আগামীর সময়

হকার সরানোর অভিযান, রইল প্রশ্নও

হকার সরানোর অভিযান, রইল প্রশ্নও

যেকোন নীতিবৈঠকে বারবারই হটইস্যু ফুটপাত। হকারদের নিয়ে সবারই তীব্র ক্ষোভ। এককথা রাজধানীর স্বাভাবিক চলাচল ঠিক রাখতে তুলে দিতে হবে অস্থায়ী দোকান। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িত শত শত পরিবারের রুজি। সরকারের জন্য উভয়সঙ্কট ফুটপাত মুক্ত করলেও, না করলেও।

সবকিছুর পর ফুটপাত দখলমুক্ত করার সিদ্ধান্ত এসেছে। বুধবার সকাল থেকেই মগবাজার-বাংলামোটরসহ নানা জায়গায় অস্থায়ী দোকানের কাঠামো ভেঙে দেওয়া হয়। বাঁশের মাচা পলিথিনের কাঠামো দিয়ে দোকান তৈরি করা হয়েছিল। সে সবও ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এনিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে জনমানসেও।

রাষ্ট্রের চোখে যা ‘অবৈধ দখল উচ্ছেদ’, শত শত নিম্নবিত্ত মানুষের চোখে তা কেবল একমুঠো অন্নের নিশ্চয়তাটুকু কেড়ে নেওয়া। কোনো বিকল্প বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করেই হঠাৎ এই উচ্ছেদকে অসহায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বর্ণনা করছেন নিজেদের ‘পেটে লাথি মারা’ হিসেবে। ফুটপাত নাগরিকের হাঁটার জন্য পরিষ্কার ঠিকই, কিন্তু সেই ফুটপাতে সাজানো স্বপ্নের দোকানগুলো এখন ভাঙা টিন আর কাঠের স্তূপ মাত্র। সৌন্দর্য ফেরাতে একদিকে যখন উচ্ছেদ অভিযানে নামা পুলিশ সদস্যদের তোড়জোড় আর ছোটাছুটি, অন্যদিকে তখন শত ক্ষুদ্র প্রাণের চাপা দীর্ঘশ্বাস।

রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করে চিরচেনা যানজট আর বিশৃঙ্খলা দূর করতে এদিন সকাল ১০টা থেকে ‘বিশেষ অভিযান’ শুরু করেছে ডিএমপি। ডিএমপির ট্রাফিক রমনা বিভাগের এই অভিযানে সহায়তা করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা।

মগবাজার মোড় থেকে বাংলামোটর পর্যন্ত ঘুরে দেখা যায়, ফুটপাতের ওপর গড়ে ওঠা দোকানগুলোর অস্থায়ী টিন, কাপড় ও কাঠের বেড়া গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। যারা আগে থেকে খবর পেয়েছিলেন, তারা কোনোমতে মালামাল সরিয়ে নিতে পারলেও অনেকেই পড়েন চরম বিপাকে। যার যে মালামাল রয়েছে তা নিয়ে যেতে দেখা যায়। অনেকে দোকানের ভেঙে ফেলা অংশ কুড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। কারও দোকানের মালামাল জব্দ করা হচ্ছে, তাৎক্ষণিক আর্থিক জরিমানাও গুণতে হচ্ছে আবার অনেককে।

ব্যবসায়ীদের আর্তনাদ ও পুনর্বাসনের দাবি

মগবাজারের মোড়ের অভিযান দেখে বাংলামোটর অংশের ফুটপাতের দোকানগুলো বন্ধ করে মালামাল সরিয়ে ফেলতে দেখা যায়। উচ্ছেদ হওয়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কণ্ঠে ছিল কেবলই হাহাকার। তারা বলছেন— শখ করে নয় বরং পরিবারের মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দিতেই তারা রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ফুটপাতে বসেন। উচ্ছেদ হওয়া এক ব্যবসায়ীর কণ্ঠে জীবিকার সবটুক হারানোর আর্তনাদ।

‘আমাদের উঠিয়ে দিলে রাস্তা পরিষ্কার হয় ঠিকই, কিন্তু আমরা খাব কী? বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না করে এভাবে দোকান ভেঙে দেওয়া মানে তো আমাদের পেটে লাথি মারা।’ তারা সরকারের কাছে উচ্ছেদের আগে বিকল্প কর্মসংস্থান বা জোর দাবি জানিয়েছেন পুনর্বাসনের।

আইনি ব্যবস্থা ও জরিমানা

অভিযান চলাকালে রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে রান্না করার চুলা রাখায় দিলু রোডের বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডারকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

‘সড়ক আইন ২০১৮-এর ৯১ ধারা অনুযায়ী এই জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া মগবাজার থেকে বাংলামোটর পর্যন্ত নিয়ম না মানায় ২৫টির মতো গাড়িকে ভিডিও মামলা দেওয়া হয়েছে’— জানালেন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইমরান আহমেদ।

ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের ডিসি রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, আগে থেকে সতর্ক করেই শুরু করা হয় এই উচ্ছেদ অভিযান।

‘আগেই গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে সচেতন করেছি। আজকে খুব সফটলি অভিযানটি পরিচালনা করছি। যারা ইচ্ছাকৃতভাবে আইন অমান্য করে চলাচলে ভোগান্তি সৃষ্টি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আইন অনুযায়ী জরিমানা ও মালামাল জব্দ করার বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে’—বলছিলেন ডিএমপির এই কর্মকর্তা।

‘দোকানের সীমানা পেরিয়ে যারা ফুটপাত বা মূল সড়কে রেস্টুরেন্টের কিচেন, গ্রিল-কাবাবের মেশিন বা ওয়ার্কশপের টায়ার রেখে জনপথ আগলে রেখেছেন, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না’— সাফ জানিয়ে দিলেন ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. আনিছুর রহমান।

রাজধানীর বিভিন্ন ব্যস্ত এলাকায় জনদুর্ভোগ কমাতে এই বিশেষ উচ্ছেদ অভিযান চলবে টানা পাঁচ দিন। একদিকে শহর সাজানোর তোড়জোড়, অন্যদিকে ছিন্নমূল ব্যবসায়ীদের জীবিকা বাঁচানোর লড়াই—এই দুই বৈপরীত্য নিয়েই এগোচ্ছে ডিএমপির এই বিশেষ কার্যক্রম।

    শেয়ার করুন: