বিশ্বব্যাংকের ঋণে বায়বীয় প্রকল্পে ‘না’, বাঁচল ৯৪৮ কোটি

ছবিঃ আগামীর সময়
বিশ্বব্যাংকের ঋণে বাস্তবায়নের কথা ছিল একটি বায়বীয় প্রকল্প। তবে সেটি বাতিল করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এর ফলে অপচয় থেকে রক্ষা পেয়েছে প্রায় ৯৪৮ কোটি টাকা।
‘বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রজেক্ট ফেজ-১: কম্পোনেন্ট-১: স্ট্রেংদেনিং এয়ার কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট’ প্রকল্পটি গত ২৫ জানুয়ারি উপস্থাপন করা হয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায়। ব্যাপক সমালোচনার মুখে এটি অনুমোদন দেওয়া হয়নি। পরে বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশন থেকে প্রকল্পটি ফেরত পাঠানো হয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে।
‘প্রকল্পটি ফেরত পাঠানোর সময় বাতিল কথাটি লেখা হয়নি, মন্ত্রীর সম্মানের কারণে। কিন্তু কার্যত এটি বাতিল। এমন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংকের ঋণটি আর নেওয়া হবে না। তবে অন্য কোনো প্রকল্প হলে সেটি আলাদা কথা’, বুধবার আগামীর সময়কে বলছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, একনেক বৈঠকে প্রকল্পটির অনেকগুলো প্রস্তাবিত কম্পোনেন্ট নিয়ে ব্যাপক আপত্তি ওঠে।
সূত্র জানায়, প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয় ৯৪৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ৪ কোটি ৮৬ লাখ এবং বিশ্বব্যাংকের ঋণ থেকে ৯৪৪ কোটি টাকা ব্যয় করার কথা ছিল। অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে শুরু করে ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করত পরিবেশ অধিদপ্তর।
প্রকল্পটির বিষয়ে সাবেক পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ এর আগে বলেছিলেন, ‘এটি একটি অহেতুক প্রকল্প। এর মাধ্যমে যে কাজ হবে সেগুলো জনগুরুত্বপূর্ণ নয়। বিশ্বব্যাংক এমন প্রকল্পে ঋণ দিতে সম্মত হয়েছে সেটিই বড় প্রশ্ন। যে কেউ ঋণ দিলেই যে নিতে হবে তার কোনো মানে নেই। ঋণের টাকা সুদসহ পরিশোধ করতে হয়। এমন অগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে সেই টাকা ব্যবহারে কোনো সুফল মিলবে না। আমরা এটি অনুমোদন দেইনি।’
প্রকল্পটির উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছিল, পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিবীক্ষণ ও এনফোর্সমেন্ট সক্ষমতা বাড়ানো, তথ্য প্রমাণ-ভিত্তিক পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা দেওয়া এবং বায়ুমান ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে জনসাধারণের অংশগ্রহণ উৎসাহিত করা। এছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রসহ বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের কালো ধোঁয়ার নিঃসরণ কমানো।
প্রকল্পটি প্রস্তাব করার যৌক্তিকতা সম্পর্কে পরিবেশ, বন ও জলবায়ূ পরিবর্তন মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়, বাতাসে সূক্ষ্ম বস্তুকণা শ্বাসযন্ত্রের মাধ্যমে ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করে মানবদেহে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। বিশ্বের সবচেয়ে বায়ূ দূষিত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ঝুঁকির কারণগুলোর মধ্যে ৩য় সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে বায়ু দূষণ।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পরিবেশগত এবং গৃহস্থালির বায়ু দূষণের কারণে ২০১৯ সালে বাংলাদেশে ১ লাখ ৫৯ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া বায়ু দূষণের ফলে অকালে প্রসবকৃত এবং কম ওজনের শিশু জন্মের হারও বাড়ছে। পরিবেশগত নীতির সীমাবদ্ধতা এবং দুর্বল প্রয়োগের কারণে বাংলাদেশের বায়ুমান ব্যবস্থাপনা জরুরি। এ জন্য প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে।
‘শুধুমাত্র পরিবেশ নিয়ে এ ধরনের বায়বীয় প্রকল্প নেওয়া একেবারেই উচিত নয়। মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম বাস্তবায়ন মনিটরিং করাটা কঠিন। এ ধরনের প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতির সুযোগ থাকে। বিশ্বব্যাংকের ঋণ আমাদের দরকার। তাই বলে এমন প্রকল্পে নিতে হবে তা ঠিক নয়। বরং কোনো কারিগরি সহায়তা বা এমন প্রকল্পে নিতে হবে যেগুলো থেকে প্রকৃত আউটকাম আসে’, ব্যাখ্যা করছিলেন বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সাবেক সচিব আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন।
প্রকল্পের আওতায় প্রধান কার্যক্রম সম্পর্কে বলা হয়, বায়ূ দূষণ আইন ও বিধিমালা সংস্কার, ন্যাশনাল এয়ার কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান (২০৩১-২০৩৫) তৈরি, পরিবেশগত রাজস্ব সরঞ্জামের ডিজাইন প্রণয়ন, বিদ্যমান ৩৪টি কন্টিনিউয়াস এয়ার মনিটরিং সিস্টেম উন্নয়ন করা হবে। এছাড়া বায়ুর গুণগত মান বিশ্লেষণে পরিবেশ অধিদপ্তরের বিদ্যমান গবেষণাগার আধুনিক করা, সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের ব্যবস্থা নেওয়া, বায়ুমান পূর্বাভাস সিস্টেম স্থাপন; বায়ু দূষণ রোধে উৎস ভিত্তিক দূষণ বিশ্লেষণ ও দূষণ রোধে কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া। পাশাপাশি পলিসি, তথ্য ব্যবস্থাপনা ও গবেষণাগারের বিশ্লেষণ ক্ষমতা বাড়ানোসহ কন্টিনিউয়াস এমিশন মনিটরিং প্রোগ্রাম (সিইএমপি) প্রতিষ্ঠার কথা ছিল।
আরও যেসব কার্যক্রমের উল্লেখ ছিল তা হলো কমপক্ষে ৪০টি বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান ও বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে রিয়েল-টাইম ইমিশন মনিটরিং ডিভাইস স্থাপন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় মনিটরিং নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত করা; আইন প্রয়োগের মাধ্যমে বার্ষিক ১৮৩৬ মেট্রিক টন কার্বন নিঃসরণ কমানোর পদক্ষেপ নেওয়া। বায়ূ দূষণ ও এর স্বাস্থ্য বা পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এয়ার কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট কমিউনিকেশন অ্যান্ড এ্যাওয়ারনেস প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন।

