অন্তর্বর্তী সরকারের তাড়াহুড়ায় পুলিশের পোশাক পরিবর্তন, গচ্চা গেল ৭৬ কোটি টাকা
- ব্রিটিশ আমল থেকে এ পর্যন্ত ৫ দফায় পরিবর্তন
- গচ্চা যাচ্ছে ৭৬ কোটি টাকা
- তাড়াহুড়া নিয়ে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন
- এবার আগের নেভি-ব্লু শার্ট বহাল, প্যান্ট খাকি

প্রতীকী ছবি
পুলিশের পোশাক পাল্টানো নিয়ে ইউনূস সরকারের আমলে কম জল ঘোলা হয়নি। নানা মহলের আপত্তি ছিল। তবু তড়িঘড়ি বাহিনীটির পোশাক পাল্টানোর সিদ্ধান্তেই অনঢ় ছিল তারা। ৭৬ কোটি টাকা খরচ করে পরিবর্তন করা সেই পোশাক হয়েছিল নেটিজনদের হাসির খোরাক। এরপর? ইউনূস সরকার গিয়ে এলো বিএনপি সরকার। এখন এক বছরের মাথায়ই নতুন সরকার আবারও পোশাক বদলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগের ‘নেভি-ব্লু’ শার্টেই ফিরছে পুলিশ বাহিনী। কিন্তু প্যান্টের রঙ পাল্টে করা হচ্ছে ‘খাকি’।
তাহলে সাধারণ মানুষের পকেটের খরচ করা সেই ৭৬ কোটি টাকার হিসাব কে দেবে? এই বিপুল অর্থ কি তাহলে গচ্চাই গেল?
শুধু এখনকার সময়ই নয়। সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই পুলিশের পোশাক পাল্টেছে, যা এখন পর্যন্ত অন্তত পাঁচ দফা পরিবর্তন করেছে কর্তৃপক্ষ। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বর্তমান পোশাক নিয়ে বাহিনীর ভেতরে এবং বাইরে অসন্তোষ রয়েছে। এটি ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি। আবার অনেকের কাছেই মনে হয়নি মানানসই। বাহিনীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে। চেষ্টা করা হচ্ছে একটি ঐতিহ্যবাহী ও গ্রহণযোগ্য পোশাক নির্ধারণ করতে। আগের শার্ট বহাল রাখা হচ্ছে, প্যান্ট করা হচ্ছে খাকি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা শেষে পোশাক চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে কাপড় উৎপাদন ও সরবরাহের কারণে বাস্তবায়নে কিছুটা সময় লাগবে। এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না হলেও সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত।
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আশরাফুল হুদা আগামীর সময়কে বলেছেন, বারবার পোশাক পরিবর্তন করলেই শুধু হবে না। পুলিশ সদস্যদের মন থেকে পরিবর্তিত হতে হবে। পুলিশের পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করার জন্য সরকারের উচিত হবে পুলিশ কমিশন গঠন করে যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া। একই সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসা উচিত।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তাড়াহুড়া করে পুলিশের পোশাক পরিবর্তন করা ঠিক হয়নি। দেশের আবহাওয়ার সঙ্গেও তাদের নির্বাচন করা বর্তমান পোশাকটি ছিল না মানানসই। এ কারণে গচ্চা গেছে অনেক টাকা।
৭৬ কোটি টাকার প্রশ্ন
পুলিশের পোশাক পরিবর্তনে ব্যয়ের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য দিতে চাননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নতুন পোশাকের কাপড় সরবরাহে দুটি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৭৬ কোটি টাকার কাজ দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ৫১ কোটি টাকার কাজ পায় নোমান গ্রুপ এবং ২৫ কোটি টাকার কাজ পায় প্যারামাউন্ট গ্রুপ। এরই মধ্যে কয়েক লাখ মিটার কাপড় সরবরাহও করা হয়েছে এবং আংশিকভাবে নতুন পোশাক বিতরণ শুরু হয়েছিল। এ অবস্থায় আবার পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্তে ওই বিপুল অর্থ শুধু অপচয়ই হবে।
নোমান গ্রুপের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাদের ১০ লাখ মিটার কাপড় সরবরাহের চুক্তি থাকলেও এখন পর্যন্ত প্রায় তিন লাখ মিটার দেওয়া হয়েছে। আপাতত বলা হয়েছে কাজ স্থগিত রাখতে। নতুন রঙ নির্ধারণ হলে সে অনুযায়ী চলবে কাজ।
ঘন ঘন পোশাক পরিবর্তনে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয় বলে মন্তব্য বিশেষজ্ঞদের। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বললেন, এক বছরের মধ্যে আবার পোশাক পরিবর্তন কতটা যৌক্তিক, তা ভাবতে হবে। এতে রাষ্ট্রের অর্থ খরচ হয়। এর বদলে পুলিশের সেবার মান ও পেশাগত দক্ষতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া উচিত।
যতবার পরিবর্তন
বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ব্রিটিশ আমল থেকে পুলিশের পোশাক ছিল খাকি রঙের। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনেক আগেই পোশাকের রঙ বদলে গেছে। এর মধ্যে ২০০৪ ও ২০১৬ সালে দুবার পুলিশের কয়েকটি ইউনিটের পোশাকের রঙ পরিবর্তন করা হয়েছিল। মহানগর ও জেলাপর্যায়ে দুই রঙের পোশাক দেওয়া হয়। তবে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ও ব্যাটালিয়নভেদে পোশাকের ভিন্নতাও রয়েছে। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ও স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রোটেকশন ব্যাটালিয়নের (এসপিবিএন) পোশাক সম্পূর্ণ ভিন্ন রঙের। ২০০৪ সালে পুলিশের পোশাক পরিবর্তন করে মহানগরগুলোয় হালকা জলপাই রঙের করা হয়। জেলা পুলিশকে দেওয়া হয় গাঢ় নীল রঙের পোশাক। র্যাবের কালো ও এপিবিএনের পোশাক তৈরি করা হয় খাকি, বেগুনি আর নীল রঙের মিশ্রণে। এসপিবিএনের পোশাকের জামার রঙ করা হয় ধূসর। এভাবে পুলিশের পোশাক বিভিন্ন রঙের ও কাপড়ের হওয়ায় অপরাধীরা তা নকল করে ব্যবহারের মাধ্যমে ফায়দা লুটছে বলেও অভিযোগ ছিল। সারা দেশে এ ধরনের অনেক ঘটনার প্রমাণও মিলেছে। গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল অনেককে।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, এর আগে ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুলিশের পোশাকবিধি সংশোধন করা হয়। নতুন বিধিতে পুলিশের ক্যাপ, ব্যাজ ও কেন্ট থেকে নৌকার মনোগ্রামের সঙ্গে বৈঠাও বাদ দেওয়া হয়। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে সেই বিধি পরিবর্তন করে ১৯৮৫ সালের বিধি বহাল করে আওয়ামী লীগ সরকার।
এরপর ২০২৪-এর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপরই জোরেশোরে দাবি ওঠে পুলিশ সংস্কারের। তখন এ-সংক্রান্ত কমিশন পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। তারা ১০-১৫টি দেশের পুলিশের ইউনিফর্ম বিশ্লেষণ করে নতুন এই পোশাক নির্বাচন করে। গত বছরের নভেম্বরে এই পোশাক দেওয়া হয় পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে। তখন পুলিশের এমন পোশাক নিয়ে নানা ধরনের সমালোচনা হয়। এরপর ২০২৬-এর ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে পুলিশের বিভিন্ন সার্ভিস, অ্যাসোসিয়েশন ও সংস্থা পোশাক পরিবর্তনের দাবি তোলে।
পাঁচ রঙের প্রস্তাব, একটিতে চূড়ান্ত
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, গত মাসে দুবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে দেখা করে নতুন পোশাকের পাঁচ ধরনের রঙ উপস্থাপন করে পুলিশ প্রশাসন। পুলিশ চেয়েছিল সরকার সেখান থেকে একটি ধরন বেছে নিক। পাঁচ ধরনের রঙ ছিল খাকি শার্ট ও নেভি-ব্লু প্যান্ট; খাকি শার্ট ও খাকি প্যান্ট। আগের গাঢ় নীল রঙের (নেভি-ব্লু শার্ট-প্যান্ট) পোশাক; অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অনুমোদন পাওয়া লোহা (আয়রন) রঙের পোশাক এবং আকাশি শার্ট ও নেভি-ব্লু প্যান্ট। এর মধ্য থেকে সরকার গতকাল নেভি-ব্লু শার্ট ও খাকি প্যান্ট বেছে নিল।
পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতিতে যা ছিল
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এবং কুমিল্লা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আনিসুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানানো হয়। গমাধ্যমগুলোয় পাঠানো বিবৃতিতে তারা বলে, বিপুল অর্থ ব্যয়ে পোশাক পরিবর্তন না করে বাহিনীর আধুনিকায়ন, থানাপর্যায়ে যানবাহন সরবরাহ ও লজিস্টিকস সাপোর্ট বৃদ্ধি করাই যুক্তিযুক্ত হবে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ২০০৩-০৪ সালে তৎকালীন সরকার গঠিত একটি কমিটির মাধ্যমে দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে পুলিশের ইউনিফর্ম নির্ধারণ করেছিল। সে সময় পুলিশ সদস্যদের গায়ের রঙ, দেশের আবহাওয়া, দিন ও রাতের ডিউটিতে সহজে চিহ্নিত হওয়ার বিষয় এবং অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে সাদৃশ্য এড়ানোর দিকগুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল।
বিবৃতিতে দাবি করা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার সম্প্রতি যে নতুন পোশাক নির্বাচন করেছে, সেখানে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মতামত, গায়ের রঙ ও আবহাওয়াগত বিষয় যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। পাশাপাশি অন্যান্য ইউনিফর্মধারী সংস্থার সঙ্গে সাদৃশ্য থাকায় পুলিশ সদস্যদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করা কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক আরও দাবি করেন, বাহিনীর অধিকাংশ সদস্য তড়িঘড়ি করে নেওয়া এ সিদ্ধান্তের পক্ষে নন। তাদের মতে, বর্তমান পোশাক বাংলাদেশ পুলিশের ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের প্রতীক।



