দৃষ্টিজয়ী আইরিন-আয়েশাদের বইমেলা

অমর একুশে বইমেলায় বাংলা একাডেমি ক্যান্টিনের উল্টোদিকে একটি স্টলে বই বসে ব্রেইল পদ্ধতিতে বই পড়ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী আইরিন সুলতানা এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আয়েশা আক্তার।
তারা দুজনই অদম্য মেধাবী। দৃষ্টিহীন থেকে হয়েছেন দৃষ্টিজয়ী। আইরিন, আয়েশাদের কথা চিন্তা করেই প্রতিবছর বইমেলায় অংশ নেয় ‘স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনী’। এবারের মেলায় এই প্রকাশনী থেকে এসেছে ৬টি নতুন বই।
২০০৯ সালে এই প্রকাশনীটি প্রথম একটি ছড়ার বই ব্রেইল পদ্ধতিতে প্রকাশ করে। আর ২০১১ সাল থেকে নিয়মিতভাবে বইমেলায় অংশ নিচ্ছে স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনী।
যারা নানা কারণে চোখে দেখতে পান না তাদের বই পড়ার পরিসরকে আরও বিস্তৃত ও সহজ করার পরিকল্পনা নিয়ে ২০০৮ সালে যাত্রা শুরু করেছিল স্পর্শ ফাউন্ডেশন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আইরিন স্কুলে পড়ার সময় থেকেই বইমেলায় আসে এবং তার পছন্দের স্টল এটি। এবার স্টলটিতে যুক্ত হয়েছে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে।
অন্যদিকে ঢাকার রামপুরার মেয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। দুজন স্টলটিতে বই পড়ছেন, গল্প করছিলেন। কেউ এসে তাদের সম্পর্কে জানতে চাইলে দৃষ্টিহীনদের লড়াইয়ের গল্প শোনাচ্ছিলেন।
আইরিন জানালেন, ‘আমি স্কুলে পড়ার সময় থেকেই বইমেলায় এসে স্পর্শের এই স্টলে বই পড়েছি। এখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এবারই প্রথম বইমেলার স্টলে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছি।’
ব্রেইল পদ্ধতিতে এখন পর্যন্ত মোট ১৬৭টি বই প্রকাশ করেছে স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনী। সারা দেশের পাঁচ শতাধিক পাঠক এখান থেকে বই নিয়ে পড়েন— বলছিলেন আইরিন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় ২৪ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আয়েশা আক্তার জানালেন বই পড়ার অনুভূতি। ‘আমরা চোখে দেখি না। কিন্তু আমাদের মনের চোখ তো খোলা। আমাদের জন্য যদি ব্রেইল পদ্ধতির বই বাড়ানো হয়। তবে আমরাও বই পড়ার আনন্দ নিতে পারি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করেন কিভাবে? এমন প্রশ্নোত্তরে আইরিন জানালেন, ‘সহপাঠীদের কাছ থেকে শোনে শোনে কিংবা অডিও রেকর্ড করে, তা থেকে পরে আমরা পড়ি। আমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো হচ্ছে ব্রেইল পদ্ধতি। ভালো বইগুলো যদি প্রকাশনা সংস্থা থেকে ব্রেইল প্রকাশনা করা হয়। তবে আমরা পড়তে পারি।’
দৃষ্টিহীন না হয়েও দৃষ্টিজয়ীদের স্টলে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছেন ইডেন কলেজের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী জান্নাতুল নেছা ঊষা।
তিনি বলছিলেন, ‘২০২২ সাল থেকে আমি এই সংগঠনে যুক্ত হই। দৃষ্টিহীন যারা আছেন, তারা কিন্তু অনেকেই খুব মেধাবী। তারা একটু যত্ন পেলে অনেকে ভালো কিছু করতে পারে। তাদের নিয়ে সরকারের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে আরো কাজ করা উচিত।’
বৃহস্পতিবার ছিল বইমেলার ১৫তম দিন। মেলা চলে দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। তথ্যকেন্দ্রে এদিন নতুন বই জমা পড়েছে ৮২টি।
বিকাল ৩টায় বইমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় স্মরণ : মুস্তাফা জামান আব্বাসী শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে শারমিনী আব্বাসীর লিখিত প্রবন্ধ পাঠ করেন বাংলা একাডেমির কর্মকর্তা মোকারম হোসেন। আলোচনায় অংশ নেন আশরাফুজ্জামান বাবু। সভাপতিত্ব করেন ওয়াকিল আহমদ।
লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজের বই নিয়ে আলোচনা করেন আতাহার খান, ফজলুল হক তুহিন এবং জামশেদ ওয়াজেদ। বিকাল ৪টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন অগ্নিতা শিকদার মুগ্ধ।
এছাড়াও ছিল ড. খালেকুজ্জামান—এর পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘বাঁশরী’, গাজী আবদুল হাকিম—এর পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘অচিন পাখি’, মফিজুর রহমান লাল্টু—এর পরিচালনায় ‘বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’ এবং সেলিনা ফারজানা কেয়া—এর পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘বুলবুল ললিতকলা একাডেমী’—এর পরিবেশনা।
যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন সুব্রত সরকার (তবলা), ইফতেখার হোসেন সোহেল (কী—বোর্ড), গাজী আবদুল হাকিম (বাঁশি) এবং দীপঙ্কর রায় (অক্টোপ্যাড)।
শুক্রবার মেলা শুরু হবে সকাল ১১টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। মেলায় থাকবে শিশুপ্রহর। সকাল সাড়ে ১০টায় শিশু—কিশোর চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি ও সংগীত প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে প্রদান করা হবে পুরস্কার।
বিকাল ৩টায় বইমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে স্মরণ : বদরুদ্দীন উমর শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন ফিরোজ আহমেদ। আলোচনায় অংশ নেবেন সুমন রহমান। সভাপতিত্ব করবেন আনু মুহাম্মদ। বিকাল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

