ভেস্তে যাচ্ছে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধ, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ানো ও শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চালু হওয়া স্কুল ফিডিং কর্মসূচি ভেস্তে যাচ্ছে। এ কর্মসূচি চালু হলেও কমছে প্রাথমিকের শিক্ষার্থী সংখ্যা। অথচ শিক্ষার্থী বাড়ছে কেজি, ইবতেদায়ি মাদ্রাসা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে।
স্কুল ফিডিং কর্মসূচির কারণে অনেক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর পড়েছে বাড়তি দায়িত্ব। পাঠদানের ফাঁকে শিক্ষার্থীদের খাবার গুনে বুঝে নেওয়া, রেজিস্টারে লেখা এবং হাতে হাতে তা বিতরণ করতে গিয়ে ব্যাহত হচ্ছে শ্রেণিপাঠ। আর এতে সৃষ্টি হচ্ছে শিখন ঘাটতি।
তবে শিক্ষকরা বলছেন, এ সমস্যার সহজ সমাধান হতে পারে যদি প্রশাসনিক তদারকি বাড়িয়ে পুরো বিতরণপ্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ঠিকাদারের মাধ্যমে করা হয় সম্পন্ন।
প্রশিক্ষিত শিক্ষক, সরকারি নানা সুবিধা, স্কুল ফিডিং, উপবৃত্তি, বিনামূল্যে শিক্ষার সুবিধা থাকার পরও প্রতি বছর কমছে লাখ লাখ শিক্ষার্থী। অন্যদিকে অনেক শিক্ষার্থী চলে যাচ্ছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই) সূত্রে জানা গেছে, পুষ্টিহীনতা ও ক্ষুধা প্রাথমিক শিক্ষার অন্যতম বড় বাধা— এ বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘মিড-ডে মিল’ বা স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালু করা হয় গত বছরের সেপ্টেম্বরে। এ কর্মসূচির আওতায় খাবার দেওয়া হচ্ছে দেশের ১৫০ উপজেলার ১৯ হাজার ৪১৯টি বিদ্যালয়ের প্রায় ৩০ লাখ শিক্ষার্থীকে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফিডিং কর্মসূচি নামে তিন বছরের প্রকল্পটিতে প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা।
মাঠপর্যায়ের একাধিক শিক্ষক ও প্রশাসনিক সূত্র জানায়, ঠিকাদারের প্রতিনিধি নির্দিষ্ট দিনে বিদ্যালয়ে খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ করেন। সেগুলো বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা গ্রহণ করে রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করেন এবং নির্ধারিত সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তা বিতরণ করেন হাতে হাতে। শত শত শিক্ষার্থীর জন্য প্রতিদিন খাদ্যসামগ্রী গ্রহণ, মান যাচাই, উৎপাদনের তারিখ পরীক্ষা এবং বিতরণের কাজ করতে হয় শিক্ষকদের।
ফরিদপুর সদর উপজেলার পূর্ব খাবাসপুরের শহীদ সালাহ উদ্দীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের কাঁচা কলা বিতরণের ঘটনায় সাময়িক বরখাস্ত করা হয় সহকারী শিক্ষক গোলাপী বেগমকে। গত ২৬ এপ্রিল শিক্ষার্থীদের বনরুটির সঙ্গে কাঁচা কলা দেওয়া হলে তা খেতে পারেনি তারা। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সৃষ্টি হয় সমালোচনার। আগের দিন সরবরাহকারীর কাছ থেকে কলা গ্রহণ করেছিলেন ওই শিক্ষক।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী, বিদ্যালয়ে খাদ্য বিতরণে রয়েছে একটি রুটিন। এতে বলা হয়েছে, রবিবার বিতরণ করতে হবে বনরুটি ও সেদ্ধ ডিম, সোমবার বনরুটি ও প্যাকেট দুধ, মঙ্গলবার বনরুটি ও সেদ্ধ ডিম, বুধবার বিস্কুট ও কলা বা স্থানীয় মৌসুমি ফল এবং বৃহস্পতিবার বনরুটি ও সেদ্ধ ডিম।
রাজবাড়ীর একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. বাবর আলী জানান, ঠিকাদারের প্রতিনিধি পণ্য সরবরাহ করলেও এর পরের পুরো প্রক্রিয়াই সম্পন্ন করতে হয় শিক্ষকদের। ডিম কাঁচা অবস্থায় সরবরাহ করা হয়, যা স্থানীয়ভাবে সেদ্ধ করে পরে বিতরণ করতে হয়। ২৫৩ শিশুর জন্য দেওয়া ডিমের খোসা ছাড়ানো, রেজিস্টার হালনাগাদ, শিশুদের হাতে হাতে খাবার পৌঁছে দেওয়া এবং অন্যান্য ব্যবস্থাপনার কাজও করতে হয় শিক্ষকদের।
প্রাথমিকের দেশসেরা প্রধান শিক্ষক মো. শহিদুল ইসলাম বললেন, স্কুল ফিডিং একটি ভালো উদ্যোগ। এ কর্মসূচির ফলে শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস ও উপস্থিতি— দুটিই বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। তবে বনরুটি, কলা ও ডিম গুনে বুঝে নেওয়ার কাজ বেশ সময়সাপেক্ষ। এর মধ্যে কোন ডিম পচা বা কোন কলা মানসম্মত নয়, তা যাচাই করাও শিক্ষকদের জন্য কষ্টসাধ্য। এসব কাজ করতে গিয়ে ব্যাহত হচ্ছে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান। অন্যদিকে প্রশ্ন উঠছে খাদ্যের মান নিয়ে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২০ লাখ ৮৪ হাজার ১৫৫ জন। ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১ কোটি ১৯ লাখ ৯৫ হাজার ২২২ জনে। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা ১ কোটি ৯ লাখ ৮৫ হাজার ৮১৫ জনে নেমে আসে। ২০২৪ সালে তা আরও কমে দাঁড়ায় ১ কোটি ৬ লাখ ১৭ হাজার ৯৬২ জনে। ২০২৫ সালে ১ কোটি ৬ লাখ ৯ হাজার ৫২ এবং চলতি ২০২৬ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৯৯ লাখ ২৩ হাজার ৮২২ জনে।
অন্যদিকে কেজি স্কুলে উল্টো বাড়ছে শিক্ষার্থী সংখ্যা। ২০২২ সালে কেজিতে শিক্ষার্থী ছিল ৩৪ লাখ ৭৩ হাজার ৬১৯, যা ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬ লাখ ৭৫ হাজার ৯৫৫ জনে। ২০২৪ সালে তা আরও বেড়ে ৩৭ লাখ ৬০ হাজার ৬৯৩ এবং ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৫৮ লাখ ১৮ হাজার ১৮৩ জনে।
কেজি স্কুলের সংখ্যা কিছুটা ওঠানামা করলেও সামগ্রিকভাবে রয়েছে স্থিতিশীল। ২০২২ সালে ছিল ২৬ হাজার ৪৭৯টি, ২০২৩ সালে কমে ২৫ হাজার ৪৫৩টি, ২০২৪ সালে বেড়ে ২৬ হাজার ৩০৪টি এবং ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ২৬ হাজার ৪৭টিতে।
কেজি, ইবতেদায়ি মাদ্রাসা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ২০২২ সালে এ সংখ্যা ছিল ৮৫ লাখ ৫০ হাজার ৮৬৯, ২০২৩ সালে ৮৭ লাখ ২৭ হাজার ৮৭০ এবং ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৫ লাখ ৬৫ হাজার ৮৬ জনে।
এদিকে অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংকট প্রকট হয়ে উঠছে। ২০২৪ সালে ১০০ জনের কম শিক্ষার্থী রয়েছে এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৯৭২টি, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৩২৬টিতে। একইভাবে ৬০ জনের কম শিক্ষার্থী রয়েছে এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা ২০২৪ সালে ছিল ২ হাজার ৯৮১, যা ২০২৫ সালে বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার ১৮৫টি।



