ধান উৎপাদনে টানের শঙ্কা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
হাওর জলমগ্ন থাকবে, এটাই বাস্তবতা। কিন্তু এবারের পানি যতটা না বানের, তার চেয়ে বেশি কৃষকের চোখের। সেই পানির নিচে জ্বলজ্বল করছে সোনালি ধান। ধীরে ধীরে পচে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। মাটিতে মিশে যাচ্ছে চাষিদের স্বপ্ন। আইলে বসে কৃষক কাঁদলেও তেমন কোনো সমস্যাই দেখছেন না সরকারি কর্মকর্তারা। এটাই এখন দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের চিত্র।
টানা বৃষ্টি আর ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হাওরাঞ্চলের নদনদীর পানি দ্রুত বেড়ে তলিয়ে গেছে শত শত হেক্টর জমির ধান। ধাক্কা খেয়েছে চলতি বোরো মৌসুম। ধান কাটার আগেই জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় নষ্ট হয়েছে ফসলের বড় অংশ, টানা বৃষ্টির কারণে পচে ও গজিয়ে যাচ্ছে মাড়াইয়ের অপেক্ষায় থাকা শস্যও। অনেকে মাড়াই করতে পারলেও রোদ না থাকায় পারেননি শুকাতে। এমন পরিস্থিতিতে সব মিলিয়ে সারা দেশে প্রায় ১০ শতাংশ ধান উৎপাদন কম হতে পারে বলে শঙ্কা।
স্থানীয়রা হাওরে অপ্রয়োজনীয় রাস্তা নির্মাণ করে বন্ধ করেছে পানি নিষ্কাশনের পথ। এ কারণেই সৃষ্টি হয়েছে এই পরিস্থিতি
দেশের আবহাওয়া বিভাগ আগাম বন্যার পূর্বাভাস দিলেও নিরুপায় কৃষক। শ্রমিক সংকট ও ধান না পাকায় ঘরে তুলতে পারেননি ফসল। বাঁধ ভেঙে জমিতে পানি ঢুকে চোখের সামনে ডুবে গেছে শত শত বিঘার বোরো ধান।
ধান চাষ করে কাঁদছেন সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুরের কৃষ্ণনগর গ্রামের কৃষক সত্যেন্দ্র চন্দ্র বর্মণ। ৩০ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন তিনি। মৌসুমের শুরুতে ভালো ফলনের আশা থাকলেও আকস্মিক অতিবৃষ্টিতে ভেঙে গেছে তার স্বপ্ন। অর্ধেক ধান কেটে খলায় মাড়াই করে রাখলেও টানা বৃষ্টির কারণে যায়নি শুকানো। স্তূপেই গজিয়েছে চারা। বাকি ধান ডুবে নষ্ট হয়েছে জলাবদ্ধতায়।
উল্টো কৃষকের ঘাড়ে দোষ চাপালেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার। তার ভাষ্য, স্থানীয় লোকজন হাওরে অপ্রয়োজনীয় রাস্তা নির্মাণ বানিয়ে বন্ধ করেছে পানি নিষ্কাশনের পথ। এ কারণেই সৃষ্টি হয়েছে এই পরিস্থিতি।
অন্যদিকে ধানের কোনো ক্ষতিই চোখে পড়েনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিচালক ওবায়দুর রহমান মণ্ডলের। আগামীর সময়কে বললেন, ধান কাটার কাজ দ্রুত এগোচ্ছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৭১ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে, আর কাটার অপেক্ষায় রয়েছে ২৯ শতাংশ। দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই কাটা শেষ হবে অধিকাংশ জমির ধান।
হাওরের বন্যা পরিস্থিতি প্রায় নিয়মিত ঘটনা। প্রতি বছর কিছু অস্থায়ী বাঁধ মেরামত করা হয়, কিন্তু তা টেকসই সমাধান নয়। এখানে দুই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে— একটি হলো প্রকৃতির ওপর ছেড়ে দেওয়া, যাতে মানুষ সেই বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়; অন্যটি হলো স্থায়ী সমাধান
কিছুটা ক্ষতির কথা স্বীকারও করলেন তিনি। জানালেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে পাঠানো হয়েছে মন্ত্রণালয়ে। তিন মাসের সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। সহায়তার ধরন ও বিস্তারিত শিগগির স্পষ্ট হবে বলে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার প্রতি ইঙ্গিত করলেন তিনি।
ভিন্ন চিত্র তুলে ধরলেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক। রবিবার পর্যন্ত জেলায় কাটা সম্পন্ন হয়েছে ৬২ শতাংশ ধান। আর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা করা হচ্ছে বলে সহায়তা নিয়ে আশ্বস্ত করলেন তিনি।
হাওরে বোরো ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া নতুন কিছু নয় বলে আগামীর সময়কে আক্ষেপ করে জানালেন বিশিষ্ট কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম। কোনো বছর ক্ষতি বেশি হয়, কোনো বছর কম। এবারের ক্ষেত্রে যখন ক্ষতি শুরু হয়েছে, তখন এরই মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ ধান কাটা হয়ে গিয়েছিল। বাকি অংশের মধ্যেই মূল ক্ষতি হয়েছে, যা প্রায় ২০ শতাংশের মতো— যোগ করলেন তিনি।
সব মিলিয়ে সারা দেশে প্রায় ১০ শতাংশ ধান উৎপাদন কম হতে পারে বলে অনুমান করলেন তিনি। এটি মোট উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং চাপ সৃষ্টি করবে খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে। এতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে বলে তার আশঙ্কা।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পরামর্শ দিয়ে ড. জাহাঙ্গীর বললেন, হাওরের বন্যা পরিস্থিতি প্রায় নিয়মিত ঘটনা। প্রতি বছর কিছু অস্থায়ী বাঁধ মেরামত করা হয়, কিন্তু তা টেকসই সমাধান নয়। এখানে দুই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে— একটি হলো প্রকৃতির ওপর ছেড়ে দেওয়া, যাতে মানুষ সেই বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়; অন্যটি হলো স্থায়ী সমাধান। আর স্থায়ী সমাধান করতে হলে মনোযোগ দিতে হবে আগাম বন্যা ও পানিপ্রবাহ ব্যবস্থাপনায়।
এদিকে খাদ্য নিরাপত্তার তৃতীয় প্রধান উপকরণ বোরোর উল্লেখযোগ্য অংশ উৎপাদন হয় নিম্নাঞ্চলে। বিশেষ করে দেশের হাওরভুক্ত সাত জেলায় পাওয়া যায় জাতীয় উৎপাদনের ২০ শতাংশ ধান। চলতি মৌসুমে ৫০ লাখ হেক্টর জমিতে চাষ করে ২ কোটি ২৭ লাখ টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া— এই সাত জেলায় এবার মোট ৯ দশমিক ৬৩ লাখ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে বোরো। এর মধ্যে শুধু হাওর এলাকাতেই চাষ হয়েছে ৪ দশমিক ৫৫ লাখ হেক্টর জমিতে।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য, এ বছর জেলায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে বোরো। মার্চের মাঝামাঝি থেকে চার দফা বৃষ্টিতে প্রাথমিকভাবে আক্রান্ত হয় ১৮ হাজার ৯৩০ হেক্টর জমি। এর মধ্যে চূড়ান্তভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ২ হাজার ৪৭ হেক্টর জমির ধান। গতকাল রবিবার (৩ মে) পর্যন্ত হাওর এলাকায় ৭৩ শতাংশ এবং নন-হাওর এলাকায় কাটা হয়েছে ২৯ শতাংশ ধান।
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হয়েছে লঘুচাপ। দেশ জুড়ে ঝরছে বৃষ্টি। কোথাও মাঝারি, কোথায়ও ভারী, আবার কোথাও হচ্ছে অতিভারী বর্ষণ। গত কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণ আর উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে হাওর এলাকার কয়েকটি জেলায় দেখা দিয়েছে বন্যা পরিস্থিতি। বানের ঝুঁকিতে রয়েছে আরও কয়েকটি এলাকা। একাধিক হাওরে ফসল রক্ষাবাঁধ ভেঙে ডুবেছে ধান।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় টানা বৃষ্টিতে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকায় নদনদীর পানি বাড়ছে এবং কয়েকটি নদী এরই মধ্যে অতিক্রম করেছে প্রাক-মৌসুমি বিপদসীমা। গত ২৪ ঘণ্টায় এ অঞ্চলে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ৬২ মিলিমিটার এবং হবিগঞ্জে হয়েছে ৫১ মিলিমিটার বৃষ্টি।
রবিবার সকাল ৯টার তথ্য অনুযায়ী, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর বেসিনের তিন জেলার পাঁচটি নদীর ছয়টি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছিল। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে নলজুর নদীর পানি ১৮ সেন্টিমিটার বেড়ে প্রবাহিত হচ্ছিল বিপৎসীমার ২৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে।
নেত্রকোনার বিভিন্ন নদীতেও পানি এখনো বিপৎসীমার ওপরে, যদিও কিছু স্থানে সামান্য কমেছে। জারিয়াজঞ্জাইলে ভোগাই-কংস নদীর পানি ১৬ সেন্টিমিটার কমে এখনো প্রবাহিত হচ্ছে ৮৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে। কলমাকান্দায় সোমেশ্বরী নদী ১০ সেন্টিমিটার কমে ৬৪ এবং নেত্রকোনায় মগরা নদী ৮ সেন্টিমিটার কমে ৭৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবহমান। একই নদীর আটপাড়া পয়েন্টে পানি ১ সেন্টিমিটার কমে এখনো ২৭ সেন্টিমিটার ওপর রয়েছে।
অন্যদিকে, হবিগঞ্জ জেলার সুতাং নদীর পানি ২৪ সেন্টিমিটার বেড়ে সুতাং রেলসেতু পয়েন্টে প্রবাহিত হচ্ছে বিপৎসীমার ৬০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে।
সুনামগঞ্জের হাওর এলাকায় এখনো বাড়ছে নদীগুলোর পানি, ঘণ্টায় গড়ে ১ থেকে ২ সেন্টিমিটার।
এদিকে ভারতের আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মেঘালয় ও আসাম অঞ্চলেও হয়েছে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত। মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে ৪১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যার প্রভাব উজানের ঢলের মাধ্যমে পড়তে পারে বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলে।



