নারী দিবস
মেধা না মমতা, কার পাল্লা ভারী হবে প্রাথমিকে

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে শিশুদের জন্য কী বেশি প্রয়োজন—মেধাবী শিক্ষক, নাকি নারীর সহজাত মমতা? দীর্ঘদিন ধরেই এ প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা রয়েছে শিক্ষাঙ্গনে। প্রায় তিন দশক ধরে চালু থাকা প্রাথমিক শিক্ষায় ৬০ শতাংশ নারী কোটা ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাতিল করা হয়। তবে নতুন শিক্ষামন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেই কোটা পুনরায় চালুর ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ফলে শিক্ষাঙ্গনে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে একটাই প্রশ্ন— প্রাথমিকে কোনটা বেশি প্রয়োজন, ‘মেধা না মমতা’। শেষ পর্যন্ত কার পাল্লাই ভারী হবে।
দেশে নারী শিক্ষার প্রসারে ৯০ দশককে অনেকেই স্বর্ণযুগ হিসেবে উল্লেখ করেন। ১৯৯১ সালে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষকের সংখ্যা বাড়াতে ‘সংরক্ষিত নারী কোটা’ চালু করেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল নারী শিক্ষার বিস্তার এবং নারীদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি। শুরুতে এই কোটা ছিল ২০ শতাংশ, যা পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ৬০ শতাংশ করা হয়।
এই নীতির প্রভাবে গত তিন দশকে প্রাথমিক শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় নারী শিক্ষকের উপস্থিতি বাড়ায় মেয়ে শিশুদের বিদ্যালয়ে আসার হারও বৃদ্ধি পায়। অনেকেই মনে করেন, শিশুদের প্রতি নারীর স্বাভাবিক মমতা এই ইতিবাচক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
২০১৯ সালের আগ পর্যন্ত নারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতায় কিছু শিথিলতা (এইচএসসি) এবং কোটার সুবিধা, এই দুইয়ের সমন্বয়ে প্রাথমিক শিক্ষায় নারী শিক্ষকদের অংশগ্রহণ দ্রুত বাড়ে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সালে নারী কোটা চালুর আগে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষকের মধ্যে নারী ছিলেন মাত্র ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। গ্রামাঞ্চলে এ হার ছিল আরও কম। কোটা চালুর পর ধীরে ধীরে নারী শিক্ষকের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ২০০০ সালের মধ্যে তা বেড়ে প্রায় ৩৫ শতাংশে পৌঁছায়। ২০০৫ সালে নারী শিক্ষকের হার হয় ৪৫ শতাংশ, ২০১০ সালে ৫৫ শতাংশ এবং ২০১৫ সালের মধ্যে তা ৬০ শতাংশে উন্নীত হয়।
বর্তমানে দেশে প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার প্রাথমিক শিক্ষকের মধ্যে নারী শিক্ষক রয়েছেন প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজারের বেশি, যা মোট শিক্ষকের প্রায় ৬৫ থেকে ৬৭ শতাংশ। অর্থাৎ কোটা চালুর আগে প্রতি ১০ জন শিক্ষকের মধ্যে যেখানে মাত্র দুইজন নারী ছিলেন, এখন সেখানে প্রায় ছয় থেকে সাতজনই নারী শিক্ষক। গত তিন দশকে প্রাথমিক শিক্ষায় নারী শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বেড়েছে।
ডিপিইর তথ্য অনুযায়ী, কোটাভিত্তিক সর্বশেষ দুটি নিয়োগ ২০১৮ ও ২০২০ সালে নারী শিক্ষকের হার ছিল যথাক্রমে ৭০ ও ৬২ শতাংশ। তবে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৫ সালের আগস্টে নতুন বিধিমালা জারি করা হয়। সেখানে নারী ও পোষ্য কোটা পুরোপুরি বাতিল করে ৭ শতাংশ বিশেষ কোটা রাখা হয়। নতুন বিধিমালার আওতায় সর্বশেষ নিয়োগটি হয়েছে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে, যদিও সেখানে কত শতাংশ নারী শিক্ষক নিয়োগ পেয়েছেন, তার তথ্য এখনো প্রকাশ হয়নি।
এরই মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের সাম্প্রতিক মন্তব্য বিষয়টিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বাতিল হওয়া ৬০ শতাংশ নারী কোটা পুনর্বহালের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে। শিশুদের মানসিক বিকাশ এবং প্রাথমিক স্তরে নারী শিক্ষকের মমতাপূর্ণ ভূমিকার কথা বিবেচনায় নিয়েই এ উদ্যোগের কথা ভাবা হচ্ছে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
তবে এই সম্ভাবনা সামনে আসতেই আবারও আলোচনায় এসেছে মেধাভিত্তিক নিয়োগের প্রশ্ন। যারা কোটা বাতিলের পর মেধার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তাদের অনেকেই এখন নতুন করে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মনে করেন, প্রাথমিক শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে কোটা একমাত্র সমাধান নয়।
তার মতে, ‘গত তিন দশকে নারী শিক্ষায় যে অগ্রগতি হয়েছে, তাতে নারীরা মেধার প্রতিযোগিতায় সমানভাবে সক্ষম। তবে গ্রামীণ নারী বা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুযোগ রাখা যেতে পারে। মমতার কথা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই মমতা যেন মেধার ঘাটতি পূরণের মাধ্যম না হয়। শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত যোগ্যতম শিক্ষক নির্বাচন করা—তিনি নারী হোন বা পুরুষ।’
অন্যদিকে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী মনে করেন, প্রাথমিক শিক্ষায় নারী শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা একসময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং এখনো তার প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে।
তিনি বলেন, নারী শিক্ষকরা শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তবে ২০২৪-পরবর্তী প্রজন্মের বড় দাবি হলো বৈষম্যহীন, মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা। তাই সরাসরি পুরোনো কোটা ফিরিয়ে আনার বদলে এমন একটি পদ্ধতি ভাবা দরকার, যেখানে মেধা ও জেন্ডার ভারসাম্য—দুটিরই সমন্বয় থাকবে।

