গণভোট ও রাষ্ট্রপতি অভিশংসন: টানাপোড়েন প্রথম অধিবেশনেই

ছবিঃ আগামীর সময়
রাজনৈতিক পর্বান্তরের পর ভোট, সরকার গঠন সবই হয়েছে। অনিশ্চয়তার অন্ধকার কাটিয়ে সরকার এগোচ্ছে টুকটুক করে। এখন বোঝাপড়া সংসদ আর অধিবেশন নিয়ে। প্রথম অধিবেশন শুধু গণভোটের মতো একমাত্রিক ইস্যুতে নয়; উত্তপ্ত হয়ে উঠবে রাষ্ট্রপতির অভিশংসন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ ও অধ্যাদেশ অনুমোদনের মতো বহুমাত্রিক বিষয়ে। এমনই আভাস পাওয়া গেছে সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক দলগুলোর দিক থেকে।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের অভিশংসন প্রস্তাব উত্থাপনে ইতিবাচক জানিয়েছেন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যর সঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব। ‘জোটের সব দল এই প্রস্তাব উত্থাপনে ইতিবাচক থাকবে বলে আমরা মনে করি।’
রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসিত করা যায় সংবিধানের ৫২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী। তিনি যদি সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণ করেন। সংখ্যাগরিষ্ঠদের স্বাক্ষরে প্রস্তাব স্পিকারের কাছে যাবে। এর ১৪ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে তা উঠবে আলোচনায়। দুই-তৃতীয়াংশে প্রস্তাব পাশ হলে ঐ তারিখ থেকেই রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হবে।
কোনো রাষ্ট্রপতির অভিশংসিত হওয়ার নজির নেই দেশে। সব সময় সংখ্যাগরিষ্ঠ দল থেকেই নির্বাচিত হয়েছেন। ২০০১ সালে বিএনপির মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি হন এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। বনিবনা না হওয়ায় ২০০২ সালে তাকে অপসারণের উদ্যোগ নেয় দলটি। অভিশংসন প্রস্তুতির মধ্যেই ওই বছরের ২১ জুন রাষ্ট্রপতির পদ থেকে নিজেই ইস্তফা দেন।
জামায়াতসহ ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগের নিয়োগ দেওয়া রাষ্ট্রপতি কোনোভাবেই আর থাকতে পারেন না। তার অধীনে থাকা দেশের জন্যও এই মুহূর্তে নিরাপদ নয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে দাবি উঠলেও সাংবিধানিক দোহাই দিয়ে অভিশংসিত করা যায়নি। ভোট আর সরকার গঠনের চক্রপূরণে সেই বাধা আর নেই। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে প্রথম অধিবেশনেই এই প্রস্তাব আনা হবে। অবশ্য সরকারি দল তাতে সম্মতি না দিলে কার্যকর করা যাবে না। যদিও বিরোধী দলগুলোর প্রত্যাশা, জনগণের বৃহত্তর স্বার্থকেই প্রাধান্য দেবে বিএনপি ।
সংসদের বাইরেও বিষয়টি নিয়ে মাঠ গরম করবে দলগুলো। এরইমধ্যে প্রথম অধিবেশনেই রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন এনসিপি আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি শহীদ সেনা দিবসে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা জানিয়েছিলেন। তার চাওয়া ‘রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করে তাকে দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করা নতুন সরকারের দায়িত্ব। রাষ্ট্রপতি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছেন, নেতিবাচক কথা-বার্তা বলেছেন। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেও। কাজেই ফ্যাসিস্ট সময়ের চিহ্ন যে রাষ্ট্রপতি, তাকে দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করা প্রয়োজন। সংবাদ মাধ্যমে বক্তেব্যেও তার শপথ লঙ্ঘন হয়েছে। ফলে কোনোভাবেই এ রাষ্ট্রপতি আর এই দায়িত্বে থাকার যোগ্য নন।’
এনসিপি আহ্বায়ক বলছিলেন, ‘সংসদের যে প্রথম অধিবেশন হবে, তার প্রথম কাজটি হবে এই ফ্যাসিস্ট সময়ের রাষ্ট্রপতির অভিশংসনের পদক্ষেপ নেওয়া। নতুন সংসদের সরকারি দল বিরোধী দল মিলে কাজটি করবে বলে আমরা মনে করি। কারণ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আমাদের জাতীয় ঐক্য রয়েছে।’
জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা জানালেন, ‘এ নিয়ে আলাপ আলোচনা হচ্ছে। ১১ দলীয় জোটের সঙ্গেও আলোচনা চলছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। তবে আমাদের পক্ষ থেকে জুলাই সনদে এক চুল পরিমাণ ছাড় দেওয়া হবে না।’
নাম প্রকাশে না করার শর্তে ১১ দলীয় ঐক্যের এক সংসদ সদস্য এ ইস্যুতে রয়েছেন আরও কঠোর অবস্থানে। ‘প্রথম অধিবেশনেই আমরা রাষ্ট্রপতির অভিশংসন ও গণভোট নিয়ে কথা বলব। কেন সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ সরকার দলীয় সদস্যরা নেননি এবং কেন এই পরিষদ গঠন হয়নি তা নিয়ে আমরা প্রশ্ন তুলব। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে মানুষ গণভোটে হ্যাঁ ভোট দিয়েছে। বিএনপি সরকার এটি বাস্তবায়নে কোনো প্রকার দ্বিধা করলে আমরা সংসদেই এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলব।’
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতির অভিশংসন ইস্যুতে দেশের স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণকে প্রাধান্য দিয়েই সিদ্ধান্ত নেবে তার দল।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আগামী ১২ মার্চ আহ্বান করেছেন রাষ্ট্রপতি। সরকার ও দলগুলো ইতোমধ্যেই সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে বলে জানা গেছে।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সংসদ সদস্যরা শপথ নেন। সেদিন প্রথমে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়া বিএনপির নির্বাচিতরা শপথ নেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন। তবে তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।
অন্যদিকে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেন জামায়াতে ইসলামী ও ১১ দলীয় ঐক্যেও নির্বাচিতরা। ওইদিনই জুলাই সনদ ও গণভোট নিয়ে দেশের রাজনীতিতে তৈরি হয় উত্তাপ। পরবর্তীতে তা গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত।
সংসদ সদস্যদের শপথের বিষয়ে বলা থাকলেও সংবিধানে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ নিয়ে কিছু বলা নেই। সংবিধানে না থাকলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা বলা হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদে। সনদটি বাস্তবায়নে গত বছরের ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি একটি আদেশও জারি করেন। সেখানে বলা হয়েছে— সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার ৩০ দিবসের মধ্যে যে পদ্ধতিতে সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হবে, একই পদ্ধতিতে পরিষদের প্রথম সভা আহ্বান করা হবে। সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে পরিষদের সদস্যরা সভাপ্রধান ও উপ-সভাপ্রধান নির্বাচন করবেন।
আরও বলা হয়েছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্য দিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে এবং তা সম্পন্ন করবার পর পরিষদের কার্যক্রম সমাপ্ত হবে।
আইনিভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ থেকে বিরত থাকে বিএনপি। একইসঙ্গে এই পরিষদ গঠন নিয়েও ইতিবাচক বার্তা তাদের থেকে পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল থেকে এ নিয়ে প্রতিবাদ ও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে যাচ্ছে। সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়াকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে প্রতারণা বলেও মন্তব্য করেছেন তারা।
এরইমধ্যে সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী গাজী মো. মাহবুব আলম ও চৌধুরী মো. রেদওয়ান ই খোদা দুটি রিট করেন। যাতে গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংশোধন) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-কে কেন অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে রুল জারির আরজি জানানো হয়। একই সঙ্গে এই অধ্যাদেশ ও সনদের কোনো কার্যক্রম যাতে কার্যকর না হয়, সে বিষয়ে নিষেধাজ্ঞাও চাওয়া হয়।
রিটে বলা হয়েছে— সংবিধানে গণভোট এবং জুলাই জাতীয় সনদের কোনো বিধান নেই।
এই রিটের শুনানিতে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বুধবার জুলাই সনদ, গণভোটের অধ্যাদেশ এবং নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার বৈধতা নিয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। এর ফলে গণভোট, জুলাই সনদের কার্যকারিতা এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন হুমকির মুখে পড়েছে। যার প্রতিবাদ জানিয়েছে জামায়াত ও এনসিপি।
গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ ও জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ বাতিল চেয়ে উচ্চ আদালতে যে রিট হয়েছে, তার সঙ্গে বিএনপির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। বেশ ক্ষোভ ঝাড়েন তিনি। ‘বিএনপি ষড়যন্ত্রমূলকভাবে জুলাই সনদকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য ও সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতা করতে আদালতে গিয়েছে। তারা এক ধরনের ডুয়েল গেম খেলছে।’
গণভোটে ‘হ্যাঁ’- এর পক্ষে বেশি ভোট পড়ায় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বর্তমান সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক বলে দাবি এনসিপি মুখপাত্রের। ‘মাননীয় আদালতে একে চ্যালেঞ্জ করার মধ্য দিয়ে বিএনপি নিজের সরকারকেই চ্যালেঞ্জ করল বলে আমরা মনে করছি। কারণ এই একই সনদের ভিত্তিতেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।’
এ ক্ষেত্রে এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব সালেহ উদ্দিন সিফাত আরেক ধাপ এগিয়ে। ‘রাজনৈতিক প্রশ্ন ডিল করা আদালতের দায়িত্ব না। গণআকাঙ্খাকে আদালত ক্লারিফাই করার অধিকার রাখে না। জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তি গণঅভ্যুত্থান। গণঅভ্যুত্থান নিজেই বৈধতা। গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লবের আদালত থেকে বৈধতা নেওয়ার কিছু নাই। জুলাই জাতীয় সনদ যদি অবৈধ বা অসাংবিধানিক হয়, তবে জাতীয় নির্বাচনও ‘অবৈধ’ ও ‘অসাংবিধানিক’। ৫ই আগস্টের পর সব ধরনের আইনী-রাজনৈতিক উদ্যোগই অবৈধ ও অসাংবিধানিক। সুতরাং, খুনি লীগ আর জাতীয় পার্টি ছাড়া সব রাজনৈতিক দলই অবৈধ ও অসাংবিধানিক কাজে সমর্থন দিয়েছে। এভাবে লিস্ট করতে গেলে বহুত লম্বা হয়ে যাবে। এ কারণেই আমরা এই তথাকথিত সাংবিধানিক ধারাবাহিকতাকে বারবার নাকচ করেছি এবং সামনেও করব।’
তবে ভিন্ন মত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের। ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসবে ১২ মার্চ। সেখানে সংসদ সদস্য হিসেবে আমরা যারা শপথ গ্রহণ করেছি, তারা সংসদ সদস্য হিসেবে যোগদান করব। এর বাইরে সংবিধান সংস্কার পরিষদ নামে কিছু না থাকায় যারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছেন, সেটি তাদের নিজস্ব ব্যাপার; কিন্তু জাতীয় সংসদে সেই হিসেবে তারা অংশগ্রহণ করতে পারেন না। শুধু সংসদ সদস্যরাই অংশগ্রহণ করতে পারেন।’
যদিও এই বিএনপি নেতার মন্তব্যের বিরোধিতা করলেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের গণভোটে স্বীকৃতি মিলেছে। গণভোটের মাধ্যমে জনগণের রায় সংবিধানের চেয়ে কম নয়। আমি মনে করি, আরও বেশি।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিকের মত আরেক রকমের। ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ না নিয়ে বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান-পরিপন্থি কোনো কাজ করেননি। যেহেতু সংবিধানে এখন নেই, তাই শপথ নেওয়ার প্রশ্ন আসে না।’
এসব বিতর্কের সমাপ্তিরেখা কোথায় গিয়ে শেষ হবে তার ধারণা সংসদ অধিবেশন শুরুর আগেই মিলছে না বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম। ‘বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে সংকট তৈরি হয়েছে। আর এ সংকট কতটা ঘনীভূত হবে, সংসদ অধিবেশন শুরুর পরই তা বোঝা যাবে।’

