নতুন করে একটি শিক্ষা আন্দোলন প্রয়োজন : দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
‘শিক্ষা আন্দোলনকে যদি রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করা না যায়, তাহলে আমরা যে পরিবর্তন চাই তা অর্জন করা কঠিন।’ এমন কথা বলছিলেন এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
তিনি উল্লেখ করেন, শুধু শিক্ষার্থীদের স্কুলে ভর্তি করানো নয়, বরং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই আন্দোলন শুধু ভর্তির জন্য নয়, শিক্ষার প্রকৃত মান ও ফলাফল নিশ্চিত করার আন্দোলন হতে হবে।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) সকালে রাজধানীতে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত ‘সরকারের অগ্রাধিকার ও শিক্ষা খাত: বাজেট ও বাস্তবতা’ শীর্ষক সংলাপে এসব কথা বলেন তিনি।
সংলাপের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের ভাষ্য, ‘আগে আমরা শিক্ষায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার জন্য আন্দোলন করেছি। এখন সময় এসেছে শিক্ষার ফলাফল নিয়ে আন্দোলন করার। শিক্ষার্থী স্কুলে ভর্তি হচ্ছে, কিন্তু সে কী মান নিয়ে বের হচ্ছে সেটাই এখন বড় বিষয়।’
তিনি জানান, ‘নতুন সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি জোট গড়ে শিক্ষা আন্দোলনকে রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে।’ তার মতে, ‘শুধু কারিগরি মতামত দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন অসম্ভব; এজন্য সামাজিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ প্রয়োজন।’
বিজ্ঞ এ অর্থনীতিবিদের মন্তব্য, ‘শিক্ষা আন্দোলনকে যদি রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করা না যায়, তাহলে আমরা যে পরিবর্তন চাই তা অর্জন করা কঠিন হবে।’
সরকারের উপবৃত্তি কর্মসূচির প্রসঙ্গ তুলে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলছিলেন, ‘উপবৃত্তি দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন সময় বলা হয়েছে শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে। কিন্তু শুধু উপবৃত্তি দিয়ে শিক্ষার ব্যয় মোকাবিলা অসম্ভব। পরিবারের আরও নানা ধরনের খরচ রয়েছে, যা দরিদ্র ও পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য তৈরি করে বড় চাপ। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, সবাই শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বিগ্ন। মানুষ মনে করছে, শিক্ষাক্ষেত্রে বিদ্যমান বিশৃঙ্খলা দূর করা না গেলে এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার ভেতরে ধরে রাখা না গেলে সম্ভব হবে না কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন।’
ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা, বিশেষ করে মেয়েদের ঝরে পড়া, বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম বৃদ্ধিকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে তিনি উল্লেখ করেন, ‘এসব সমস্যা সমাধান না হলে প্রকৃত অর্থে শিক্ষার অগ্রগতি হবে না। একই সঙ্গে সম্ভব হবে না আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও তুলনামূলক মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করাও।’
‘আগামী দিনের শ্রমবাজার পড়তে যাচ্ছে বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স ও প্রযুক্তির বিস্তারের কারণে প্রায় ৫৬ লাখ কর্মসংস্থান হারিয়ে যেতে পারে। আবার নতুন করে সৃষ্টি হবে প্রায় ৫০ লাখ কাজের সুযোগও। কিন্তু সেই নতুন ধরনের কাজের জন্য দেশের তরুণ সমাজ প্রস্তুত কি না, তা নিয়ে বড় ধরনের আশঙ্কা রয়েছে’, মন্তব্য তার।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জানান, ‘আগে আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল সবাইকে শিক্ষার আওতায় আনা। এখন সময় এসেছে শিক্ষার ফলাফল নিশ্চিত করার। ইংরেজিতে যেটা বলা হয়, আগে ছিল ‘ফাইট ফর এডুকেশন’, এখন সময় এসেছে ‘ফাইট ফর আউটকাম অব এডুকেশন’এর। শিক্ষা আন্দোলনকে শুধু কারিগরি মতামতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। এটিকে রূপ দিতে হবে রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে।’



