যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাবনার মধ্যেও চলছে তেল সংগ্রহের লড়াই
- দিন দিন বড় হচ্ছে তেলের লাইন
- পাম্পগুলো হঠাৎ করেই কমিয়ে দিয়েছে তেলের পরিমাণ
- মজুতের তথ্য মেলে না বাস্তবতার চিত্রে
- পাম্পের কর্মী ও তেল সংগ্রহকারীদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের ডামাডোলে টালমাটাল বিশ্ব। গেল ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া সেই সংঘাতে সবচেয়ে বড় সংকটে বৈশ্বিক জ্বালানি খাত। বিশেষ করে, ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে জ্বালানি সরবরাহে দেখা দেয় বড় ধরনের অচলাবস্থা। বিশ্ববাজারে হু হু করে বাড়তে থাকে তেলের দাম।
বাংলাদেশও গতকাল শনিবার রাতে দাম বাড়িয়েছে জ্বালানি তেলের। এর আগে সংকট সামাল দিতে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করে সরকার। তারপর থেকেই তেল সংগ্রহের যুদ্ধে নামতে হয়েছে গ্রাহকদের। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে তেল পাচ্ছেন না অনেকে।
এরই মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে গেছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র। তবে যুদ্ধবিরতি নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়ায় জ্বালানির বাজার এখনও অস্থির।
গেল এক মাসেরও কম সময়ে দেশে এসেছে হাজার হাজার টন ডিজেল-পেট্রল। সরকারের পক্ষ থেকেও বারবার বলা হচ্ছে পর্যাপ্ত মজুতের কথা। কিন্তু গ্রাহক পর্যায়ে বিশেষ উন্নতি হয়নি জ্বালানি পরিস্থিতির। বরং দিন যত যাচ্ছে পাম্পের সামনে ততই দীর্ঘ হচ্ছে লাইন। বাড়ছে মানুষের ভোগান্তি।
মানুষের প্রশ্ন, কী পরিমাণ জ্বালানি মজুদ রয়েছে দেশে? আর তা দিয়ে চলবে কতদিন? কিংবা কবে মুক্তি মিলবে এ পরিস্থিতি থেকে?
গত ১৫ এপ্রিল জ্বালানি বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ডিজেলের মজুদ ১ লাখ ১ হাজার ৩৮৫ টন। অকটেন আছে ৩১ হাজার ৮২১ টন, পেট্রল ১৮ হাজার ২১১ টন, ফার্নেস অয়েল ৭৭ হাজার ৫৪৬ টন এবং জেট ফুয়েল আছে ১৮ হাজার ২২৩ টন। পাশাপাশি কয়েকটি তেলের জাহাজ দেশের পথে।
অথচ জ্বালানি তেল নিয়ে সরকারি তথ্যের ছিটেফোঁটা প্রভাবও দেখা যায় না পেট্রল পাম্পগুলোতে। রাজধানীর পেট্রল পাম্পগুলোতে প্রায় ২৪ ঘণ্টাই দেখা যাচ্ছে মোটরসাইকেল ও গাড়ির দীর্ঘ সারি। অনেকেই ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও পাচ্ছেন না প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি। কেউ কেউ ফিরছেন খালি হাতেও।
শনিবার ঢাকার মতিঝিলের করিম অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনে তেলের জন্য অপেক্ষা করছিলেন রাজীব আহমেদ। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী রাজীব জানালেন, দুদিন ধরে দুটি পেট্রল পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। তাই এদিন সকাল থেকেই দাঁড়িয়েছিলেন লাইনে। তবে দুপুরে যখন তার সঙ্গে আলাপ হচ্ছিল তখনো তিনি ছিলেন সংশয়ে, তেল কি আদৌ মিলবে।
রাজীবের অভিযোগ, এতদিন পাম্পটিতে অন্তত ৫০০ টাকার তেল দেওয়া হতো। কিন্তু শনিবার থেকে হুট করে তা ৩০০ টাকায় নামিয়ে আনা হয়। শুনেছি, যুদ্ধ থামার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, কিন্তু আমাদের পরিস্থিতির কোনো বদল নেই।
ওই পাম্পের এক কর্মী জানান, শুক্রবার তাদের পাম্পে ৫০০ টাকার তেল দেওয়া হয়েছে। সরবরাহ কমে যাওয়ায় শনিবার থেকে দেওয়া হচ্ছে ৩০০ টাকার। ফলে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অনেকেই তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে পাম্পে দায়িত্বরতদের দাবি, বৈশ্বিক পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলেও সরবরাহ চেইনে পুরোপুরি স্বাভাবিকতা না ফেরায় কাটছে না এই সংকট।
তাদের ভাষ্য, জ্বালানি সরবরাহ সীমিত থাকায় প্রতিদিনই পড়তে হচ্ছে চ্যালেঞ্জের মুখে। কঠিন হয়ে যাচ্ছে গ্রাহকদের চাপ সামলানো।
এদিকে, মোটরসাইকেল চালকদের অতিরিক্ত ভিড় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলে অভিযোগ পাম্পের দায়িত্বরতদের। তারা বলছেন, রাইড শেয়ারিংয়ে যুক্ত অনেক বাইকার চেষ্টা করছেন প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জ্বালানি নেওয়ার। এ ছাড়া কিছু প্রাইভেট কারচালক পাম্প থেকে তেল নিয়ে বাইরে অধিক দামে বিক্রি করছেন, ফের দাঁড়াচ্ছেন লাইনে। ফলে আরও প্রকট হচ্ছে সংকট।
তবে বাইকারদের যুক্তি ভিন্ন। এক রাইড শেয়ারিং চালকের যুক্তি, ‘আমাদের আয় পুরোপুরি তেলের ওপর নির্ভর করে। তেল না পেলে কাজ বন্ধ হয়ে যাবে, তাই সুযোগ পেলে একটু বেশি নেওয়ার চেষ্টা করি।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে দেশের বাজারে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে জ্বালানি তেলের চাহিদা। এর সঙ্গে ‘প্যানিক বায়িং’- অর্থাৎ প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কেনার প্রবণতা। ফলে সংকট হয়েছে আরও তীব্র।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত ৬ মার্চ জ্বালানি তেলে রেশনিং প্রক্রিয়া চালু করে সরকার। জ্বালানি তেল বিতরণে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা আনতে গত রবিবার থেকে রাজধানীর সাতটি ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেলচালকদের জন্য চালু হয়েছে কিউআর কোডভিত্তিক মোবাইল অ্যাপ ফুয়েল পাস। কিন্তু অধিকাংশ পাম্পগুলোতেই মানা হচ্ছে না নিয়ম। ফুয়েল পাস ছাড়াই দেওয়া হচ্ছে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণের তেল।
সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র (যুগ্ম সচিব) মনির হোসেন চৌধুরীকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ না করে কেটে দেন।



