বার কাউন্সিল নির্বাচন স্থগিত
জ্বালানি সংকট, নাকি জয় পরাজয়ের হিসাব-নিকাশ
- একক নির্বাচন নাকি জোট, সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি বিএনপিপন্থিরা
- সারা দেশে আওয়ামীপন্থিদের জয় বিএনপিপন্থিদের ভাবনার বিষয়

আগামীর সময় গ্রাফিকস
কেবলই জ্বালানি সংকট নাকি জয়-পরাজয়ের হিসাব-নিকাশ? কি কারণে স্থগিত হলো আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রক ও তদারকি সংস্থা বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নির্বাচন?
ঘোলাটে পরিবেশ, কতদিন নির্বাচন স্থগিত— তা অনিশ্চিত। ভোট পেছালেও আনুমানিক তারিখ বলছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সব মিলিয়ে জ্বালানির জলে তলিয়ে যাচ্ছে না তো বার কাউন্সিল নির্বাচন?
দেশের বিভিন্ন আইনজীবী সমিতিতে চলমান নির্বাচন নির্বিঘ্ন রাখতে আইনজীবীদের অনুরোধও নেওয়া হয়েছে বিবেচনায়। এমনটাই জানানো হয়েছে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে।
তবে দু-একটি আইনজীবী সমিতির অনুরোধে কখনো বার কাউন্সিলের নির্বাচন স্থগিত করা হয়নি অতীতে। জোর দিয়ে এমনটাই জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী জহিরুল ইসলাম খান পান্না (জেড আই খান পান্না)।
কারাবন্দি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ সায়েদুল হক সুমনও প্রার্থী হতে চান আসন্ন বার কাউন্সিল নির্বাচনে
২০০৪, ২০০৮, ২০১৫ ও ২০১৮ সালে বার কাউন্সিল নির্বাচনে জয়ী আইনজীবী পান্না। এবারের নির্বাচনেও প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছেন নিজেকে। তার মতে, জ্বালানি সংকট হতে পারে অজুহাত। হয়তো নির্বাচন স্থগিতের বড় কারণ সরকার সমর্থক আইনজীবীদের যথাযথ প্রস্তুতির অভাব।
তবে সরকার সমর্থক বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের প্রস্তুতির কোনো ঘাটতি নেই। এমনটাই দাবি জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সুপ্রিম কোর্ট ইউনিটের আহ্বায়ক ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদলের।
তার মতে, নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের প্রচারণার জন্য যেতে হয় দেশের ৬৪টি আইনজীবী সমিতিতে। কিন্তু প্রচারণা যথাযথভাবে করা যাবে না জ্বালানি সংকটের কারণে। পাশাপাশি এপ্রিল মাসে ঢাকা আইনজীবী সমিতি এবং মে মাসের মাঝামাঝি নির্ধারিত সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের চাপ মাথায় নিয়ে বার কাউন্সিলের নির্বাচনের প্রচারণা চালানো কঠিন। এসব বিবেচনায় পেছানো হয়েছে নির্বাচন।
‘তীব্র জ্বালানি সংকট’ নির্বাচনী প্রচারণা বিঘ্নিত করতে পারে- এমন আশঙ্কায় স্থগিত করা হয়েছে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নির্বাচন। গত ১৫ এপ্রিল এক জরুরি সভায় নেওয়া হয় এমন সিদ্ধান্ত। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন আইনজীবী সমিতিতে চলমান নির্বাচন নির্বিঘ্ন রাখতে আইনজীবীদের অনুরোধও এক্ষেত্রে নেওয়া হয়েছে বিবেচনায়।
দলীয় কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে নামে-বেনামে প্যানেল দিয়ে অংশ নিয়েছেন আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা। অনেক সমিতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতাও পেয়েছেন তারা
ঘোষিত তফসিল অনুসারে, সাধারণ আসনের ৭টি ও আঞ্চলিক আসনের ৭টি পদে বার কাউন্সিল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল আগামী ১৯ মে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বার কাউন্সিল ভবনে জরুরি সভায় সদস্যরা নির্বাচন স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেন। বিবেচনা করা হয়েছে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন, ঢাকা আইনজীবী সমিতি ও চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতিসহ দেশের বিভিন্ন বার সমিতির অনুরোধও।
বার কাউন্সিল নির্বাচন হয়ে থাকে তিন বছর পর পর। নির্বাচনে ১৪টি পদ বা আসনে ভোট হয়। এর মধ্যে সাধারণ আসনে সাতজন ও সাতটি অঞ্চলভিত্তিক আইনজীবী সমিতির সদস্যদের মধ্য থেকে একজন করে আরও সাতজন নির্বাচিত হয়ে থাকেন। সরাসরি ভোটে নির্বাচিত ১৪ সদস্যের ভোটে নির্বাচিত হন বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান। পদাধিকারবলে কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন অ্যাটর্নি জেনারেল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অ্যাডহক কমিটি গঠনের মাধ্যমে বার কাউন্সিলের কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। বর্তমান কমিটির প্রায় সবাই সরকারদলীয় বিএনপিপন্থি আইনজীবী।
নির্বাচনী প্রস্তুতিতে ঘাটতি নেই দাবি করলেও এখনো প্রার্থী চূড়ান্ত করতে পারেনি। এমকি এককভাবে নির্বাচন করবে, নাকি জোটবদ্ধভাবে, সে ব্যাপারেও কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সারা বিশ্বেই এখন জ্বালানি সংকট। দেশেও পড়েছে এর প্রভাব। তেলের পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন এর বড় প্রমাণ। তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত শুনিয়েছেন আশার কথা। ‘বর্তমানে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি মজুদ আছে,’ শনিবার জানিয়েছেন তিনি। তবে জ্বালানি মজুদের এমন আশ্বাসের প্রতিফলন নেই বার কাউন্সিলের বিজ্ঞপ্তিতে।
নির্বাচনী প্রস্তুতিতে ঘাটতি নেই দাবি করলেও ব্যারিস্টার বাদল জানান, তারা এখনো প্রার্থী চূড়ান্ত করতে পারেননি। এমনকি এককভাবে নির্বাচন করবেন, নাকি জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করবেন সে ব্যাপারেও কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি।
বিগত বছরগুলোতে যেসব আইনজীবী বিএনপিপন্থি প্যানেলের নেতৃত্বে ছিলেন তাদের একটা অংশ বর্তমানে সংসদ সদস্য ও বিভিন্ন দপ্তরের দায়িত্বে। তাই নতুনদের নিয়ে প্যানেল চূড়ান্ত করাও তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলেই মনে করছেন অনেকে।
বার কাউন্সিল নির্বাচনে বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল মাত্র একবারই। ২০১২ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ১৪টি সদস্য পদের মধ্যে জোটবদ্ধ বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য প্যানেলের ৯ প্রার্থী জয়ী হন।
এদিকে দলীয় কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে নামে-বেনামে প্যানেল দিয়ে অংশ নিয়েছেন আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা। অনেক সমিতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতাও পেয়েছেন তারা। নির্বাচন ঘিরে এটি এখন বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের ভাবনার বিষয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির বার্ষিক নির্বাচনে ১৭ পদের মধ্যে আওয়ামীপন্থিরা জিতেছেন সাতটিতে। এর বাইরে চার পদে বিএনপি ও ছয়টিতে জিতেছেন জামায়াতপন্থিরা।
এর আগে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত লক্ষ্মীপুর জেলা আইনজীবী সমিতির বার্ষিক নির্বাচনে কোনো প্যানেল না দিয়েও ১৫ পদের আটটিতেই জিতেছেন আওয়ামীপন্থিরা। বাকি ছয়টিতে জয়ী হয়েছেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা। এ নির্বাচনে প্যানেল দিলেও জিততে পারেননি জামায়াতপন্থি কেউ। একটি পদে জিতেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী।
গত ৪ মার্চ অনুষ্ঠিত কিশোরগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির বার্ষিক নির্বাচনে স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও পাঁচ পদে জিতেছেন আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা। সমিতিতে মোট ১৪ পদের মধ্যে ১১টিতে প্রার্থী দিয়ে ৯ পদে জয় পায় জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম।
এবার বার কাউন্সিল নির্বাচনে নির্দলীয় ব্যানারে অংশগ্রহণের জন্যও প্রস্তুতি নিয়েছেন আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের একটি গ্রুপ।
কারাবন্দি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ সায়েদুল হক সুমনও প্রার্থী হতে চান আসন্ন বার কাউন্সিল নির্বাচনে। তাকে অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়ায় সরকারের নিষ্ক্রিয়তা ও ব্যর্থতা চ্যালেঞ্জ করে একটি রিট আবেদন করা হয়েছে হাইকোর্টে।
রিটে আবেদন করা হয়েছে, ঢাকার জেলা প্রশাসককে (ডিসি) ব্যারিস্টার সুমনের মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষরের ব্যবস্থা করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে নির্দেশ দেওয়া হয় বার কাউন্সিলের সচিবকে নির্ধারিত সময়সীমা (১৬ এপ্রিল) পেরিয়ে গেলেও যথাযথভাবে পূরণ করা মনোনয়নপত্র গ্রহণের। যাতে কারাগারে থেকেই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন ব্যারিস্টার সুমন।



