জনস্বাস্থ্যের প্রধান প্রকৌশলী আউয়াল সব আমলেই বেপরোয়া!
- অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্বে
- বর্তমান সরকার এসে সচিব ওএসডি হলেও বহাল আউয়াল
- এবার মোটা টাকার চুক্তিতে চেয়ার স্থায়ী করতে দৌড়ঝাঁপ
- মাসোহারার জন্য পিডি ও নির্বাহী প্রকৌশলীদের জিম্মি

ছবিঃ আগামীর সময়
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল আউয়াল। ছয় মাস ধরে রয়েছেন প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্বে। গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিজ জেলা ময়মনসিংহ সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর পদে বসে জড়িয়েছেন বেশুমার দুর্নীতিতে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জ্যেষ্ঠ চার সহকর্মীকে ডিঙিয়ে বাগিয়ে নিয়েছেন প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব। এখন আবার বিএনপি সরকারের প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে প্রধান প্রকৌশলীর চেয়ার নিজের করে নিতে করছেন দৌড়ঝাঁপ। সহকর্মীদের মত, অবৈধ পথে উপার্জিত অর্থের প্রভাবে সব আমলেই বেপরোয়া এই কর্মকর্তা থেকেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
ময়মনসিংহ সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বে ছিলেন আওয়ামী লীগ আমলের শেষ সময়ে। অভিযোগ রয়েছে, মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ দিয়ে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার হাত ধরে পান এই দায়িত্ব। রয়েছে বিস্তর দুর্নীতির তথ্য। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের দোসর হিসাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গোয়েন্দা প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে নেতিবাচক মন্তব্য। তারপরও তাকে দেওয়া হয় এই দায়িত্ব। এখনো বহাল তবিয়তে। সরিয়ে দেওয়ার বদলে প্রধান প্রকৌশলী করতে মোটা অঙ্কের টাকার চুক্তিতে চলছে দৌড়ঝাঁপ। এসব দেখে অধিদপ্তরের ভেতরে-বাইরে প্রশ্ন উঠেছে, দুর্নীতিবাজ ও আওয়ামী লীগ সরকারের দোসর আউয়াল হঠাৎ কেন হয়ে উঠেছেন বিএনপি সরকারের ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালীদের প্রিয়ভাজন?
আমার বিরুদ্ধে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে যেসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে— তা মিথ্যা। আমি কোনো ধরনের দুর্নীতিতে জড়িত নই
অনেকেরই জিজ্ঞাসা, নেপথ্যে এত কি মধু আছে যে, বিপ্লবের গর্ভে জন্ম নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের তখনকার উপদেষ্টা আসিফ চার জ্যেষ্ঠকে ডিঙিয়ে বিতর্কিত এই কর্মকর্তাকে বসিয়েছেন প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্বে। সে সময় বিতর্কিত এই সিদ্ধান্তে কোনো দ্বিমত ছিল না স্থানীয় সরকার বিভাগের তৎকালীন সচিব রেজাউল মাকসুদ জাহেদীর। বিএনপি সরকার গঠনের পর তাকে ওএসডি করা হলেও বহাল তবিয়তে আউয়াল।
বিএনপি সরকারের ঘনিষ্ঠদের আশীর্বাদ ও মোটা অঙ্কের টাকা চুক্তিতে প্রধান প্রকৌশলীর চেয়ার নিজের করে নিতে মরিয়া তদবিরে নেমেছেন আউয়াল। নিয়মিত বিভিন্ন প্রকল্পের পরিচালক ও জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা মাসোহারা তুলে তার ভাগ পাঠান প্রভাবশালী মহলে। এরই মধ্যে প্রধান প্রকৌশলীর পদে বসতে ‘পথের কাঁটা’ দূর করতে কূটচালে বধ করেছেন এক নির্বাহী প্রকৌশলীকে। পুরনো দুর্নীতির অভিযোগ সামনে তুলে ওই মহলের প্রভাবে তাকে করিয়েছেন সাময়িক বরখাস্ত।
জানতে চাইলে সব অভিযোগ নাকচ করে আব্দুল আউয়াল নিজের পক্ষে গাইলেন সাফাই। ‘আমার বিরুদ্ধে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে যেসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে— তা মিথ্যা। আমি কোনো ধরনের দুর্নীতিতে জড়িত নই।’ রয়েছে নোয়াখালীর এক প্রকল্পে বড় দুর্নীতির অভিযোগ। জানতে চাইলে বললেন, ‘এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর নেওয়া হবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।’
প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্বে দীর্ঘ সময় থাকার বিষয়েও তুলে ধরলেন যুক্তি। ‘আমাকে রুটিন দায়িত্বে রাখা হয়েছে বলে আমি আছি। এটা আমার অপরাধ নয়।’ তবে মাসোহারা তোলার বিষয়ে জানতে চাইলে দিলেন না পরিষ্কার কোনো জবাব। বললেন, ‘আপনি অফিসে আসেন, সামনাসামনি বসে কথা বলব।’
কুয়েটে অধ্যয়নকালে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয় ছিলেন আউয়াল। কর্মজীবনেও আওয়ামী লীগ মতাদর্শী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানালেন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (গ্রেড-৪) ও নির্বাহী প্রকৌশলী (গ্রেড-৫) পদে পদোন্নতি দেওয়ার আগে কর্মকর্তাদের সম্পর্কে গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে গোপন প্রতিবেদন সংগ্রহ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতামতে আউয়াল সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘কুয়েটে অধ্যয়নকালে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয় ছিলেন আউয়াল। কর্মজীবনেও আওয়ামী লীগ মতাদর্শী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। নিজ জেলা ময়মনসিংহ-৮ আসনের সাবেক এমপি মাহমুদ হাসানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় নিজ জেলায় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদায়ন পেতে সক্ষম হন। মুন্সীগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী এবং ময়মনসিংহের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থাকাকালে তার বিরুদ্ধে রয়েছে দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ। অধীন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলির হুমকি দিয়ে তাদের কাছ থেকে নিতেন মাসোহারা। এ ছাড়া পেনশন ফাইল অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে পেনশনারদের প্রত্যেকের কাছ থেকে উৎকোচ নিতেন এক-দেড় লাখ টাকা করে।’
গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর এই নেতিবাচক গোপন প্রতিবেদন দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তারপরও আসিফ মাহমুদ ও তার ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা মাহফুজকে খুশি করে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব বাগিয়ে নেন আউয়াল। এরপর তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। রুটিন দায়িত্বে থেকেই তৈরি করেন অবৈধ অর্থ উপার্জনের নানা পথ। তার প্রভাবে নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকল্পের ৫ কোটি টাকার অব্যবহৃত পাইপ ১৯ লাখ টাকা বিক্রি দেখিয়ে করেন লুটপাট। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রধান প্রকৌশলী মিলে এ খাত থেকে ভাগাভাগি করে নেন কয়েক কোটি টাকা। এ ঘটনায় স্থানীয় লোকজনের ঘেরাওয়ের মুখে নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামকে প্রত্যাহার করে নিয়ে আসেন ঢাকায়; কিন্তু তার বিরুদ্ধে এখনো নেওয়া হয়নি শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা। থলের বিড়াল বেরিয়ে যাওয়ার ভয়ে সাইফুলকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন আউয়াল।
ময়মনসিংহের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থাকাকালেও আউয়ালের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে বেশুমার দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার; কিন্তু বরাবরই থেকেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। তার বিরুদ্ধে রয়েছে কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ ও প্রশাসনিক কাজে ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের গুরুতর অভিযোগ।
প্রকৌশলীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন প্রকল্পের পরিচালক ও নির্বাহী প্রকৌশলীদের জিম্মি করে ফেলেছেন আউয়াল। তাকে মোটা অঙ্কের টাকা মাসোহারা দেওয়া ছাড়া কঠিন হয়ে পড়েছে চাকরি করা। একাধিক প্রকল্প পরিচালক এবং জেলা পর্যায়ের নির্বাহী প্রকৌশলী জানালেন, আউয়ালের কর্মকাণ্ডে তারা অতিষ্ঠ। প্রকল্প পরিচালক পদে টিকে থাকতে হলে তাকে দিতে হয় মাসোহারা (মাসিক টাকা)। মন্ত্রণালয়ে দেওয়ার কথা বলে মেতেছেন এই ‘তোলাবাজি’তে। তার কথা না শুনলেই হয়রানি করা হচ্ছে নানাভাবে।
একই ধরনের অভিযোগ, বিভিন্ন জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীদেরও। তাদের ভাষ্য, আউয়ালের পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া কিংবা মাসোহারা না দিলে বিভিন্নভাবে তাদের করা হচ্ছে হয়রানি। এমনকি দাপ্তরিক সভার মধ্যেই সবার সামনে দেওয়া হয় বদলির হুমকি।



