প্রায় ‘নির্মূল’ হাম কেন আবার ফিরছে?

ছবিঃ আগামীর সময়
গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের সবুজে ঘেরা ছোট্ট জনপদ হোগলাডাঙ্গা। গ্রামটি হঠাৎই ছেয়ে গেছে শোকের চাদরে। ১০ মাস বয়সী শিশুকন্যা— তুবা ইসলাম তোহার মৃত্যুতে গ্রামজুড়ে ভর করেছে শোক আর আতঙ্ক। তার মৃত্যু প্রশ্ন তুলেছে, আবারও কি মরণব্যাধি রূপে ফিরে এলো হাম?
তোহা ছিল তুহিন শেখ ও নাজমা বেগমের আদরের ধন। তিন সন্তানের মধ্যে সবার ছোট। হাসিখুশি, প্রাণবন্ত শিশুটির জীবন যে এত দ্রুত থেমে যাবে তা কেউ কল্পনাও করেনি।
নাজমা জানান, গত ১৯ মার্চ হঠাৎ করেই তোহার জ্বর আসে। প্রথমে বিষয়টি তেমন গুরুতর মনে হয়নি। শিশুদের এমন জ্বর তো মাঝেমধ্যেই হয়, আবার ঠিকও হয়ে যায়। কিন্তু এবার পরদিনই পরিস্থিতি ভয়ানক রূপ নেয়। জ্বরের সঙ্গে শুরু হয় শ্বাসকষ্ট। তখন আর দেরি না করে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় মুকসুদপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
প্রথমে চিকিৎসা দেওয়া হয় জরুরি বিভাগে। কিন্তু তাতে কোনো উন্নতি হয় না। অবস্থা ধীরে ধীরে আরও অবনতির দিকে যায়। চারদিন পর সেখানকার একটি ক্লিনিকে নেওয়া হয় তোহাকে। কিন্তু সেই চিকিৎসায়ও অবস্থার কোনো পরিবর্তন আসে না। থার্মোমিটারের পারদ আরও চড়ে। তীব্র হয় শ্বাসকষ্ট, শরীরজুড়ে দেখা দেয় লাল লাল অসংখ্য ফুসকুড়ি।
২৬ মার্চ সকালে সংকটাপন্ন অবস্থায় ফের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তোহাকে অক্সিজেন দিয়ে দ্রুত ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে বলেন। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ছোট্ট এই শিশুকে পাঠানো হয় ঢাকায়। রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তোহাকে। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রেখে চলছিল চিকিৎসা। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৭ মার্চ দুপুরে মায়ের কোলে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে তোহা।
মাতম করতে-করতে সেই মুহূর্তের বর্ণনা দেন নাজমা বেগম। ‘চোখের সামনে আমার মেয়েটা চলে গেল, কিছুই করতে পারলাম না।’
স্থানীয় স্বাস্থ্য সহকারী জানালেন, জন্মের পর নিয়মিত টিকা নেওয়া হলেও হামের টিকা দেওয়া হয়নি তোহাকে। টিকা দেওয়ার নির্ধারিত সময়ের আগেই সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। ২৫ মার্চ টিকা দেওয়ার জন্য স্বাস্থ্যকর্মী বাড়িতে গেলে মা নাজমা জানান, শিশুটি অসুস্থ। সেদিন আর টিকা দেওয়া হয়নি। পরিকল্পনা ছিল, ২৫ এপ্রিল টিকা দেওয়া হবে। কিন্তু তার আগেই সব শেষ।
এই ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। তারা ইতোমধ্যে শিশুটির চিকিৎসা সংক্রান্ত সব তথ্য সংগ্রহ করেছে, চলছে কেস স্টাডি তৈরির কাজ।
মুকসুদপুর স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত তিন বছরে ওই এলাকায় হামের কোনো পজিটিভ রোগী পাওয়া যায়নি। তাই তোহার মৃত্যুর বিষয়টি তারা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছেন।
এই শিশুটির মৃত্যুর পর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই ভাবছেন, এটা কি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি আক্রান্ত হতে পারে এলাকার অন্য শিশুরাও?
জনস্বাস্থ্যবিদদের কপালে চিন্তার ভাঁজ
বাংলাদেশ যখন সংক্রামক ব্যাধি ‘হাম’ নির্মূলের চূড়ান্ত পর্যায়ে, ঠিক তখনই মুকসুদপুরের ঘটনাটির মতো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন করে এ রোগের প্রকোপ চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কপালে।
সম্প্রতি দেশের বেশ কিছু জেলায় হামের সংক্রমণ শুধু বিস্তারই লাভ করেনি— বরং বহু শিশুর প্রাণহানিও ঘটেছে। এক সময়ের ‘প্রায় নির্মূল হওয়া’ একটি রোগ কেন আবার মহামারি রূপ নেওয়ার শঙ্কা জাগাচ্ছে, তাই এখন বড় প্রশ্ন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম ছোঁয়াচে রোগ হলেও আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে সচেতনতা জরুরি। সময়মতো টিকা দেওয়া এবং প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই হতে পারে কার্যকর উপায়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের এই প্রত্যাবর্তনের নেপথ্যে তিনটি বড় কারণ।
১. টিকাদানে বিরতি ও ঘাটতি: করোনা মহামারির সময় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল। অনেক শিশু তাদের নির্ধারিত হাম ও রুবেলা (এমআর) টিকা সময়মতো পায়নি। এই ‘গ্যাপ’ বা বাদ পড়া শিশুদের মধ্যেই এখন ভাইরাসের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
২. জনগোষ্ঠীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস: দীর্ঘ সময় টিকাদান কম হওয়ায় শিশুদের একটি বড় অংশের মধ্যে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা সামষ্টিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে। যাকে বলা হয় ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বা সুরক্ষার অভাব। সাধারণত কোনো অঞ্চলের ৯৫% শিশু টিকার আওতায় থাকলে সেখানে হাম ছড়াতে পারে না।
৩. পুষ্টি ও সচেতনতার অভাব: দুর্গম এলাকা ও বস্তি অঞ্চলগুলোয় শিশুদের অপুষ্টি এবং টিকার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সচেতনতার অভাব সংক্রমণ আরও ত্বরান্বিত করেছে।
সংক্রমণের হার উদ্বেগজনক
দেশে এরই মধ্যে কয়েকটি জেলায় হাম সংক্রমণ বড় আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকা, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, পাবনাসহ কয়েকটি জেলার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রতি বছরই শিশুরা হামে আক্রান্ত হলেও এ বছর সংক্রমণের হার উদ্বেগজনকভাবে বেশি।
চলতি মাসে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হামে সংক্রমিত ১২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে আইসিইউতে নেওয়ার পরেও বাঁচানো সম্ভব হয়নি ৯ জনকে। অন্যদিকে সাধারণ ওয়ার্ডের খবর তেমন বিস্তৃত পরিসরে জানা যায়নি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালের শিশু ও নবজাতক বিভাগের কনসালট্যান্ট মাহফুজ রায়হান জানান, রবিবার (২৯ মার্চ) সকালে তার হাসপাতালে ৭০ জন শিশু হাম ওয়ার্ডে ভর্তি ছিল। বিকেলে ছুটি দেওয়ার পর ছিল প্রায় ৫০ শিশু। এই রোগে তিন মাসে মারা গেছে চারজন। তাদের মধ্যে চলতি মাসেই দুজন মারা যায়। তিন মাস ধরে তারা আলাদা ওয়ার্ডে রেখে শিশুদের চিকিৎসা দিচ্ছেন।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ১২ দিনে ১০৬ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে রবিবার পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়। ময়মনসিংহ ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাম আক্রান্ত শিশুদের ওই হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে। পাবনায় চলতি বছরের তিন মাসে ৩৩ জনের শরীরে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
মৃত্যুর মিছিল ও চিকিৎসায় অবহেলা বিতর্ক
হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুহার বেড়ে যাওয়ার পেছনে ‘চিকিৎসায় অবহেলা’র চেয়ে ‘সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পাওয়াকে’ বড় কারণ হিসেবে দেখছেন চিকিৎসকরা। তারা বলছেন, হামের জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও মস্তিষ্কে প্রদাহ দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরা সাধারণ জ্বর মনে করে বাড়িতেই চিকিৎসা করান, যা পরিস্থিতিকে প্রাণঘাতী করে তোলে। এছাড়া প্রত্যন্ত অঞ্চলে সঠিক স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতাও মৃত্যুহার বাড়ার অন্যতম কারণ।
তবে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায়ও রয়েছে কিছু সীমাবদ্ধতা। উপজেলা পর্যায়ে অনেক হাসপাতালে হামের রোগীদের জন্য আলাদা ‘আইসোলেশন ওয়ার্ড’ বা পর্যাপ্ত অক্সিজেন সাপোর্ট না থাকায় জটিল রোগীদের সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। একে সরাসরি অবহেলা না বললেও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রতিটি ইউনিয়ন পর্যায়ে আক্রান্ত শিশুদের আলাদা রাখার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে ভাইরাস সুস্থ শিশুদের মাঝে ছড়াতে না পারে। হামের ভাইরাস অত্যন্ত সংক্রামক। একজন আক্রান্ত শিশু গড়ে ১২ থেকে ১৮ জন সুস্থ শিশুকে সংক্রমিত করতে পারে। ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে এই সংক্রমণ জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুদের মধ্যে পুষ্টির অভাব এবং ভিটামিন-এ ক্যাপসুল নিয়মিত না পাওয়াও হামের জটিলতা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
টিকাদান কর্মসূচিতে গাফিলতি নাকি সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশ সরকারের টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে কিছু অঞ্চলে সমন্বয়হীনতা লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে ভাসমান জনগোষ্ঠী এবং দুর্গম পার্বত্য বা চরাঞ্চলে টিকাদানের হার লক্ষ্যমাত্রার নিচে ছিল। এটি পুরোপুরি গাফিলতি না বললেও নজরদারির অভাব হিসেবে বিবেচনা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
যদিও হামের প্রকোপ কমাতে সরকার ইতিমধ্যে বেশ কিছু জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে। সেগুলো হলো:
১. জরুরি টিকাদান ক্যাম্পেইন: যেসব এলাকায় সংক্রমণ বেশি, সেখানে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে।
২. নজরদারি বৃদ্ধি: প্রতিটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে হামের সন্দেহভাজন রোগীদের তালিকা তৈরি ও দ্রুত চিকিৎসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৩. ভিটামিন-এ ক্যাপসুল বিতরণ: হামের জটিলতা কমাতে শিশুদের ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানো নিশ্চিত করা হচ্ছে।
তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কেবল সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন বহুমুখী তৎপরতা। যার মধ্যে রয়েছে:
১. ক্রাশ প্রোগ্রাম: বাদ পড়া একটি শিশুও যেন টিকার আওতার বাইরে না থাকে, সেজন্য দেশব্যাপী বিশেষ ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ চালাতে হবে।
২. সচেতনতা বৃদ্ধি: হামের লক্ষণ ও টিকার গুরুত্ব নিয়ে গণমাধ্যম এবং ধর্মীয় উপাসনালয়ের মাধ্যমে প্রচারণা জোরদার করতে হবে।
৩. দ্রুত রেফারেল সিস্টেম: আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠানোর জন্য স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
হামের উপসর্গ কেবল জ্বর নয়, এটি শিশুদের চিরতরে অন্ধ বা বিকলাঙ্গও করে দিতে পারে। সংক্রমণ যে গতিতে বাড়ছে, তাতে এখনই সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা না নিলে আমরা ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারি। যদিও হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। শুধু সঠিক সময়ে দুই ডোজ টিকা নিশ্চিত করতে পারলেই মৃত্যুর এমন মিছিল থামানো সম্ভব। সরকারের তড়িৎ পদক্ষেপের পাশাপাশি শিশুদের অভিভাবক ও সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকেও সচেতন হতে হবে, যাতে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হামমুক্ত একটি নিরাপদ দেশ পায়।

