবাজার, মিনি বাসস্ট্যান্ড। আছে ময়লার ডাষ্টবিন। ফলে পথচারীদের বাধ্য হয়ে মূল সড়কে নেমে চলাচল করতে হচ্ছে, যা বাড়িয়ে দিচ্ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত নাম প্রকাশে অনাগ্রহী ওই সড়কের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘প্রায় ১০ বছর ধরে এখানে ব্যবসা করছি। তবে এজন্য একটি প্রভাবশালী চক্রকে দিতে হয় নিয়মিত চাঁদা।’
তার ভাষ্য, তাদের জন্য নির্ধারিত কোনো জায়গা বরাদ্দ থাকলে অবৈধভাবে ফুটপাত দখল করে বসাতেন না দোকান।
ওই সড়কে নিয়মিত চলাচলকারী পথচারী আমিনুল ইসলামের খেদোক্তি, ‘বছরের পর বছর ধরে একই দশা। মাঝে মাঝে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও দু-এক দিনের মধ্যেই আবার ফিরে যায় আগের অবস্থায়।’
তার দাবি, উচ্ছেদ অভিযান চললেও বেশিরভাগ সময়ই তা লোক দেখানো। উচ্ছেদের পর আর খোঁজ রাখে না কর্তৃপক্ষ।
এদিকে রবিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ভাষানটেক থানার পরিদর্শক (অপারেশনস) মোহাম্মদ রাশেদুজ্জামানের নেতৃত্বে একটি দল হঠাৎই উচ্ছেদ অভিযান চালায়। এ সময় সড়কটির দুপাশে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা দোকানপাট ও মালামাল সরানোর নির্দেশ দিয়ে করা হয় দখলদারদের সতর্ক।
এই পুলিশ কর্মকর্তা দিলেন কড়া বার্তাও। ‘আজ আমরা সতর্কতামূলক অভিযান পরিচালনা করেছি। ভবিষ্যতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। তখন অবৈধ দখলদারদের জরিমানা ও কারাদণ্ড দেওয়া হবে। এবার আমরা আগের মতো উচ্ছেদ করেই দায়িত্ব শেষ করব না। নিয়মিত তদারকির মধ্যে রাখা হবে।’
নিয়মিত ফুটপাতে হাঁটতে চান স্থানীয়রা। কিন্তু তা সম্ভব হয় না দখলদারদের কারণে। তাদের ভাষ্য, ফাঁকা ফুটপাত মানে স্বাস্থ্যকর পরিবেশও, সকালে বা রাতে হনহন হাঁটলে ভালো থাকে শরীর-মন। কিন্তু তা কি সম্ভব! ফাঁকা ফুটপাত মানে এক অর্থে একলা চলার শিক্ষাও। সন্তানকে একা বাজারহাট করা শেখাতে চান, পারবেন না। কারণ রাস্তায় বেরোলে তাকে হাঁটতে হবে রাস্তাতেই ফুটপাতে তো দখলে। আর রাস্তায় হাঁটা মানে প্রাণ হাতে করে হাঁটা।



