রাতে মন্ত্রিসভার বৈঠক
বাতিল হচ্ছে এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি সুবিধা

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
সংসদ সদস্যদের (এমপি) শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা বাতিল হচ্ছে। দীর্ঘদিনের আলোচিত এ নিয়ম বদলাতে অর্থ বিভাগ চূড়ান্ত করেছে আইন সংশোধনের খসড়া, যা অনুমোদনের জন্য আজ বৃহস্পতিবার রাতে সংসদ সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে করা হতে পারে উপস্থাপন। এমনটিই জানিয়েছেন অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা। মন্ত্রিসভার সম্মতি মিললে তা বিল আকারে তোলা হবে সংসদে।
জনপ্রতিনিধি ও সরকারি দপ্তরে সংশ্লিষ্ট বিশেষ সুবিধা কমিয়ে আনা এবং কর-ব্যবস্থায় সমতা নিশ্চিতে আনা হচ্ছে এই পরিবর্তন।
শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হয় ‘দ্য মেম্বার্স অব দ্য পার্লামেন্ট (রেমুনারেশন অ্যান্ড অ্যালাউন্সেস) অর্ডার-১৯৭৩’-এর আলোকে। বিদ্যমান এই আইন সংশোধন করে দ্য মেম্বার্স অব দ্য পার্লামেন্ট (রেমুনারেশন অ্যান্ড অ্যালাউন্সেস) (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট-২০২৬-এর খসড়া চূড়ান্ত করেছে অর্থ বিভাগ।
এমপিদের মূল কাজ আইনপ্রণয়ন। কিন্তু এর বাইরে গিয়েও তারা নানা নির্বাহী কাজে পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত হন। কাগজে-কলমে তারা উপদেষ্টা, কিন্তু স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা তাদের কথা ছাড়া কোনো কাজই করতে পারেন না। এই সংসদ সদস্যরাই পান শুল্কমুক্ত সুবিধার গাড়ি।
সাধারণত একটি ৮ কোটি টাকার গাড়িতে প্রায় ৬ কোটি টাকার বেশি শুল্ক থাকে। একজন এমপি সেই ৬ কোটি টাকা ছাড় পান, যেখানে একজন সাধারণ নাগরিককে পুরো দামই পরিশোধ করতে হয়। অথচ অতীতে অনেক এমপিকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা এই গাড়ি নিজেরা ব্যবহার না করে চড়া দামে বেচে দিতে দেখা গেছে। সাধারণত তারা বাজারের সবচেয়ে দামি গাড়িটিই আমদানি করেন, যাতে চড়া দামে বিক্রি করে হতে পারেন ব্যক্তিগতভাবে লাভবান।
১৯৮৭ সালে এরশাদ সরকারের সময় চালু হওয়া এই সুবিধা দীর্ঘদিন ধরে উচ্চমূল্যের গাড়িতে করছাড় দেওয়ার কারণে হয়ে আসছে সমালোচিত।
শুল্কমুক্ত সুবিধা বাতিলের বিষয়ে অর্থ বিভাগ থেকে রাষ্ট্রপতির জন্য পাঠানো সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে—সংসদ সদস্যদের পারিতোষিক ও ভাতাদি ‘দ্য মেম্বার্স অব দ্য পার্লামেন্ট (রেমুনারেশন অ্যান্ড অ্যালাউন্সেস) অর্ডার, ১৯৭৩’ অনুযায়ী হয় নির্ধারিত। এই আইন অনুযায়ী তারা সুবিধা ভোগ করেন শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির। জনগণের সেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচিত হন সংসদ সদস্য। এরপর আইনি সুবিধা নিয়ে আমদানি করেন শুল্কমুক্ত গাড়ি। এটি একদিকে যেমন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, অন্যদিকে এ ধরনের সুবিধা কর দেওয়ার ক্ষেত্রে জনগণের সঙ্গে তৈরি করে বৈষম্য। এমন প্রেক্ষাপটে সংসদ নেতার (প্রধানমন্ত্রী) দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে সংসদ সদস্যদের জন্য বিদ্যমান শুল্কমুক্ত গাড়ি সুবিধা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও জনমতের প্রেক্ষাপটে পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন।
রাষ্ট্রীয় ব্যয় সংকোচনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি জোরদার, আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য ওই অনুচ্ছেদ বিলুপ্তির প্রস্তাব করা হচ্ছে আজকের মন্ত্রিসভার বৈঠকে।
এর আগে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, সংসদীয় দলের প্রথম বৈঠকেই তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে জনপ্রতিনিধিত্বের সঙ্গে যুক্ত নেবেন না কেউ কোনো সুবিধা। সংসদ সদস্যদের বেতন-ভাতাসংক্রান্ত ১৯৭৩ সালের আদেশ অনুযায়ী দেওয়া এই সুবিধা বাতিল করতে হবে আইন সংশোধন।
এ বিষয়ে আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও হয়েছিল বিস্তর আলোচনা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এই সুবিধা বাতিলের প্রস্তাব দিলেও সংসদ সদস্যদের আপত্তির মুখে তা পাস হয়নি।
বর্তমানে প্রচলিত বিধান অনুযায়ী, একজন সংসদ সদস্য তার মেয়াদকালে একটি গাড়ি-কার, জিপ বা মাইক্রোবাস শুল্ক, ভ্যাট, ডেভেলপমেন্ট সারচার্জ এবং আমদানি অনুমতি ফি ছাড়াই করতে পারেন আমদানি।
অন্যদিকে সাধারণ আমদানিকারকদের ক্ষেত্রে প্রায় ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক, ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ৫ শতাংশ অগ্রিম কর এবং ৪০০ থেকে ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত সম্পূরক শুল্কসহ করতে হয় বড় অঙ্কের কর পরিশোধ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর্মকর্তারা জানান, ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত এই সুবিধার আওতায় সংসদ সদস্যরা আমদানি করেছেন ৫৭২টি গাড়ি। এসব গাড়ির শুল্কমূল্য ছিল প্রায় ৩৯৭ কোটি টাকা। আর রাজস্ব-ছাড়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে অন্তত ৫ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা। ১২তম সংসদ ভেঙে দেওয়ার পর ৩০টি শুল্কমুক্ত গাড়ি ছাড় না দেওয়ার নির্দেশ দেয় এনবিআর। পরে সেগুলো জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীনে যুক্ত করা হয় সরকারি যানবাহন পুলে। এসব গাড়ির বিপরীতে বকেয়া শুল্ক ও করের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা। প্রতিটি গাড়ির কর দায় ছিল প্রায় ৮ কোটি ৬২ লাখ থেকে ৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার মধ্যে।
গত মঙ্গলবার সংসদে হাসনাত আবদুল্লাহর তরফে এমপিদের জন্য সরকারি গাড়ি চাওয়া এবং তাতে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সমর্থনের পর বিষয়টি নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। এমপিরা যাতায়াতের জন্য বড় অঙ্কের ভাতা পাওয়ার পরও এমন চাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।
হাসনাত আবদুল্লাহ সংসদে ব্যক্তিগত শুল্কমুক্ত গাড়ির পরিবর্তে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বা ইউএনওদের মতো সরকারি ব্যবহারের জন্য গাড়ি চেয়েছেন, যা গণমাধ্যমে ‘শুল্কমুক্ত গাড়ি চাওয়া’ হিসেবে ভুলভাবে প্রচারিত হয়েছে বলে তার দাবি।
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, যাতায়াত ভাতা থাকার পরও গাড়ির সুবিধা চাওয়া বাহুল্য এবং জনগণের করের টাকার অপচয়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) মনে করে, যেহেতু সংসদ সদস্যরা প্রতি মাসে ৭০,০০০ টাকা যাতায়াত ভাতা পান, তাই আলাদা গাড়ি চাওয়া নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পরপরই বিএনপি এবং জামায়াত—উভয় দলের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সরকারি সুবিধা হিসেবে শুল্কমুক্ত গাড়ি এবং প্লট না নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন। তারা রাজনৈতিক সততা, জনগণের প্রত্যাশা এবং ব্যক্তিগত সুবিধা গ্রহণ না করার প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে এমন সিদ্ধান্তে পৌছানোর কথা জানিয়েছিলেন।



