বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এখন শোকেস
- অলস সময় পার করছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা
- মৌখিক নির্দেশে কেউ কেউ ফিরেছেন আগের পদে
- ১৫ বিচার বিভাগীয় কর্তা যাবেন বিচারিক কাজে

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
গণঅভ্যুত্থানের পর জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। প্রতিষ্ঠা হয় সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে এ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ অনুমোদনের পরের মাসে পৃথক দপ্তর উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ। নতুন সরকার মসনদে বসার দুই মাসও টেকেনি তা। অধ্যাদেশটি বাতিল করায় বেকার হয়েছে সেই সচিবালয়।
বিশ্বে সবচেয়ে কম অপরাধ হয় আইসল্যান্ডে। এই দ্বীপরাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অন্যতম অবদান স্বাধীন বিচার বিভাগের। সেখানে বিচারক নিয়োগ দেয় সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি কমিটি। পাঁচ সদস্যের এই কমিটিতে পার্লামেন্টের প্রতিনিধি থাকে মাত্র একজন, যা এ বিভাগকে নিয়েছে শাসকদের হস্তক্ষেপের ঊর্ধ্বে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে নিয়োগ দেয় কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী। এর মধ্যে একজন সচিব, ১৫ বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা ও ১৯ কর্মী উল্লেখযোগ্য। কিন্তু অধ্যাদেশটি বাতিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বেকার হয়ে যান এসব স্টাফ।
সাধারণত পৃথক সচিবালয়ের মূল কাজের আওতায় ছিল নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, ছুটি ও শৃঙ্খলাজনিত বিষয়গুলো। দীর্ঘ সময় ধরে এসব কাজ করছে আইন মন্ত্রণালয়। গত ডিসেম্বরে পৃথক সচিবালয় হলেও পর্যাপ্ত জনবল ও অবকাঠামো না থাকায় তা চালুও হয়নি পূর্ণাঙ্গরূপে। নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, ছুটি ও শৃঙ্খলাজনিত বিষয়গুলো ধীরে ধীরে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের আওতায় আসার কথা থাকলেও তা রয়ে গেল আগের দপ্তরেই।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য বিচারক নিয়োগ ও স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠায় জারী করা অধ্যাদেশ দুটি গত ৯ এপ্রিল বাতিল করেছে জাতীয় সংসদ। এগুলো বাতিলের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েও ঠেকাতে পারে বিরোধী দল। তাদের সেই আপত্তি নাকচ করে সংসদে পাস হয় ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল’ এবং ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল’। বিলটি রাষ্ট্রপতি সই করলে পরিণত হবে আইনে। আসবে সরকারের নতুন গেজেট।
অধ্যাদেশ দুটি বাতিল করতে আনা বিল পাসের বিরোধিতা করে বিরোধী দল বলেছিল, সরকারের এই উদ্যোগ বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ। আবার নিম্ন আদালতকে ব্যবহারের চেষ্টা করা হচ্ছে ফ্যাসিবাদী কায়দায়। এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার চরম লঙ্ঘন।
গণমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি না থাকায় নাম না বলে সচিবালয়ের এক কর্মকর্তা জানালেন, পদায়ন করা ১৯ স্টাফ মূলত এসেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ থেকে। ইতোমধ্যে হাইকোর্টের বিভিন্ন শাখায় কাজ শুরু করতে মৌখিকভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাদের।
একই কারণে নাম না জানিয়ে এখনো পৃথক সচিবালয়ে দায়িত্ব পালনের তথ্য দিলেন সচিবালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। আগামীর সময়কে বললেন, অধ্যাদেশ রহিত হওয়ায় এখন আর কোনো অর্থ বহন করে না পৃথক সচিবালয়। এর কার্যক্রম চলমান থাকবে কি না, তা চূড়ান্ত হতে পারে এক সপ্তাহের মধ্যে।
পৃথক সচিবালয়ের প্রশাসনিক কাজে যেসব কর্মকর্তাকে পদায়ন করা হয়েছিল, তারা হয়তো আবার ফিরে যাবেন বিচারিক কাজে। তবে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে প্রজ্ঞাপন জারির পর— ব্যাখ্যা করলেন সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী।
‘সরকার বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। অধিকতর যাচাই-বাছাই করে পরে প্রণয়ন হবে এ-সংক্রান্ত আইন’— সাফাই গাইলেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
এদিকে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) আইন চ্যালেঞ্জ করে রিট হয়েছে একটি। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রম চলমান রাখতে চাওয়া হয়েছে নির্দেশনা। ২০ এপ্রিল এটি দায়ের করেন মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেনসহ সাত আইনজীবী। শুনানি হতে পারে বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে।



