আগামীর সময়

আগাম টিকিট কেটেও অনিশ্চয়তায় যাত্রীরা

  • ঈদের ছুটিতে ঢাকা ছাড়ছেন এক কোটিরও বেশি মানুষ
  • বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় ঢুকবেন ২০ থেকে ২৫ লাখ
  • টাঙাতে হবে ভাড়ার চার্ট, লক্কড়-ঝক্কড় বাস নামালেই ব্যবস্থা
  • জনস্রোত সামালে গার্মেন্টেসে ধাপে ধাপে ছুটির অনুরোধ
  • মাঠে পুলিশ, ডিবি-সোয়াট, ডগ স্কোয়াড ও অশ্বারোহী ইউনিট
আগাম টিকিট কেটেও অনিশ্চয়তায় যাত্রীরা

সংগৃহীত ছবি

ঈদযাত্রায় বাস কাউন্টারগুলোয় টাঙিয়ে রাখতে হবে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চার্ট। লক্কর-ঝক্কর বাস যেন রাস্তায় না নামে, সেজন্য থাকবে মোবাইল কোর্ট (ভ্রাম্যমাণ আদালত)। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ঠেকাতে মাঠে থাকবেন ম্যাজিস্ট্রেটরা। ঈদের আগে-পরে মাঠে থাকবেন পুলিশ, ডিবি-সোয়াট, ডগ স্কোয়াড ও অশ্বারোহী ইউনিটের বিপুল সংখ্যক সদস্য। ঘরমুখো মানুষের এবারের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন, নিরাপদ ও স্বস্তির করতে এমন নানা পদক্ষেপের তথ্য তুলে ধরলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ সরওয়ার। শনিবার রাজধানীর গাবতলীতে গণপরিবহন চালক ও শ্রমিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে কথা বলছিলেন তিনি।

অবশ্য রাজধানীর পুলিশপ্রধান যাত্রী হয়রানি কমাতে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের প্রতি কঠোর বার্তা দিলেও মাঠের চিত্র ভিন্ন। বাড়তি ভাড়া আদায়, লক্কর-ঝক্কর বাস, যাত্রী হয়রানি, যত্রতত্র যাত্রী উঠানো-নামানো, ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট, কাউন্টারে সময়মতো বাস না আসা, পকেটমার ও অজ্ঞান পার্টির দৌরাত্ব্য প্রতিবারের ঈদযাত্রায় চিরচেনা এক চিত্র। সরকারের নির্দেশনায় বাস কাউন্টারগুলোয় ভাড়ার চার্ট টাঙানো হলেও তা শুধুই লোক-দেখানো।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের জেরে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বিঘ্নের শঙ্কার মধ্যেই ঈদযাত্রায় বাড়তি ভাড়া আদায়ের কৌশল হিসেবে টিকেট বিক্রি বন্ধ রাখার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। ঈদযাত্রায় মূল চাপ শুরুর আগেই দূরপাল্লার বাস, লঞ্চ ও গণপরিবহনে মালিক-চালকরা অস্বাভাবিকহারে বাড়তি ভাড়া আদায় করছেন। অসাধু সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট তৈরি করে যাত্রীদের পকেট কাটছে, যদিও সরকার জানিয়েছে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং বাড়তি ভাড়া নিলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বরিশালসহ বিভিন্ন জেলায় তেল সংকটের দোহাই দিয়ে বাস ও লঞ্চে দ্বিগুণ বা তার বেশি ভাড়া আদায়ের তথ্য মিলেছে। এমন প্রেক্ষাপটে আগামী কয়েক দিন ঘরমুখো মানুষদের ভোগান্তি আরও চরমে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।

যদিও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় দেশে তেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকার কথা জানিয়েছে। যাত্রীদের অভিযোগ, আগ্রিম টিকেট বিক্রি বন্ধ মূলত শেষ মুহূর্তে অতিরিক্ত মুনাফা লোটার পরিকল্পিত ফাঁদ। যাতে ঈদযাত্রার আনন্দ কিছুটা ফিকে হয়ে যেতে পারে।

রাজধানীর গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা যায়, পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দূরপাল্লার কিছু বাসে টিকিটের দাম বাড়িয়ে রাখা হচ্ছে। গাবতলী বাস টার্মিনালের পাশের একটি কাউন্টারে গিয়ে ঢাকা-রংপুর রুটে নন-এসি বাসের প্রতিটি টিকিটের জন্য ১২৫০ টাকা করে নিতে দেখা যায়। যদিও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এই রুটের ভাড়া নির্ধারণ করেছে ৮৭০ টাকা।

অন্যদিকে দূরপাল্লার যাত্রায় অগ্রিম টিকিট কাটা যাত্রীরাও পড়েছেন অনিশ্চয়তায়। বাস কাউন্টারগুলো থেকে যাত্রীদের সতর্ক করে বলা হচ্ছে, জ্বালানি সংকট দেখা দিলে নির্ধারিত দিনে বাস চলাচল না-ও করতে পারে। সে ক্ষেত্রে টিকিট বাতিল করে অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। তাই আগাম টিকিট কেটেও নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না অনেক যাত্রী।

ঈদ ঘিরে লক্কড়-ঝক্কড় বাস রাস্তায় নামানো নিষিদ্ধ করার তথ্য জানান ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সারওয়ার। ‘লক্কড়-ঝক্কড় বাস রাস্তায় নামালেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

‘সড়কে যানজটের অন্যতম কারণ ফিটনেসবিহীন লক্কড়-ঝক্কড় বাস। এসব বাস হাইওয়েতে বিকল হলে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এসব বাস যাতে রাস্তায় নামতে না পারে, সে জন্য বিআরটিএ ও ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে। গতবারের মতো এবারও লক্কড়-ঝক্কড় বাস মেরামতের জায়গাগুলোয় নজরদারি চালানো হবে’, বলছিলেন ডিএমপি কমিশনার।

ফিটনেসবিহীন যান চলাচল ঠেকাতে পুলিশ কর্তারা কড়া বার্তা দিলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন নেই। ঈদ সামনে রেখে ঢাকা ও এর আশেপাশে ফিটনেসবিহীন লক্কর-ঝক্কর বাস চলাচল অব্যাহত রয়েছে। ভাঙাচোরা এসব বাস রাস্তায় নষ্ট হয়ে যানজট সৃষ্টি করছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। অনেক বাস রঙ করে নামানো হয়েছে রাস্তায়। ডিএমপি কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে এই অনিয়ম বন্ধ করা কঠিন।

বাসের ছাদে যাত্রী নেওয়া, অতিরিক্ত গতি এবং অসুস্থ চালক দিয়ে গাড়ি চালানো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করার কথাও উল্লেখ করেছেন পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা সারওয়ার। ‘যাত্রীদের সুবিধার জন্য বাস টার্মিনালে হেল্প ডেস্ক চালু রাখা হবে এবং সেখানে বাসের ভাড়া তালিকা ও সময়সূচি টাঙিয়ে রাখতে হবে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, টিকিট কালোবাজারি বা যাত্রী হয়রানির অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ঈদযাত্রা সহজ করতে ১৮ মার্চ অতিরিক্ত ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। এতে যাত্রীদের চাপ কয়েক দিনে ভাগ হয়ে যাবে। ডিএমপি কমিশনার মনে করছেন, ১৬ থেকে ২০ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ লাখ মানুষ ঢাকা ছাড়তে পারবে, যা পরিবহন ব্যবস্থাপনার জন্য সুবিধাজনক হবে।

‘ঈদের ছুটিতে এক কোটিরও বেশি মানুষ ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় যাবেন, অন্যদিকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করবেন। এই বিপুল যাত্রীর চাপ সামাল দিতে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে’, যোগ করেন তিনি।

অন্যদিকে বিপুল জনস্রোত সামাল দিতে তৈরি পোশাক খাতের মালিকদের ধাপে ধাপে ছুটি দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। ১৬ থেকে ২০ মার্চের মধ্যে প্রতিদিন ২০ শতাংশ হারে শ্রমিকদের ছুটি দিলে পরিবহন সংকট ও যানজট নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে মনে করছে ডিএমপি।

‘ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে ঈদের আগে ও পরে মহাসড়কে ট্রাক, লরি ও কাভার্ড ভ্যান চলাচল সীমিত রাখা হবে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে অপ্রয়োজনীয় পণ্যবাহী ট্রাক মহাসড়কে না নামানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক করতে পুলিশ, পরিবহন মালিক-শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। যাত্রীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যাত্রা নিশ্চিত করাই সবার প্রধান লক্ষ্য’, আশ্বস্ত করছিলেন মো. সারওয়ার।

ঈদযাত্রা ঘিরে বাস টার্মিনালসহ নগরজুড়ে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), বিশেষায়িত ইউনিট সোয়াত, অশ্বারোহী ইউনিট ও ট্রাফিক পুলিশের বিপুল সংখ্যক সদস্য মোতায়েন থাকবে। চলাচল বন্ধ রাখা হবে ট্রাক-লরির। কোনো অবস্থাতেই যাত্রীদের হয়রানি করা যাবে না বলে সতর্ক করে ডিএমপি।

‘একজন চালক দিয়ে দীর্ঘক্ষণ গাড়ি চালাবেন না। এতে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা থাকে। এক বাসে এক গাড়িতে একাধিক চালক দেবেন’, মালিক সমিতির প্রতি এমনই আহ্বান ডিএমপি কমিশনারের।

এ সময় ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান জানান, বিআরটিএ চার্টে উল্লেখিত ভাড়ার চেয়ে বেশি নিলে সেই যানের রুট পারমিট বাতিল করা হবে।

সমন্বয় সভায় বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধি, পুলিশের বিভিন্ন বিশেষায়িত ইউনিটের প্রতিনিধি, নৌপরিবহন অধিদপ্তর, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন ফেডারেশন, বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতি, বাংলাদেশ ট্রাক চালক শ্রমিক ফেডারেশন, বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন, লঞ্চ শ্রমিক সমিতি, বিকেএমইএ, বিজিএমইএ, জিএমপি, বিআইডব্লিউটিএ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, বাস মালিক সমিতি, লঞ্চ মালিক সমিতি, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল সংস্থা ও সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন সেবাদানকারী সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

একই অনুষ্ঠানে বাস মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সমন্বয়ক শ্রমিক নেতা অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস মন্তব্য করেন, যাত্রী ভোগান্তি কমাতে বাস মালিক-শ্রমিকসহ সবাই একসঙ্গে কাজ করছেন।

    শেয়ার করুন: